ঢাকা,  শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

[ ধর্ম ]

ফেতনার যুগের আলামত (পর্ব-৩)

ওমর শাহ
প্রকাশিত: ১৮:২২, ১৮ আগস্ট ২০২০
ফেতনার যুগের আলামত (পর্ব-৩)
মসজিদ বানানো হয় আল্লাহর জিকির করার জন্য। ইবাদতকারী ও জিকিরকারীদের ইবাদত ও জিকিরে যাতে কোনোরূপ বিঘ্ন না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রতিটি মুসল্লির কর্তব্য।

এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِنَّ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ أَيَّامًا، يُرْفَعُ فِيهَا العِلْمُ، وَيَنْزِلُ فِيهَا الجَهْلُ، وَيَكْثُرُ فِيهَا الهَرْجُ وَالهَرْجُ, القَتْلُ

‘তোমাদের পরে এমন একটি যুগ আসবে যখন ইলম তুলে নেয়া হবে এবং হারায’র সংখ্যা অনেক বেশি হবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হারায কি জিনিস? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হত্যা ও লুটতরাজ। অর্থাৎ সেই যুগে গুম, হত্যা ও লুটতরাজ এত বেশি হবে যে, মানুষের জীবন মশা-মাছির চেয়েও মূল্যহীন হবে।’ (বুখারি)।

অন্য আরেক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

يَأْتِيَ عَلَى النَّاسِ يَوْمٌ لَا يَدْرِي الْقَاتِلُ فِيمَ قَتَلَ، وَلَا الْمَقْتُولُ فِيمَ قُتِلَ " فَقِيلَ, كَيْفَ يَكُونُ ذَلِكَ؟ قَالَ, الْهَرْجُ، الْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِي النَّارِ

‘একটি যুগ এরূপ আসবে, যখন হত্যাকারী জানবে না কেন সে হত্যা করেছে এবং নিহত ব্যক্তি জানবে না কেন তাকে হত্যা করা হয়েছে। (মুসলিম)।

আরো পড়ুন >>> ফেতনার যুগের আলামত (পর্ব-২)

তৃতীয় পর্ব...

৫১. জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সম্পদকে নিজের সম্পদ মনে করা হবে।

৫২. আমানতের মালকে লুটের মাল মনে করা হবে।

৫৩. জাকাতকে জরিমানা মনে করা হবে।

৫৪. সমাজের সবচেয়ে নীচ ও নিকৃষ্ট ব্যক্তিকে লোকেরা নিজেদের নেতা বানাবে। 

৫৫. মানুষ নিজের পিতার অবাধ্যতা করবে।

৫৬. এবং মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবে।

৫৭. বন্ধুদের ক্ষতি করতে দ্বিধা করবে না।

৫৮. স্ত্রীর আনুগত্য করবে।

৫৯. বদকার লোকেরা মসজিদে শোরগোল করবে।

৬০. গায়িকা নারীদের সম্মান করা হবে। অর্থাৎ যে নারীরা গান-বাজনার পেশায় থাকবে তাদেরকে সম্মানের চোখে দেখা হবে।

৬১. বাদ্যযন্ত্র এবং বাজনার বিভিন্ন উপকরণকে বিশেষ যত্ন করা হবে।

৬২. রাস্তার মোড়ে মোড়ে মদের দোকান হবে।

৬৩. জুলুম-অত্যাচার করাকে গর্বের বিষয় মনে করা হবে।

৬৪. আদালতে ন্যায়বিচার বিক্রি হবে। অর্থাৎ বিচারপ্রার্থী ন্যায়ের ওপর হলেও পয়সা দিয়ে রায় নিজের পক্ষে নিতে হবে।

৬৫. পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

৬৬. কোরআন শরিফকে গানের সূরে তেলাওয়াত করা হবে। কোরআনকে বুঝার জন্য অথবা সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে কিংবা দাওয়াতের উদ্দেশ্যে তেলাওয়াত করা হবে না।

৬৭. হিংস্র পশুর চামড়া ব্যবহার করা হবে।

৬৮. উম্মতের শেষ যুগের লোকেরা প্রথম যুগের লোকদের ওপর বিভিন্ন অপবাদ আরোপ করবে। তাদের সমালোচনা করবে এবং বলবে, তারা এই এই কথা ভুল বলেছে। আজকের যুগে দেখা যায়, উম্মতের শ্রেষ্ঠ জামাত সাহাবায়ে কিরামের সঙ্গে অনেকে বেয়াদবি করছে। যাদের মাধ্যমে আমরা দ্বীন পেয়েছি, তাদেরকে বেকুব, মূর্খ ও ধর্মান্ধ বলছে।

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, উপরিউক্ত আলামতগুলো যখন প্রকাশ পাবে তখন,

৬৯. হয়ত তোমাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে লালবর্ণের তুফান আসবে।

৭০. অথবা ভূমিকম্প আসবে।

৭১. অথবা লোকদের চেহারা বিকৃত হবে।

৭২. অথবা আকাশ থেকে পাথর বর্ষিত হবে। কিংবা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অন্য কোনো আজাব আসবে।

উপরিউক্ত আলামতগুলো নিয়ে একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে আমাদের সমাজে উপরিউক্ত প্রতিটি আলামত বিদ্যমান এবং সমাজে বর্তমানে যে অশান্তি বিরাজ করছে তা মূলত উপরে বর্ণিত বদ আমলগুলোরই ফল। 

মসিবতের পাহাড় ভেঙ্গে পড়বে:

অন্য একটি হাদিসে হজরত আলি রাদি. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন আমার উম্মতের মাঝে পনেরটি কাজ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে তখন তাদের ওপর মসিবতের পাহাড় ভেঙ্গে পড়বে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, সেই পনেরটি কাজ কি? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

১. যখন রাষ্ট্রীয় সম্পদকে লুটের মাল মনে করা হবে...। দেখুন আজকে কীভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করা হচ্ছে। এটা শুধু শাসকবর্গের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয় বরং যখন ক্ষমতাসীনরা লুটপাট করে তখন জনসাধারণের মধ্য থেকে যারা সুযোগ পায় তারাও লুটপাট করে। অনেক কাজই এরূপ আছে যার কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদ যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আমরা এ বিষয়টিকে বিলকুল পরোয়া করি না। যেমন, বিদ্যুৎ চুরি; বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ নিয়ে পুরোদমে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদে চুরি। এমনিভাবে সরকারি টেলিফোন রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার করা ও টিকেট ছাড়া ট্রেনে সফর করা কিংবা সেকেন্ড ক্লাসের টিকেট কেটে ফার্স্ট ক্লাসে ভ্রমণ করাও রাষ্ট্রীয় সম্পদে চুরি করা।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করা সাধারণ চুরির চেয়ে বেশি মারাত্মক। কারণ কেউ যদি কোনো মানুষের ঘরে চুরি করে এবং পরবর্তীতে তার ক্ষতিপূরণ দিতে চায় তা হলে ক্ষতিপূরণ দেয়া সহজ; যত টাকা সে চুরি করেছে ওই পরিমাণ টাকা ফেরত দিয়ে দেবে অথবা তার কাছে যেয়ে মাফ করিয়ে নেবে যে, ভুলে আমার থেকে কাজটি হয়ে গেছে, আমাকে মাফ করুন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পদ জনগণের; রাষ্ট্রের অর্ন্তগত কোটি কোটি মানুষ এ সম্পদের অংশীদার। যদি কেউ এ সম্পদ চুরি করে কিংবা অপচয় বা অপব্যয় করে তা হলে ক’জনের কাছ থেকে সে মাফ নেবে? যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সব জনগণ থেকে মাফ না করাবে ততক্ষণ পর্যন্ত চুরির অপরাধ মাপ হবে না। তাই সাধারণ চুরি অপেক্ষা রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করার পর মাফ নেয়া অনেক কঠিন। আল্লাহ তায়ালার কাছে এ থেকে পানাহ চাই।

২. যখন আমানতের মালকে লুটের মাল মনে করা হবে এবং তাতে খেয়ানত করবে।

৩. যখন লোকেরা জাকাতকে জরিমানা এবং ট্যাক্স মনে করবে।

৪. মানুষ স্ত্রীর আনুগত্য করবে এবং মায়ের অবাধ্যতা করবে অর্থাৎ মানুষ স্ত্রীকে খুশি করার জন্য মাকে অসন্তুষ্ট করবে।

৫. মানুষ বন্ধুর সাথে ভালো ব্যবহার করবে এবং পিতার সাথে অসদ্ব্যবহার করবে অর্থাৎ বন্ধুর সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করবে কিন্তু পিতার সাথে রূঢ় ও কঠোর আচরণ করবে।

৬. মসজিদে শোরগোল হবে। মসজিদ বানানো হয় আল্লাহর জিকির করার জন্য। ইবাদতকারী ও জিকিরকারীদের ইবাদত ও জিকিরে যাতে কোনোরূপ বিঘ্ন না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রতিটি মুসল্লির কর্তব্য। কিন্তু লোকেরা মসজিদে উঁচু আওয়াজে কথা বলে এবং শোরগোল করে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। আলহামদুলিল্লাহ, আজকাল তো মসজিদে বিবাহ পড়ানোর রেওয়াজ চালু হয়েছে। এটা ভালো, কিন্তু বিবাহের সময় মসজিদের সম্মানের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয় না; অনেক শোরগোল করা হয়। কিছু কিছু গুনাহ আছে যেগুলো করতে আনন্দ ও মজা লাগে কিন্তু এটি এমন এক গুনাহ, এটি করতে কোনো মজা ও আনন্দ নেই অথচ বিনা প্রয়োজনেই আমরা আমাদের মাথায় এ গুনাহর বোঝা তুলে নেই।

৭. সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও নীচ ব্যক্তিকে নেতা বানানো হবে।

৮. অনিষ্টের ভয়ে মানুষকে সম্মান করা হবে। কারণ তার সম্মান করা না হলে সে কোনো না কোনোভাবে আমাকে ফাঁসিয়ে দেবে।

৯. ব্যাপকভাবে মদ পান করা হবে।

১০. ব্যাপকভাবে রেশমি কাপড় পরিধান করা হবে।

১১. ঘরে নর্তকী ও গায়িকা রাখা হবে এবং বাদ্যযন্ত্র ও নাচ-গানের উপকরণকে যত্নসহকারে রাখা হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এ কথা বলেছিলেন, তখন অনেকের মনে এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল যে, প্রত্যেক ব্যক্তি কীভাবে ঘরে নর্তকী ও গায়িকা রাখবে? কারণ প্রত্যেক ব্যক্তির এতটুকু আর্থিক সামর্থ্য কোথায় যে, সে নর্তকী ও গায়িকার ব্যয়ভার বহন করবে এবং যখন ইচ্ছা নাচ-গান দেখবে ও শুনবে? কিন্তু আজকাল রেডিও, সিডি-ভিসিডি, টিভি, স্যাটেলাইট টিভি, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ইত্যাদি বিষয়টিকে সহজ করে দিয়েছে। এখন প্রত্যেক ব্যক্তির ঘরেই রেডিও, টেলিভিশন ও ভিসিডি আছে এবং প্রত্যেক ব্যক্তির পকেটেই মোবাইল ফোন আছে; যখন ইচ্ছা নাচ-গান দেখা ও শোনা যায়। এখন আর বাদ্যযন্ত্র কেনার প্রয়োজন পড়ে না। ব্যস, টিভি অন কর, তা দ্বারাই বাদ্যযন্ত্র, নর্তকী ও গায়িকা রাখার উদ্দেশ্য হাসিল হয়।

১২. এ উম্মতের পরবর্তী লোকেরা পূর্ববর্তী লোকদের ওপর অভিসম্পাত করবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরিউক্ত আলামতগুলো বর্ণনা করে বলেন, এ আলামতগুলো যখন মুসলিম সমাজে দেখা দেবে তখন মসিবতের পাহাড় ভেঙ্গে পড়বে। এ আলামতগুলোর অধিকাংশই আজ আমাদের সমাজে বিদ্যমান। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে হেফাজত করুন।

শরাবকে শরবত নামে পান করা হবে:

অন্য এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন আমার উম্মত শরাবকে শরবত মনে করে পান করবে...। উদাহরণত, শরাব সম্পর্কে বলবে, এটা তো শরবত; এটা হারাম হওয়ার কি আছে? বর্তমানে এই মর্মে অনেক প্রবন্ধ লেখা হচ্ছে যে, বর্তমান যুগের শরাব হারাম নয় এবং কোরআন শরিফে শরাব হারাম এ ধরনের কোনো শব্দ নেই। তাই বিয়ার ও ভদকা হারাম নয়। এভাবেই শরাব হালাল করার জন্য বিভিন্নভাবে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা হচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চোদ্দশত বছর পূর্বে এরই সংবাদ দিয়ে গেছেন।

সুদকে ব্যবসায় নাম দেয়া হবে:

যখন আমার উম্মত সুদকে ব্যবসা বলে হালাল করবে..। যেমন, আজকাল সুদকে মুনাফা ও ব্যবসা নাম দেয়া হচ্ছে, বলা হচ্ছে, ব্যাংকে যে সুদী লেনদেন হয় তা ব্যবসারই একটি পদ্ধতি। যদি এটি বন্ধ করা হয় তাহলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে যাবে। 

ঘুষকে উপহার নাম দেয়া হবে:

যখন আমার উম্মত ঘুষকে গিফট ও উপহার বলে হালাল করবে...। যেমন: আজকাল ঘুষদাতা আপনাকে গিফট দিলাম বলে ঘুষ দিচ্ছে এবং ঘুষ গ্রহণকারী গিফট বলেই তা গ্রহণ করছে অথচ এটি ঘুষ। যখন আমার উম্মত জাকাতের মালকে ব্যবসার মালরূপে গণ্য করবে তখন উম্মতের ওপর ধ্বংস নেমে আসবে। এ চারটি বিষয় আলোচ্য হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখ করেছেন। এগুলো আজ আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে হেফাজত করুন।

চলবে...

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএজে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!