ঢাকা,  শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

[ ধর্ম ]

বালা-মুসিবত থেকে পরিত্রাণের উপায় (পর্ব-২)

ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ২০:৩০, ১২ অক্টোবর ২০২০
বালা-মুসিবত থেকে পরিত্রাণের উপায় (পর্ব-২)
রাসূল (সা.) বলেন,  ‘যে বিপদ-আপদ এসেছে আর যা (এখনো) আসেনি তাতে দোয়ায় কল্যাণ হয়। অতএব, হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা দোয়াকে আবশ্যিক করে নাও’। (তিরমিযী হা/৩৫৪৮; সহিহুল জামে‘ হা/৩৪০৯; সহিহ আত-তারগীব

রাসূল (সা.) আরো বলেন, 

مَنْ لَزِمَ الاسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيْقٍ مَخْرَجاً، وَمِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجاً، وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لاَ يَحْتَسِبُ 

‘যে ব্যক্তি সর্বদা ক্ষমা চায়, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য প্রত্যেক সংকীর্ণতা হতে একটি পথ বের করে দেন এবং প্রত্যেক চিন্তা হতে তাকে মুক্তি দেন। আর তাকে রিজিক দান করেন এমন স্থান হতে যা সে কখনো কল্পনা করে না।’ (আহমাদ, মিশকাত হা/২৩৩৯)।

আরো পড়ুন >>> বালা-মুসিবত থেকে পরিত্রাণের উপায় (পর্ব-১)

রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি বলল, 

أسْتَغْفِرُ اللهَ الَّذِيْ لاَ إلَهَ إلاَّ هُوَ الحَيُّ القَيُوْمُ وَأتُوْبُ إلَيْهِ، غُفِرَتْ ذُنُوْبُهُ، وإنْ كانَ قَدْ فَرَّ مِنَ الزَّحْفِ 

(আমি আল্লাহর নিকটে ক্ষমা চাই। যিনি ব্যতীত কোনো মাবূদ নেই। যিনি চিরঞ্জীব চির প্রতিষ্ঠাতা এবং তাঁর নিকটে তওবাকারী) আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন যদিও সে জিহাদের মাঠ হতে পলায়ণ করে থাকে’।  (তিরমিযী, হাদিস সহিহ, মিশকাত হা/২৩৫৩)।

৪. তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা: তাক্বওয়া হচ্ছে সব আমল সংশোধনের উপায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَقُوْلُوْا قَوْلًا سَدِيْدًا، يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللهَ وَرَسُوْلَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيْمًا 

‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বলো। তাহলে তিনি তোমাদের কর্মসমূহকে সংশোধন করে দেবেন ও তোমাদের পাপ সমূহ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে ব্যক্তি মহা সাফল্য অর্জন করে।’ (সূরা: আহযাব ৩৩/৭০-৭১)।

মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَنْ يَّتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَّهُ مَخْرَجًا، وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لاَ يَحْتَسِبُ- 

‘যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার (মুক্তির) পথ করে দেবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রজিক দান করবেন’ (সূরা: তালাক ৬৫/২-৩)। 

ইবনু আববাস (রা.) বলেন, এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তাকে ইহকালীন ও পরকালীন সব সমস্যা থেকে মুক্তি দেবেন। (তাফসির ইবনে কাসির, ৮/১৪৬; কুরতুবী ১৮/১৫৯; ফাতহুল কাদীর ৭/২৪৩)।

আল্লাহভীতি অর্জন করলে দুনিয়াবী বালা-মুসিবত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। সামূদ সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন,

وَأَمَّا ثَمُوْدُ فَهَدَيْنَاهُمْ فَاسْتَحَبُّوا الْعَمَى عَلَى الْهُدَى فَأَخَذَتْهُمْ صَاعِقَةُ الْعَذَابِ الْهُوْنِ بِمَا كَانُوْا يَكْسِبُوْنَ، وَنَجَّيْنَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا وَكَانُوْا يَتَّقُوْنَ 

‘আর সামূদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার তো এই যে, আমরা তাদেরকে পথ-নির্দেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা সৎপথের পরিবর্তে ভ্রান্তপথ অবলম্বন করেছিল। অতঃপর তাদেরকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আঘাত হানল তাদের কৃতকর্মের পরিণাম স্বরূপ। আমরা উদ্ধার করলাম তাদেরকে যারা ঈমান এনেছিল এবং যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করত।’ (সূরা: হা-মীম আস-সাজদা ৪১/১৭-১৮)।

অর্থাৎ: তাদের পরে উল্লিখিতদের কোনো অনিষ্ট স্পর্শ করেনি এবং তারা কোনো ক্ষতির শিকার হয়নি। বরং আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে তাদের নবী সালেহ (আ.) এর সঙ্গে রক্ষা করেছেন তাদের ঈমান ও আল্লাহভীতির কারণে। (তাফসির ইবনে কাসির, ৭/১৬৯ পৃঃ, সূরা: হা-মীম সাজদাহ ১৭-১৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ)।
 
আল্লাহ তায়ালা বলেন, 

وَإِنْ مِّنْكُمْ إِلاَّ وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا

ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوا وَّنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا

‘আর তোমাদের প্রত্যেকেই তা অতিক্রম করবে; এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। পরে আমি মুত্তাকীদেরকে উদ্ধার করব এবং জালিমদেরকে সেথায় নতজানু অবস্থায় রেখে দেব।’ (সূরা: মারিয়াম ১৯/৭১-৭২)।

৫. খাদ্য-পানীয়ের পাত্র সমূহ ঢেকে রাখা:

খাদ্য ও পানপাত্র সমূহ ঢেকে রাখার জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যথা এতে রোগজীবাণু প্রবেশ করতে পারে। রাসূল (সা.) বলেন, 

غَطُّوْا الإِنَاءَ وَأَوْكُوا السِّقَاءَ فَإِنَّ فِى السَّنَةِ لَيْلَةً يَنْزِلُ فِيْهَا وَبَاءٌ لاَ يَمُرُّ بِإِنَاءٍ لَيْسَ عَلَيْهِ غِطَاءٌ أَوْ سِقَاءٍ لَيْسَ عَلَيْهِ وِكَاءٌ إِلاَّ نَزَلَ فِيْهِ مِنْ ذَلِكَ الْوَبَاءِ. 

‘খাদ্য-পাত্র ঢেকে রাখো এবং মশক বন্ধ রাখো। কেননা বছরে এমন এক রাত্রি আছে, যে রাত্রে বিভিন্ন প্রকারের বালা-মুসিবত নাজিল হয়। ওইসব বালার গতিবিধি এমন সব পাত্রের দিকে হয় যা ঢাকা নয় এবং এমন পান-পাত্রের দিকে হয় যার মুখ বন্ধ নয়, ফলে তা তার মধ্যে প্রবেশ করে।’ (মুসলিম হা/২০১৪; মিশকাত হা/৪২৯৮; সিলসিলা ছহিহাহ হা/৩৭; ইরওয়া হা/৩৯; সহিহুল জামে‘ হা/৭৬০৮)।

৬. বিভিন্ন দো‘আ করা: বালা-মুসিবত থেকে পরিত্রাণের জন্য ওইসব নাজিল হওয়ার পূর্বে বিভিন্ন সময় ও ক্ষেত্রে পঠিতব্য নানা রকম দোয়া রাসূল (সা.) শিখিয়েছেন। সেগুলো নিয়মিত পাঠ করা। 

রাসূল (সা.) বলেন, 

إِنَّ الدُّعَاءَ يَنْفَعُ مِمَّا نَزَلَ وَمِمَّا لَمْ يَنْزِلْ فَعَلَيْكُمْ عِبَادَ اللهِ بِالدُّعَاءِ  

‘যে বিপদ-আপদ এসেছে আর যা (এখনো) আসেনি তাতে দোয়ায় কল্যাণ হয়। অতএব, হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা দোয়াকে আবশ্যিক করে নাও’। (তিরমিযী হা/৩৫৪৮; সহিহুল জামে‘ হা/৩৪০৯; সহিহ আত-তারগীব হা/১৬৩৪; মিশকাত হা/২২৩৯)।

সকাল-সন্ধ্যায় পঠিতব্য দোয়া: রাসূল (সা.) বলেন,

مَنْ قَالَ بِسْمِ اللهِ الَّذِى لاَ يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَىْءٌ فِى الأَرْضِ وَلاَ فِى السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ لَمْ تُصِبْهُ فَجْأَةُ بَلاَءٍ حَتَّى يُصْبِحَ وَمَنْ قَالَهَا حِينَ يُصْبِحُ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ لَمْ تُصِبْهُ فَجْأَةُ بَلاَءٍ حَتَّى يُمْسِىَ 

‘যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় তিনবার বলবে, অর্থ: ‘আল্লাহর নামে যাঁর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো বস্ত্তই ক্ষতি করতে পারে না, তিনি সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী।’ সকাল হওয়া পর্যন্ত তার প্রতি কোনো আকস্মিক বিপদ আসবে না। আর যে তা সকালে তিনবার বলবে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার ওপর কোনো আকস্মিক বিপদ আসবে না।’ (আবূদাঊদ হা/৫০৮৮; তিরমিযী হা/৩৩৮৮; ইবনু মাজাহ হা/৩৮৬৯; মিশকাত হা/২৩৯১)।

দোয়া ইউনুস বেশি বেশি পাঠ করা: মহান আল্লাহ বলেন,

وَذَا النُّونِ إِذْ ذَهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَنْ لَنْ نَقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّيْ كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِيْنَ، فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنْجِي الْمُؤْمِنِيْنَ 

‘আর স্মরণ কর মাছওয়ালা (ইউনুস) এর কথা। যখন সে ক্রুদ্ধ অবস্থায় চলে গিয়েছিল এবং বিশ্বাসী ছিল যে, আমরা তার ওপর কোনোরূপ কষ্ট দানের সিদ্ধান্ত নেব না। অতঃপর সে (মাছের পেটে) ঘণ অন্ধকারের মধ্যে আহ্বান করল (হে আল্লাহ!) তুমি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। তুমি পবিত্র। আমি সীমালংঘণকারীদের অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর আমরা তার আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা হতে মুক্ত করলাম। আর এভাবেই আমরা বিশ্বাসীদের মুক্তি দিয়ে থাকি।’ (সূরা: আম্বিয়া ২১/৮৭-৮৮)।

রাসূল (সা.) বলেন,

دَعْوَةُ ذِى النُّوْنِ إِذْ دَعَا وَهُوَ فِىْ بَطْنِ الْحُوْتِ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّى كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِيْنَ. فَإِنَّهُ لَمْ يَدْعُ بِهَا رَجُلٌ مُسْلِمٌ فِىْ شَىْءٍ قَطُّ إِلاَّ اسْتَجَابَ اللهُ لَهُ 

‘যুন-নূন ইউনুস (আ.) মাছের পেটে থাকাকালে যে দোয়া করেছিলেন তা হলো, ‘তুমি ব্যতীত কোনো মাবূদ নেই, তুমি অতি পবিত্র। আমি নিশ্চয়ই জালিমদের দলভুক্ত।’ (সূরা: আম্বিয়া ২১/৮৭)। 

যেকোনো মুসলিম কোনো বিষয়ে কখনো এর মাধ্যমে দোয়া করলে অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করেন।’ (তিরমিযী হা/৩৫০৫; মিশকাত হা/২২৯২; সহিহুল জামে‘ হা/৩৩৮৩)।

সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার দোয়া: আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রা.) বলেন,

لَمْ يَكُنْ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَدَعُ هَؤُلاَءِ الدَّعَوَاتِ حِيْنَ يُصْبِحُ وَحِيْنَ يُمْسِى اللَّهُمَّ إِنِّى أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةَ فِى الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ اللَّهُمَّ إِنِّى أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِىْ دِيْنِىْ وَدُنْيَاىَ وَأَهْلِى وَمَالِى اللَّهُمَّ اسْتُرْ عَوْرَاتِىْ وَآمِنْ رَوْعَاتِىْ اللَّهُمَّ احْفَظْنِى مِنْ بَيْنِ يَدَىَّ وَمِنْ خَلْفِىْ وَعَنْ يَمِيْنِىْ وَعَنْ شِمَالِىْ وَمِنْ فَوْقِى وَأَعُوْذُ بِعَظَمَتِكَ أَنْ أُغْتَالَ مِنْ تَحْتِىْ 

‘রাসূলুল্লাহ (সা.) সকাল-সন্ধ্যায় এসব দোয়া করা পরিত্যাগ করতেন না- ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট দুনিয়া ও আখেরাতের নিরাপত্তা কামনা করছি। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আমার দ্বীন ও দুনিয়া, পরিবার ও সম্পদ বিষয়ে ক্ষমা ও নিরাপত্তা কামনা করছি। হে আল্লাহ! তুমি আমার গোপন ব্যাপারগুলো গোপন রাখো। ভয়-ভীতি থেকে আমাকে নিরাপত্তা দাও। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে নিরাপদে রাখ, আমার সম্মুখের বিপদ হতে, পশ্চাতের বিপদ হতে, ডানের বিপদ হতে, বামের বিপদ হতে, আর ঊর্ধ্বদেশের গজব হতে। তোমার মহত্ত্বের দোহাই দিয়ে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি আমার নিম্নদেশ হতে আগত বিপদে আকস্মিক মৃত্যু হতে।’।  (আহমাদ হা/৪৭৮৫; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/১২০০, সনদ সহিহ)।

আবূ হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 

كَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَتَعَوَّذُ مِنْ جَهْدِ الْبَلاَءِ، وَدَرَكِ الشَّقَاءِ، وَسُوْءِ الْقَضَاءِ، وَشَمَاتَةِ الأَعْدَاءِ 

‘নবী করিম (সা.) বালা-মুসিবতের কঠোরতা, দুর্ভাগ্যে পতিত হওয়া, ভাগ্যের অশুভ পরিণতি এবং দুশমনের আনন্দিত হওয়া থেকে আশ্রয় চাইতেন।’ (বুখারি হা/৬৩৪৭, ৬৬১৬; মুসলিম হা/২৭০৭; মিশকাত হা/২৪৫৭)। চলবে...

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএজে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!