কোরআনের বিস্ময়কর ৪ তথ্য.. উট, আকাশ, পাহাড় ও পৃথিবী সম্পর্কে (শেষ পর্ব)
মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনুল কারিমের সূরা আল গাশিয়াহ’য় চারটি প্রশ্ন করেছেন।
أَفَلَا يَنظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ
তারা কি উষ্ট্রের প্রতি লক্ষ্য করে না যে, তা কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে?
وَإِلَى السَّمَاء كَيْفَ رُفِعَتْ
এবং আকাশের প্রতি লক্ষ্য করে না যে, তা কিভাবে উচ্চ করা হয়েছে?
وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ
এবং পাহাড় সমূহের প্রতি, তা কিভাবে স্থাপন করা হয়েছে?
وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ
‘এবং দেখ পৃথিবীর দিকে, কিভাবে তাকে বিছানো হয়েছে’? (সূরা: আল গাসিয়াহ, আয়াত: ১৭-২০)।
আরো দেখুন >>> কোরআনের বিস্ময়কর ৪ তথ্য.. উট, আকাশ, পাহাড় ও পৃথিবী সম্পর্কে (পর্ব-৩)
কোরআনের উক্ত চারটি আয়াতের ওপর আমরা সহজেই আমল করে ফেলতে পারবো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে। এই প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে প্রাণীবিজ্ঞান, মহাকাশবিজ্ঞান, ভূবিজ্ঞান এবং মৃত্তিকা বিজ্ঞানের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। নিঃসন্দেহে এই চারটি বিজ্ঞানে মানুষের জন্য বিরাট বিস্ময় ও কল্যাণ লুকিয়ে রয়েছে।
এ চার প্রশ্ন নিয়ে চলছে আমাদের ধারাবাহিক আলোচনা। ১ম পর্বে উট, ২য় পর্বে আকাশ, ৩য় পর্ব পাহাড় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আজ ৪র্থ পর্বে থাকছে পৃথিবীর আলোচনা।
চলুন দেখি এগুলোর মধ্যে কী বিস্ময় ও কল্যাণ লুকিয়ে আছে-
সূরা আল গাশিয়াহ’র ২০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা প্রশ্ন করেছেন,
وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ
‘এবং দেখ পৃথিবীর দিকে, কিভাবে তাকে বিছানো হয়েছে’?
এখানে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবী থেকে উপদেশ হাছিলের নির্দেশ দিয়েছেন। যা আল্লাহর এক অপরূপ নিদর্শন। أَرَضَ أَرْضًا أو أَرُضَ أَرَاضَةً অর্থ সবুজ-শ্যামল হওয়া, সুদৃশ্য হওয়া। সেখান থেকে أَرْضٌ অর্থ পৃথিবী। বহুবচনে أَرْضُوْنَ।
বান্দার বসবাস ও সহজ বিচরণের জন্য পৃথিবীকে আল্লাহ বিস্তৃত করে দিয়েছেন। মাটিকে তিনি সর্বংসহা করেছেন এবং বান্দার রূজির জন্য শস্য উৎপাদনের উপযোগী করেছেন। পাহাড়ের মতো ভূপৃষ্ঠ চার শ্রেণীতে বিভক্ত। এক- ঝোপ-জঙ্গলে পূর্ণ এলাকা। যেমন: আফ্রিকার ঘন জঙ্গল বেষ্টিত অঞ্চলসমূহ। তাছাড়া প্রায় প্রত্যেক দেশেই কিছু না কিছু এলাকায় বনভূমি আছে। যার পরিমাণ কমপক্ষে ২৫ শতাংশ হওয়া উচিৎ। নইলে আবহাওয়া বিরূপ হয়ে যায়। দুই- সাগর-নদী বেষ্টিত এলাকা। যেমন: বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর অন্যান্য এলাকা। তিন- পাহাড়, মরুভূমি ও উপত্যকা বেষ্টিত এলাকা। যেমন: আরব উপদ্বীপ ও আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি এলাকা। চার- তৃণভূমি বেষ্টিত এলাকা। যেমন: অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য এলাকা।
এছাড়া আবহাওয়ার হিসেবে পৃথিবী ৬টি অঞ্চলে বিভক্ত। যেমন তুন্দ্রা অঞ্চল, উষ্ণ অঞ্চল, মৌসুমী অঞ্চল, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল, তুষার অঞ্চল ও নিরক্ষীয় অঞ্চল। এভাবে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অঞ্চলকে আল্লাহ এক একভাবে সাজিয়েছেন। যাতে প্রত্যেক এলাকার বাসিন্দা অন্য এলাকার বাসিন্দা থেকে উপকৃত হতে পারে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের ওপরে নির্ভরশীল থাকে। যাতে এর ফলে মানবজাতি আপোষে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করে এবং আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতে পারে। আল্লাহ বলেন,
أَهُمْ يَقْسِمُوْنَ رَحْمَةَ رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُم مَّعِيْشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضاً سُخْرِياًّ وَّرَحْمَتُ رَبِّكَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ
‘তারা কি তোমার পালনকর্তার রহমত বণ্টন করে? আমরা তাদের মধ্যে পার্থিব জীবনে তাদের জীবিকা বণ্টন করে দিয়েছি এবং তাদের একের মর্যাদাকে অন্যের ওপরে উন্নীত করেছি, যাতে তারা একে অপর থেকে কাজ নিতে পারে। বস্ত্ততঃ তারা যা সঞ্চয় করে তার চেয়ে তোমার পালনকর্তার রহমত অনেক উত্তম’ (সূরা: যুখরুফ, আয়াত: ৩২)।
উপরে বর্ণিত চারটি আয়াতে আল্লাহ আরবদের উদ্দেশ্যে চিন্তা-গবেষণার আহ্বান জানালেও এর মাধ্যমে পৃথিবীব্যাপী মানব জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখেরাতের উন্নতি ও অগ্রগতি সম্ভব নয় যতক্ষণ না তারা আল্লাহর অস্তিত্বকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করবে এবং এসব মহান সৃষ্টির সৌন্দর্য ও গূঢ় রহস্য উপলব্ধি করবে। অতঃপর আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর বিধানসমূহ মেনে জীবন পরিচালনা করবে।
বিগত চারটি আয়াতে (১৭-২০) উটের বিস্ময়কর সৃষ্টি কৌশল, আকাশের সীমাহীন উচ্চতা, পাহাড়ের বিশালায়তন সুদৃঢ় স্থাপনা এবং ধরিত্রীর বিপুলা বিস্তৃতি ও তার সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে চিন্তাশীল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের পর আল্লাহ স্বীয় রাসূলকে (সা.) উদ্দেশ্য করে বলেন,
অতএব, ‘তুমি উপদেশ দিতে থাকো। তুমি শুধুই একজন উপদেশদাতা। জোর করে মানানো তোমার কাজ নয়। তবে যে মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং অস্বীকার করবে, আল্লাহ তাকে ভীষণ শাস্তি দেবেন। এরা শেষ পর্যন্ত আমার কাছেই ফিরে আসবে। আমিই তখন এদের কাছ থেকে সব হিসেব নেব।’
আমাদের কাজ উপদেশ দেয়া, মানুষের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য, যৌক্তিকতা তুলে ধরা। ‘তিন দিন সময় দিলাম। যদি এই সব বন্ধ করে সাচ্চা মুসলিম না হও, তাইলে কিন্তু…” -এরকম জোর-জবরদস্তি করা আমাদের কাজ নয়।
ইসলামের আদেশ, উপদেশ, নির্দেশ শুনে উপলব্ধি করার পরেও কেউ যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে, সে মানবে না, তাহলে আমাদের আর কিছু করার নেই। আল্লাহ তায়ালাই তার বিচার নেবেন। তাঁর কাছেই শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে হবে। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কীভাবে অবাধ্যতার কৈফিয়ত দেবে, ফুর্তি-দুর্নীতিতে মজে থাকা জীবনযাত্রার পক্ষে সাফাই গাইবে, সেটা যেন এখনই ভেবে দেখে। মৃত্যু আসার আগ পর্যন্ত সময় আছে ফিরে আসার। মৃত্যুর আগের মুহূর্তের তাওবা আল্লাহ তায়ালা গ্রহণ করেন না।
অত্র সূরায় আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান-গবেষণা সহকারে পূর্ণ সচেতনতার সঙ্গে ঈমান আনার এবং দুনিয়াতে আনুগত্যশীল বান্দা হয়ে আখেরাতে জান্নাতের অধিকারী হওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন।
আমরা এ বিষয়টির প্রতিও আরো খেয়াল দিতে পারি যে, পৃথিবীতে কেন এত সমতল ভূমি? পৃথিবী তো শুধুই এবড়ো-থেবড়ো, পাহাড়, পর্বত, খাঁদে ভরা হতে পারত। তা না হয়ে, এত বিশাল সব সমতলভূমি, মানুষের বসবাসের যোগ্য থাকার জায়গা তৈরি হলো কীভাবে?
পৃথিবীর ডিজাইন দেখলে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, তা মানুষের বসবাসের উপযোগী করে বানানো হয়েছে। বিশাল সমতল ভূমি রাখা হয়েছে চাষবাস করে বিপুল জনসংখ্যার খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য। বীজ বুনে একটু যত্ন নিলেই ফুল, ফল, ফসল জন্মে যায়। বাড়ি-ঘর তৈরি করার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা আগে থেকেই রেখে দেওয়া হয়েছে। বিশাল বন ভর্তি গাছপালা, মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল রাখা আছে। যথেষ্ট সমতল জায়গা দেয়া হয়েছে কোটি মানুষের বসবাসের জন্য। মানুষ তো এগুলো তৈরি করেনি। কীভাবে এসব হলো?
পৃথিবী প্রথমে মোটেও মানুষের বসবাসের উপযোগী ছিল না। কোটি কোটি বছর ধরে নদীর পানির প্রবাহ থেকে ক্ষয়, পলি জমা, ক্রমাগত বৃষ্টির ফলে ক্ষয়, ভীষণ বন্যা, ঝড়, ভূমিকম্প, বাতাসের মাধ্যমে ক্ষয়, লাভার প্রবাহ ইত্যাদি নানা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর উপরের রুক্ষ স্তর ক্রমাগত ক্ষয় হয়ে, তলানি জমে একসময় সমতল, উর্বর ভূমি তৈরি হয়েছে। (৪১৮)।
রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা আমাদের আপনার আদেশ নিষেধ ও আপনার প্রিয় হাবিব রাসূলে করিম (সা.) এর প্রতিটি সুন্নত মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সূত্র: কোরআনেরকথা.কম