বালা-মুসিবত থেকে পরিত্রাণের উপায় (পর্ব-৩)
বাড়ী থেকে বের হওয়ার সময় দোয়া: রাসূল (সা.) বলেন,
إِذَا خَرَجَ الرَّجُلُ مِنْ بَيْتِهِ فَقَالَ بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ قَالَ يُقَالُ حِينَئِذٍ هُدِيتَ وَكُفِيتَ وَوُقِيتَ فَتَتَنَحَّى لَهُ الشَّيَاطِينُ فَيَقُولُ لَهُ شَيْطَانٌ آخَرُ كَيْفَ لَكَ بِرَجُلٍ قَدْ هُدِىَ وَكُفِىَ وَوُقِىَ
‘যখন কোনো ব্যক্তি তার ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলবে, বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু ‘আলাল্লাহ, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ তখন তাকে বলা হয়, তুমি হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছ, রক্ষা পেয়েছ ও নিরাপত্তা লাভ করেছ। সুতরাং শয়তানরা তার থেকে দূর হয়ে যায় এবং অন্য এক শয়তান বলে, তুমি ওই ব্যক্তিকে কি করতে পারবে, যাকে পথ দেখানো হয়েছে, নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে এবং রক্ষা করা হয়েছে’। (আবূদাঊদ হা/৫০৯৫; মিশকাত হা/২৪৪৩; সহিহুল জামে‘ হা/৪৯৯; সহিহ আত-তারগীব হা/১৬০৫)
আরো পড়ুন >>> বালা-মুসিবত থেকে পরিত্রাণের উপায় (পর্ব-২)
খ. বালা-মুসিবত নাজিল হওয়ার পরে করণীয়: বিপদাপদ ও বালা-মুসিবত নাজিল হলে কিছু করণীয় রয়েছে, যা করলে মানুষ ওইসব থেকে রক্ষা পেতে পারে। নিম্নে সে করণীয়গুলো উল্লেখ করা হলো।
১. বেশি বেশি ইবাদত করা : বিপদ আসলে বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগী করা উচিত। যাতে আল্লাহর রহমত নাজিল হয় এবং তিনি দয়াপরবশ হয়ে আপতিত বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করেন। রাসূল (সা.) বলেন,
إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ آيَتَانِ مِنْ آيَاتِ اللهِ، لاَ يَنْخَسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلاَ لِحَيَاتِهِ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ ذَلِكَ فَادْعُوْا اللهَ وَكَبِّرُوْا، وَصَلُّوْا وَتَصَدَّقُوْا
‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শন সমূহের দু’টি নিদর্শন। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ হয় না। কাজেই যখন তোমরা তা দেখবে তখন তোমরা আল্লাহর নিকট দোয়া করবে। তাঁর মহত্ব ঘোষণা করবে এবং সালাত আদায় করবে ও সাদাক্বাহ করবে।’ (বুখারি হা/১০৪৪; নাসাঈ হা/১৫০০; মিশকাত হা/১৪৮৩)
হাফেজ ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহ.) বলেন,
قَالَ الطِّيبِيُّ أُمِرُوْا بِاسْتِدْفَاعِ الْبَلاَءِ بِالذِّكْرِ وَالدُّعَاءِ وَالصَّلاَةِ وَالصَّدَقَةِ،
‘ত্বীবী বলেন, বালা-মুসিবত প্রতিরোধের জন্য জিকির, দোয়া, সালাত ও সদাকার মাধ্যমে তা প্রতিরোধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’ (ফৎহুল বারী, ২/৫৩১ পৃঃ; উমদাতুল ক্বারী, ৭/৭১ পৃঃ; মির‘আত ৫/১৪৮ পৃঃ)।
হাফেয ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন,
والنبي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أمر بالكسوف بالصلاة والعتاقة والمبادرة إلى ذكر الله تعالى والصدقة، فإن هذه الأمور تدفع أسباب البلاء
‘নবী করিম (সা.) চন্দ্রগ্রহণের সময় সালাত, দাসমুক্তি, বেশি বেশি জিকির ও দান-সদাকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। কেননা এসব কাজ বালা-মুসিবত থেকে পরিত্রাণ লাভের মাধ্যম।’ (ইবনুল কায়্যেম, আল-ওয়াবিলুছ ছায়ব মিনাল কামিতি তাইয়েব, (কায়রো: দারুল হাদিস, ৩য় প্রকাশ, ১৯৯৯ খৃঃ, ১/১৪২ পৃঃ)।
ক. নফল ছালাত আদায় করা: বালা-মুসিবত আসলে নফল সালাত আদায় করে আল্লাহর কাছে তা থেকে রক্ষার জন্য দোয়া করতে হবে। রাসূল (সা.) বলেন,
إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لاَ يَخْسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلاَ لِحَيَاتِهِ، وَلَكِنَّهُمَا آيَتَانِ مِنْ آيَاتِ اللهِ يُرِيهِمَا عِبَادَهُ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ ذَلِكَ فَافْزَعُوْا إِلَى الصَّلاَةِ
‘সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ কারো মৃত্যু কিংবা জন্মের কারণে হয় না। বরং আল্লাহর নিদর্শন সমূহের মধ্যে এ হলো দু’টি নিদর্শন, যা আল্লাহ তাঁর বান্দাদের দেখিয়ে থাকেন। কাজেই যখন তোমরা তা দেখবে তখন ভীত অবস্থায় সালাতের দিকে আসবে।’ (বুখারি হা/১০৫২; সহিহুল জামে হা/১৬৪৪)
আবূ হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, তিনজন শিশু ব্যতীত কেউ দোলনায় থেকে কথা বলেনি। প্রথম জন ঈসা (আ.), দ্বিতীয় জন বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি যাকে জুরাইজ নামে ডাকা হতো। একদা ইবাদতে রত থাকা অবস্থায় তার মা এসে তাকে ডাকল। সে ভাবল আমি কি তার ডাকে সাড়া দেব, না সালাত আদায় করতে থাকব। তার মা বলল, হে আল্লাহ! ব্যাভিচারিণীর মুখ না দেখা পর্যন্ত তুমি তাকে মৃত্যু দিও না। জুরাইজ তার ইবাদতখানায় থাকত। একবার তার নিকট এক নারী আসল। তার সঙ্গে কথা বলল। কিন্তু জুরাইজ তা অস্বীকার করল। অতঃপর নারী একজন রাখালের নিকট গেল এবং তাকে দিয়ে মনোবাসনা পূর্ণ করল। পরে সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো এটি কার থেকে? নারী বলল, জুরাইজ থেকে। লোকেরা তার নিকট আসল এবং তার ইবাদতখানা ভেঙ্গে দিল। আর তাকে নীচে নামিয়ে আনল ও তাকে গালি-গালাজ করল। তখন জুরাইজ ওজু করে সালাত আদায় করল। অতঃপর নবজাত শিশুটির নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করল হে শিশু! তোমার পিতা কে? সে জবাব দিলো, ওই রাখাল। তারা বলল, আমরা আপনার ইবাদতখানাটি সোনা দিয়ে তৈরি করে দিচ্ছি। সে বলল, না, তবে মাটি দিয়ে।’ (বুখারি হা/৩৪৩৬; মুসলিম হা/২৫৫০)
আবূ হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ইব্রাহিম (আ.) সারাকে সঙ্গে নিয়ে হিজরত করলেন এবং এমন এক জনপদে প্রবেশ করলেন, যেখানে এক বাদশাহ ছিল, অথবা বললেন, এক অত্যাচারী শাসক ছিল। তাকে বলা হলো যে, ইব্রাহিম (নামক এক ব্যক্তি) এক পরমা সুন্দরী নারীকে নিয়ে (আমাদের এখানে) প্রবেশ করেছে। সে তখন তার নিকট লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করল, হে ইব্রাহিম! তোমার সঙ্গে এ নারী কে? তিনি বললেন, আমার বোন। অতঃপর তিনি সারার নিকট ফিরে এসে বললেন, তুমি আমার কথা মিথ্যা মনে করো না। আমি তাদেরকে বলেছি যে, তুমি আমার বোন। আল্লাহর শপথ! দুনিয়াতে (এখন) তুমি আর আমি ব্যতীত আর কেউ মুমিন নেই। সুতরাং আমি ও তুমি দ্বীনী ভাই-বোন। এরপর ইব্রাহিম (আ.) (বাদশাহর নির্দেশে) সারাকে বাদশাহর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। বাদশাহ তার দিকে অগ্রসর হলো।
সারা ওজু করে সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং এ দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আমি তোমার ওপর এবং তোমার রাসূলের ওপর ঈমান এনেছি এবং আমার স্বামী ব্যতীত সব হতে আমার লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করেছি। তুমি এই কাফেরকে আমার ওপর ক্ষমতা দিও না। তখন বাদশাহ বেহুঁশ হয়ে পড়ে মাটিতে পায়ের আঘাত করতে লাগলো। তখন সারা বললেন, হে আল্লাহ! এ অবস্থায় যদি সে মারা যায় তবে লোকেরা বলবে, নারীটি একে হত্যা করেছে। তখন সে জ্ঞান ফিরে পেল। এভাবে দু’বার বা তিনবারের পর বাদশাহ বলল, আল্লাহর শপথ! তোমরা তো আমার নিকট এক শয়তানকে পাঠিয়েছ। একে ইব্রাহিমের নিকটে ফিরিয়ে দাও এবং তার জন্য হাজেরাকে হাদিয়া স্বরূপ দান কর।
সারাহ ইব্রাহিম (আ.) এর নিকট ফিরে এসে বললেন, আপনি জানেন কি, আল্লাহ তায়ালা কাফেরকে লজ্জিত ও নিরাশ করেছেন এবং সে এক বাঁদীকে হাদিয়া হিসেবে দিয়েছে? (বুখারি হা/২২১৭, ২৬৩৫, ২৩৫৭, ২৩৫৮, ৫০৮৪, ৬৯৫০)
খ. তাহাজ্জুদ ছালাত আদায় করা: আবূ উমামা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন,
عَلَيْكُمْ بِقِيَامِ اللَّيْلِ فَإِنَّهُ دَأْبُ الصَّالِحِيْنَ قَبْلَكُمْ وَهُوَ قُرْبَةٌ إِلَى رَبِّكُمْ وَمَكْفَرَةٌ لِلسَّيِّئَاتِ وَمَنْهَاةٌ لِلإِثْمِ
‘তোমরা অবশ্যই রাতের ইবাদত করবে। কেননা তা তোমাদের পূর্ববর্তী সৎকর্মপরায়ণদের অভ্যাস, আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের উপায়, গুনাহসমূহের কাফফারা এবং পাপ কর্মের প্রতিবন্ধক’। (তিরমিযী হা/৩৫৪৯; মিশকাত হা/১২২৭; সহিহুল জামে হা/৪০৭৯; ইরওয়া হা/৪৫২)।
রাসূল (সা.) বলেন,
يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِى فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِى فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِى فَأَغْفِرَ لَهُ
‘আমাদের প্রতিপালক প্রত্যেক রাতেই নিকটবর্তী আকাশে (১ম আকাশে) অবতীর্ণ হন, যখন রাতের শেষ তৃতীয় ভাগ অবশিষ্ট থাকে এবং বলতে থাকেন, কে আছে যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছে যে আমার নিকট কিছু চাইবে, আমি তাকে তা দান করব এবং কে আছে যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব’। (বুখারি হা/১১৪৫; মুসলিম হা/৭৫৮; মিশকাত হা/১২২৩) সুতরাং এসময়ে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করে আল্লাহর কাছে বালা-মুসিবত থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করলে তিনি তা থেকে মুক্তি দেবেন।
গ. জিকির করা: জিকির করা আল্লাহর করুণা লাভের মাধ্যম। তাই বালা-মুসিবত আসলে বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করার মাধ্যমে তাঁর রহমত লাভের চেষ্টা করা উচিত। যাতে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে বান্দাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন। রাসূল (সা.) বলেন,
إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ آيَتَانِ مِنْ آيَاتِ اللهِ، لاَ يَخْسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلاَ لِحَيَاتِهِ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ ذَلِكَ فَاذْكُرُوا اللهَ
‘নিঃসন্দেহে সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শন সমূহের মধ্যে দু’টি নিদর্শন। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে এ দু’টির গ্রহণ হয় না। কাজেই যখন তোমরা গ্রহণ দেখবে তখনই আল্লাহর (জিকর) স্মরণ করবে।’ (বুখারি হা/১০৫৮)
ঘ. সাদাকাহ করা: জান-মালের উপরে বিপদাপদ ও আল্লাহর অসন্তোষ থেকে পরিত্রাণের অন্যতম উপায় হচ্ছে দান-সাদাকাহ করা। আর অন্যের প্রতি অনুগ্রহ করা। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ رَحْمَةَ اللهِ قَرِيْبٌ مِنَ الْمُحْسِنِيْنَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের অতীব নিকটবর্তী’ (সূরা: আরাফ ৭/৫৬)।
তিনি আরো বলেন,
مَا عَلَى الْمُحْسِنِيْنَ مِنْ سَبِيلٍ وَاللهُ غَفُورٌ رَحِيْمٌ
‘বস্ত্তত: সৎকর্মশীলদের বিরুদ্ধে কোনোরূপ অভিযোগ নেই। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (সূরা: তওবা ৯/৯১)। চলবে...
সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান