ইসরায়েলে কে হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, শুরু হচ্ছে রাজনৈতিক লড়াই
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে কোনো পক্ষ স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় দল হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এগিয়ে থাকলেও তার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় আসন থেকে পিছিয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত আসন বেশি হলেও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে তাদের সরকার গঠন সহজ হবে না।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ ভোট গণনা শেষে ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে লিকুদ পার্টি আনুমানিক ২৬টি আসন পেতে যাচ্ছে। তবে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫৩। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন।
ফলে তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তবে সরকার গঠনের আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরব দলগুলো
নির্বাচনের প্রাথমিক হিসাবে বিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা প্রায় ৬৭। নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি ২১টি আসন পেতে যাচ্ছে।
তবে আরব দলগুলো বাদ দিলে নেতানিয়াহুবিরোধী অন্য দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা দাঁড়ায় ৪৮। ফলে সরকার গঠনে আরব নেতৃত্বাধীন রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দল দুটি সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে ইসরায়েলের আরব ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের মধ্যে ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
রা’আম একটি ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল। দলটির নেতা মনসুর আব্বাস ২০২১ সালের নির্বাচনের পর গঠিত সরকারে অংশ নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্ট কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত।
বুধবার বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান বিরোধী জোট গঠনের আলোচনায় আরব দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি ইহুদি ও আরব ভোটারদের মধ্যে বিভাজন তৈরির অভিযোগে নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেন।
তবে আইজেনকোটের সম্ভাব্য মিত্র নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যান আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিরোধিতা করে আসছেন।
এদিকে, জয়েন্ট লিস্ট জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর শাসনের অবসান ঘটাতে তারা রাজনৈতিক সহযোগিতায় প্রস্তুত।
ক্ষমতায় থাকতে কী করতে পারেন নেতানিয়াহু?
সিএনএনের প্রতিবেদনে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আরব দলগুলোর রাজনৈতিক সহযোগিতা ঠেকানোই এখন তার অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।
সূত্রটির দাবি, আরব দলগুলোর সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে নেতানিয়াহু উদ্বিগ্ন। এ ধরনের সরকার গঠন ঠেকাতে তিনি বিরোধী শিবিরের আইনপ্রণেতাদের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারেন।
নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোটে অনিয়ম, হুমকি ও জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছে। তবে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, বিকল্প সরকার গঠন ঠেকাতে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
এমনকি ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন সামরিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন বিরোধী শিবিরের কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তবে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি ও আশঙ্কা; এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান আইজেনকোট দাবি করেছেন, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। তিনি নেতানিয়াহুকে নতুন রাজনৈতিক ম্যান্ডেটহীন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশেষ ব্যালটেই বদলে যেতে পারে আসনের হিসাব
অধিকাংশ ভোট গণনা শেষ হলেও এখনো বিশেষ ব্যবস্থায় দেওয়া ব্যালট গণনা বাকি রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, সেনাসদস্য, কারাবন্দি, হাসপাতালে থাকা রোগী ও কর্মী, বিদেশে কর্মরত কূটনীতিক এবং প্রতিবন্ধী ভোটারদের দেওয়া প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার বিশেষ ব্যালট গণনা করা হবে।
এসব ভোটের ফল কয়েকটি আসনের হিসাব বদলে দিতে পারে। ফলে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে কোনো জোটের অবস্থান নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
সরকার গঠনের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে?
চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ।
তিনি নির্বাচিত দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে জানতে চাইবেন, তারা কাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন করতে চান। এরপর সরকার গঠনের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে এমন একজন নেতাকে দায়িত্ব দেবেন।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দলের নেতাই যে দায়িত্ব পাবেন, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি গুরুত্ব পাবে।
দায়িত্ব পাওয়া নেতা প্রথমে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন হলে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে। এ সময়ের মধ্যে তাকে অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
প্রথম প্রার্থী ব্যর্থ হলে অন্য একজনকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হবে। তিনিও ব্যর্থ হলে নেসেটের সদস্যরা বিকল্প প্রার্থী মনোনয়নের সুযোগ পাবেন। শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান না হলে নতুন নির্বাচনের প্রয়োজন হতে পারে।
বিরোধীদের সামনে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
সরকার গঠন করতে না পারলেও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিশ্চিত করতে পারলে বিরোধী দলগুলো নেসেটের স্পিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করতে পারে।
তবে আইজেনকোটের সম্ভাব্য জোটে আদর্শগত পার্থক্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়া নিয়ে বিরোধী শিবিরের মধ্যেই মতবিরোধ রয়েছে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর জোটের দলগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে শক্ত রাজনৈতিক ঐক্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নতুন নির্বাচন এড়াতে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
বুধবার প্রেসিডেন্ট হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোকে খোলা মন নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। নতুন করে আরেকটি নির্বাচন এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সব মিলিয়ে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কার নেতৃত্বে গঠিত হবে, তা নির্ভর করছে চূড়ান্ত নির্বাচনি ফল, আরব দলগুলোর অবস্থান এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।
সূত্র: সিএনএন