ফেতনার যুগের আলামত (পর্ব-৪)
লোকজন গাড়িতে আরোহণ করে মসজিদে আসবে: এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ফেতনার যুগে লোকেরা ‘মায়াসির’ এর ওপর আরোহণ করে আসবে এবং মসজিদের দরজায় এসে নামবে।
‘মায়াসির’ আরবি শব্দ। মূল্যবান রেশমি কাপড়কে ‘মায়াসির’ বলা হয়। সে যুগে আমির-উমারাগণ ঘোড়ার পিঠের গদির ওপর এটি ব্যবহার করত। আগের যুগে এটি কল্পনা করা কঠিন ছিল যে, একজন মুসলমান মূল্যবান রেশমি কাপড়ে নির্মিত গদির ওপর আরোহণ করে কীভাবে মসজিদে আসবে? কিন্তু বর্তমানে নানারকম মটরগাড়ি আবিস্কৃত হওয়ায় এটি বুঝা আমাদের জন্য সহজ হয়েছে। এখন লোকেরা দামি দামি গাড়িতে আরোহণ করে মসজিদের দরজায় এসে নামে।
আরো দেখুন >>> ফেতনার যুগের আলামত (পর্ব-৩)
নারীরা পোশাক পরিহিত থাকবে অথচ মনে হবে বিবস্ত্র:
নারীরা পোশাক পরিহিত থাকবে অথচ এরপরও বস্ত্রহীন হবে। আগের যুগে এটি বুঝা অনেক কঠিন ছিল যে, পোশাক পরিহিত থেকেও কীভাবে বস্ত্রহীন হয়? কিন্তু আজকে আমরা এটি ঠিকই দেখছি; মেয়েরা এত পাতলা পোশাক পরিধান করে যে, দেহের অঙ্গগুলো সবই বাহির থেকে দেখা যায় কিংবা এত সংক্ষিপ্ত পোশাক পরিধান করে যে, দেহের অনেক অঙ্গই উন্মুক্ত থাকে কিংবা পোশাক এতটা টাইট পরিধান করে যে, দেহের অঙ্গগুলো ফুঁটে থাকে।
নারীদের চুল হবে উটের কুঁজের ন্যায়:
নারীদের চুল হবে উটের কুঁজের ন্যায়। আগের যুগের আলেমগণ এ হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পেরেশান হতেন যে, চুল আবার উটের কুঁজের ন্যায় কীভাবে হয়? কারণ উটের কুঁজ অনেক উঁচু হয়, চুল কীভাবে এত উঁচু হবে? কিন্তু কল্পনাতীত অনেক বিষয়কে আজকের যুগ বাস্তব করে দেখিয়েছে। আজকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মেয়েরা চুলকে ফুঁলিয়ে উঁচু করে বাঁধে।
এই নারীরা অভিশপ্ত:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর বলেন, এ নারীরা অভিশপ্ত; এদের ওপর অভিসম্পাত কর। আল্লাহ তায়ালা নারীদেরকে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। যখন নারী পর্দাহীন অবস্থায় বাইরে বের হয় তখন শয়তান তার পিছু নেয় এবং তাকে উকি-ঝুঁকি মেরে দেখে। যখন নারীরা সুগন্ধি ব্যবহার করে পথে-ঘাটে বের হয়, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাদের ওপর অভিসম্পাত হয় এবং ফেরেশতারাও এরূপ নারীদের ওপর অভিসম্পাত করে।
পোশাকের মূল উদ্দেশ্য:
পোশাকের মূল উদ্দেশ্য হলো সতর ঢাকা। কোরআন শরিফে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا
‘আমি তোমাদেরকে পোশাক দান করেছি যাতে তা তোমাদের লজ্জা-সতর ঢাকে এবং তোমাদের শোভা বর্ধন করে। (সূরা : আরাফ, আয়াত : ২৬)।
সুতরাং যে পোশাক সতর ঢাকে না, তা দ্বারা পোশাকের আসল উদ্দেশ্য অর্জিত হয় না। তাই এরূপ পোশাক পরিধান করা সত্ত্বেও পরিহিত ব্যক্তি থাকে উলঙ্গ। আজকাল অনেক দ্বীনদার, পরহেজগার ও নামাজি ব্যক্তিদের মাঝেও শালীন পোশাকের গুরুত্ব কমে গেছে। পোশাকের দ্বারা দেহ আবৃত হচ্ছে কিনা তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হচ্ছে না আর এর কুপ্রভাব পড়ছে আমাদের সমাজের উপর। তাই পরিবারস্থ মেয়েদেরকে শরীয়তসম্মত পোশাক পরিধান করানোর প্রতি আমরা বিশেষ যত্ন নেব, যাতে পর্দা রক্ষা হয় এবং আল্লাহ ও ফেরেশতাদের অভিসম্পাত থেকে আমরা সবাই বেঁচে যাই।
অপরাপর সম্প্রদায় মুসলমানদেরকে গ্রাস করবে:
এক হাদিসে হজরত সাওবান রাদি. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, একটি সময় আসবে যখন পৃথিবীর অপরাপর জাতি তোমাদেরকে গ্রাস করার জন্য একে অন্যকে আহ্বান জানাবে, খাবারের জন্য দস্তরখানে যেরূপ একে অন্যকে আহ্বান করে। দস্তরখান বিছানো হয়েছে, তাতে খাবার দেয়া হয়েছে এবং খাওয়ার জন্য একজন লোক বসেছে, ইতোমধ্যে দ্বিতীয় আরেক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হলো, এরূপ ক্ষেত্রে সাধারণত দস্তরখানে বসা ব্যক্তি আগন্তুককে বলে, আস, আমার সঙ্গে খাবারে শরিক হও।
আজকে মুসলমানদের অবস্থা এরূপই; মুসলমানরা দস্তরখানের খাবার। মুসলমানদেরকে গ্রাস করার জন্য দুনিয়ার বড় বড় শক্তিগুলো যুদ্ধের আয়োজন করছে আর অন্যদেরকে আহ্বান করছে, আস, মুসলমানদেরকে গ্রাস করি। যারা গত একশ বছরের ইতিহাস জানেন, তারা দেখেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত অমুসলিম জাতিগুলো কীভাবে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করছে যে, আচ্ছা; মিসর তোমাদের, সিরিয়া আমাদের, আলজেরিয়া তোমাদের, ফিলিস্তিন ওদের, হিন্দুস্তান ওদের, মরক্কো তোমাদের এবং বার্মা আমাদের।
মুসলমানরা হবে খড়কুটোর মতো:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের সামনে যখন মুসলমানদের ভবিষ্যৎ দুরাবস্থার কথা বলেন তখন সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! তখন কি মুসলমানদের সংখ্যা কম হবে? যার কারণে অন্য জাতি-গোষ্ঠির লোকেরা মুসলমানদেরকে গ্রাস করবে এবং অন্যদেরকেও এর জন্য আহ্বান করবে? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, না, তখন তোমাদের সংখ্যা অনেক বেশি হবে, আজকে পৃথিবীতে মুসলমানদের সংখ্যা একশো কোটির উপরে। বলতে গেলে জনসংখ্যায় মুসলমানরা পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ, এরপর কিন্তু বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া খড়কুটার মতো অবস্থা হবে তোমাদের, খড়কুটোর যেরূপ কোনো শক্তি নেই, নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেই, নিজের ইচ্ছা বলে কিছু নেই বরং পানি যেদিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, সেদিকে ভেসে যায়...।
মুসলমানরা হীনবল হয়ে যাবে:
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের শত্রুদের হৃদয় থেকে তোমাদের ভয় তুলে নেবেন এবং তোমরা দুর্বল ও হীনবল হয়ে পড়বে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করেন, দুর্বল ও হীনবল হওয়ার অর্থ কি?’ সাহাবায়ে কেরাম বুঝতে পারছিলেন না যে, মুসলমান আবার দুর্বল ও হীনবল হয় কি করে? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মুসলমানদের হৃদয়ে দুনিয়ার মহব্বত এবং মৃত্যুর প্রতি ঘৃণা জন্মাবে।’ মৃত্যুর প্রতি ঘৃণা জন্মাবে, এর অর্থ হলো আল্লাহ তায়ালার সাক্ষাতকে অপছন্দ করবে এবং একটিই ফিকির থাকবে যে, কীভাবে অর্থ উপার্জন হয়, সম্মান ও পদ লাভ হয় এবং খ্যাতি অর্জিন হয়; সেটা হালালভাবে হোক কিংবা হারাম পন্থায় হোক।
সাহাবায়ে কিরাম রাদি. এর সাহসিকতা:
সাহাবায়ে কেরাম রাযিআল্লাহু আনহুমের সাহসিকতার হাজারো ঘটনা ইতিহাসের পাতায় বিদ্যমান আছে। একবার এক যুদ্ধে একজন সাহাবি একা পেছনে রয়ে যান। শত্রুর সৈন্যরা তাকে ঘিরে ফেলে। তিনি একাই তাদের সঙ্গে লড়াই করার অভিপ্রায়ে অগ্রসর হন। ইতোমধ্যে আরো কয়েকজন সাহাবি তার সাহায্যে পৌঁছে যায়। তারা তাকে বলেন, তুমি একা, শত্রুরা সংখ্যায় অনেক; এ মুহূর্তে লড়াই না করে পিছু হটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তিনি বলেন, আমি তোমাদেরকে কসম দিচ্ছি যে, তোমরা আমার ও জান্নাতের মাঝে প্রতিবন্ধক হওয়ার চেষ্টা কর না। শত্রুর সৈন্যরা তো আমার জান্নাতে যাওয়ার অসিলা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যের বরকতে সাহাবায়ে কেরাম রাজিআল্লাহু আনহুমের হৃদয় থেকে দুনিয়ার মহব্বত বিদূরিত হয়েছিল। তাই মুসলমান হীনবল হতে পারে এটা তারা বুঝতে পারছিলেন না। তাদের ফিকিরে সর্বদাই ছিল আখেরাত। জান্নাত ও জাহান্নাম তারা দেখতে পেতেন। তাই তারা মরতে ভয় পেতেন না। বরং আল্লাহর কাছে পৌঁছার উপায় সন্ধান করে ফিরতেন।
এক সাহাবির শাহাদাতের আগ্রহ:
এক সাহাবি যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হলেন। দেখলেন সামনে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সৈন্যবাহিনী আক্রমণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তার মুখ থেকে আচমকা নিম্নের পঙ্ক্তিটি বেরিয়ে এলো,
غدا نلقي الاحبة+محمدا وصحبه
বাহ! কি দারুণ দৃশ্য, কাল আমি বন্ধুদের সঙ্গে অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিদের সঙ্গে দেখা করব।’
এক সাহাবির বুকে এসে তীর বিদ্ধ হয়। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। তা দেখে তিনি স্বগতকণ্ঠে বলে উঠেন,
فُزْتُ ورب الكعبة
কাবার রবের কসম, আমি সফলকাম হয়ে গেছি।
তারা ছিলেন ঈমান ও বিশ্বাসের মূর্তপ্রতীক। আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসাই ছিল তাদের একমাত্র পুঁজি। দুনিয়ার ভালোবাসা তাদের হৃদয়-মন থেকে সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হয়েছিল।
ফেতনার যুগের জন্য প্রথম নির্দেশ:
ফেতনার যুগে একজন মুসলমান কি কর্মপন্থা অবলম্বন করবে এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম নির্দেশ হলো,
تلزم جماعة المسلمين وامامهم
বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠী ও তাদের ইমামের সঙ্গে জামাতবদ্ধ হয়ে থাকো এবং যারা মুসলিম ইমামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাদেরকে ত্যাগ করো। এক সাহাবি প্রশ্ন করেন, যদি মুসলমানদের বড় দল এবং ইমাম না থাকে তা হলে মানুষ কি করবে? অর্থাৎ যখন মুসলমানদের একক দল থাকবে এবং তাদের এমন কোনো নেতা থাকবে যার দ্বীনদারিতা, আমানতদারিতা এবং তাকওয়ার ওপর আস্থা রাখা যাবে তখন তো উক্ত ইমামের আনুগত্য করব। কিন্তু যদি মুসলমানদের একক দল না থাকে কিংবা নির্ভরযোগ্য ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য কোনো ইমাম না থাকে তখন কি করব?
উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরূপ অবস্থায় সব দল ও পার্টি থেকে আলাদা হয়ে একাকী জীবনযাপন কর এবং নিজ ঘরের চাটাই বনে যাও। আগের যুগে বিছানারূপে চাটাই ব্যবহার করা হত। বর্তমানে তার জায়গায় এসেছে কার্পেট। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথার মর্ম হলো, ঘরের বিছানা এবং কার্পেট যেরূপ একবার বিছানো হলে বারবার উঠানো হয় না, তদ্রুপ তোমরাও নিজ ঘরে বিছানা ও কার্পেটের মতো থাক এবং বিনা প্রয়োজনে ঘর ছেড়ে বের হয়ো না; ‘একলা চল নীতি’ গ্রহণ কর। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।
ফেতনার যুগের জন্য দ্বিতীয় নির্দেশ:
এক হাদিসে আছে, যখন তোমরা লোকসমাজ থেকে আলাদা হয়ে একাকী জীবনযাপন করবে তখন মুসলমানরা যদি পরস্পরে লড়াই ও সঙ্ঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং তাদের মাঝে গুম ও হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে, এসব ঘটনা দেখার জন্য ঘর থেকে উঁকিও দেবে না। কারণ যে ব্যক্তি দেখার জন্য ঘর থেকে উঁকি দেবে, ফেতনা তাকেও তাতে জড়িয়ে ফেলবে। তাই এরূপ পরিস্থিতিতে নিজ ঘরে জমে বসে থাকবে।
চলবে...