শিশুরা কি ভোটার নয় বলেই তাদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারে নেই?
একবার ভাবুন একটি ভোটকেন্দ্রের সামনে লম্বা লাইন। কেউ নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে এসেছেন আবার কেউ এসেছেন দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের মত জানাতে। এই মানুষগুলোর সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে এমন অসংখ্য শিশুর জীবনেও যারা নিজেরা ভোট দিতে পারে না তাই রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগও নেই। কিন্তু সত্যিই কি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারে না বলেই শিশুদের স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ার কথা?
আজ তাদের হয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছি, সেগুলোর পরিণতি তাদেরই বয়ে বেড়াতে হবে আগামী বহু বছর। তাই আমার প্রশ্ন হলো, সেই সিদ্ধান্তে তাদের কথা কতটা ভাবা হবে? তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র কতটা মনোযোগী?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে, রাষ্ট্র শিশুদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় বাস্তবে কতটা দায়িত্ব পালন করছে। শিশুদের জন্য কতটা অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে সেইসাথে বিপদের মুখে পড়লে তাদের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং কোথাও ব্যর্থতা থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তরই আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে শিশুদের সুরক্ষা রাষ্ট্রের কাছে কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
শিশুদের সুরক্ষা রাষ্ট্রের কাছে কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে, তা বোঝার একটি উপায় হলো বাজেটের দিকে তাকানো। কারণ, শিশুদের অধিকার রক্ষার কথা বলা আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা এক বিষয় নয়।সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মহিলা ও শিশু খাতে প্রস্তাবিত বরাদ্দ ৫,১৯৭ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের প্রায় ০.৬ শতাংশ। আগের অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ৫,৩৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, নতুন অর্থবছরে এই খাতে প্রস্তাবিত বরাদ্দ ৩.২৪ শতাংশ কমেছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও এই খাতের বরাদ্দ ৭৭২ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৪২৯ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান একা প্রমাণ করে না যে শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে পিছনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কারণ বরাদ্দটি নারী ও শিশু উভয়ের জন্য। কিন্তু শিশুদের জন্য কত টাকা রাখা হলো সেইসাথে কোথায় খরচ হলো আর তাতে তাদের জীবনে কী বদল এলো এইসকল হিসাব প্রকাশ্য ও নিয়মিত না হলে অগ্রাধিকার যাচাই করব কীভাবে?
এরপর শিশুশ্রমের পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের জরিপের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমের হার ২০১৯ সালের ৬.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৯.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য হিসাবে, ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় ১২ লাখ বেশি শিশু এখন শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত। এই সংখ্যার পেছনে প্রতিটি শিশুর আলাদা গল্প আছে। কেউ হয়তো পরিবারের আয় বাড়াতে কাজ করছে, কেউ হয়তো পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, আবার কারও কাছে শৈশবের চেয়ে টিকে থাকাটাই বড় হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতির জন্য রাষ্ট্রই একমাত্র দায়ী, এমন সিদ্ধান্ত এই জরিপ থেকে টানা যায় না। পরিবারের অসচ্ছলতা যদি একটি শিশুকে কাজের পথে ঠেলে দেয় তবে তার শৈশবটুকু রক্ষা করার দায়িত্ব কি শুধু সেই পরিবারের একার? নাকি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেখানে অভাবের কারণে কোনো শিশুকে তার শৈশবের সঙ্গে আপস করতে না হয়?
আজকাল বিপদ শুধু রাস্তা বা কারখানায় থাকে না। কখনো তা ঘরের ভেতরেও থাকে, সেই জায়গায়, যেটিকে আমরা নিরাপদ বলেই ধরে নিই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের জরিপে দেখা যায়, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৬ শতাংশ শিশু জরিপের আগের এক মাসে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ, শিশুকে আঘাত করা এবং চিৎকার করে অপমান করা কিংবা ভয় দেখানোর মতো আচরণও অনেক শিশুর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ। আমরা যদি শাসন আর সহিংসতার পার্থক্যই না করি, তাহলে শিশুরা সাহায্য চাইবে কার কাছে? শিশুর চারপাশের মানুষ যদি তার অধিকারকে সম্মান করতে না শেখে তাহলে কাগজে থাকা আইন বাস্তবে তাকে কতটা সুরক্ষা দিতে পারবে আদতে সেটিও ভাবার বিষয়।
ঘরের বাইরে পরিস্থিতি যে কম উদ্বেগজনক নয়, তা বোঝা যায় নিখোঁজ শিশু ও তাদের ওপর সংঘটিত অপরাধের তথ্যেও। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছিল বা তারা ফিরে এসেছিল। কিন্তু ২ হাজার ৩৮ জন তখনও উদ্ধার হয়নি। একই সময়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই দুটি পরিসংখ্যান থেকেই প্রশ্ন ওঠে যে একটি শিশু নিখোঁজ হলে তাকে দ্রুত খুঁজে বের করা সেইসাথে তার প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর?
শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার তথ্যও এই প্রশ্নকে আরও কঠিন করে তোলে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সংগঠনটির নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে ৩ হাজার ৪৮৭ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ২ হাজার ৫৯৮ শিশুর মৃত্যুর তথ্যও ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এগুলো সংগঠনটির নথিভুক্ত ঘটনা, দেশের প্রতিটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব নয়। তবু এতগুলো নথিভুক্ত ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর শুধু মামলা করাই যথেষ্ট নয় এর সাথে সাথে তদন্ত, বিচার, নির্যাতনের শিকার শিশুর সুরক্ষা এবং পুনর্বাসনও সমান জরুরি। একটি শিশু বিপদে পড়লে তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু তার পরিবারের নয় বরং রাষ্ট্রেরও।
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব যাদের তাদের সক্ষমতার প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের শিশু সুরক্ষাবিষয়ক সামাজিক সেবাকর্মী ব্যবস্থার মানচিত্র ও সক্ষমতা বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় এক লাখ সামাজিক সেবাকর্মীর মাত্র এক-পঞ্চমাংশ রয়েছে, বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক কর্মীদের হিসাবেও। কর্মীর ঘাটতি, অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং পর্যাপ্ত জনবলের অভাব শিশু সুরক্ষার কাজে বড় বাধা। ফলে কোনো শিশু নির্যাতন বা অবহেলার শিকার হলে তার খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনীয় সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা এবং পরবর্তী সময়ে তার পরিস্থিতি অনুসরণ করা কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। আমার মতে এখানে শুধু একজন কর্মীর সদিচ্ছাই নয় সেইসাথে দরকার পর্যাপ্ত জনবল, প্রশিক্ষণ এবং স্পষ্ট দায়িত্ববণ্টন।
এই পরিস্থিতি বদলাতে শুধু আইন বা উদ্যোগ ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। শিশু সুরক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় জনবল এবং অভিযোগের দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বরাদ্দ থেকে শুরু করে তদন্ত ও পুনর্বাসন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি থাকতে হবে। কারণ, একটি শিশু বিপদে পড়ার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো আর তার পাশাপাশি এমন ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই উদ্যোগগুলো কার্যকর করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজসেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। পাশাপাশি বরাদ্দের ব্যবহার, অভিযোগের পর গৃহীত ব্যবস্থা এবং শিশু সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্য ও ব্যর্থতার হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত উদ্যোগের সংখ্যা নয়, বরং তার ফলে কতটা নিরাপদ হলো একটি শিশুর জীবন, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আবার সেই ভোটকেন্দ্রটির কথা ভাবুন। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো ভোট দিয়ে বেরিয়ে যাবেন। নির্বাচিত হবে সরকার, তৈরি হবে বাজেট, নেওয়া হবে নতুন সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তগুলো কি ভোটকেন্দ্রের বাইরে থাকা শিশুটির জীবনেও নিরাপত্তা নিয়ে আসবে? সে ভোট দিতে পারে না, কিন্তু তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নির্যাতন থেকে রক্ষা করা এবং ভয় ছাড়া বড় হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি শিশু রাষ্ট্রকে ভোট দিতে পারে না বলে রাষ্ট্রের কাছ থেকে তার অধিকার কমে যায় না। বরং তার অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রতিটি শিশুর ভবিষ্যৎ যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে না থাকে। আজকের সিদ্ধান্তগুলো এমন হতে হবে, যা তাকে নিরাপদে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেবে। আমাদের দায়িত্ব এমন একটি দেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় পেতে হবে না, আর তার সুন্দর ভবিষ্যৎ কেবল স্বপ্ন হয়ে থাকবে না, বাস্তবেও ধরা দেবে।
-লেখক: সাংবাদিক ও শিশু অধিকারকর্মী