ঢাকা,  রোববার   ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

[ মতামত ]

মানুষের লোভে প্রাণ হারায় অতিথি পাখিরা

শফিকুল ইসলাম খোকন
প্রকাশিত: ১০:৫৪, ১১ অক্টোবর ২০২৬
মানুষের লোভে প্রাণ হারায় অতিথি পাখিরা
একদিন যদি শীত আসে, অথচ বাংলার আকাশে অতিথি পাখির দল আর দেখা না যায়, তবে সেটি শুধু পাখির অনুপস্থিতি হবে না—আমাদের প্রকৃতির গভীর অসুস্থতারও একটি সতর্কসংকেত হবে

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে বাংলার আকাশে ভেসে আসে একদল পরিচিত অথচ দূরদেশি অতিথি। হাওরের জলরাশি, বিলের শান্ত জল, নদীর চর কিংবা উপকূলের কাদামাটিতে খাবারের সন্ধানে নামে নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসা এসব পাখির ডানায় লেখা থাকে প্রকৃতির এক বিস্ময়কর অভিযাত্রার গল্প। 

কিন্তু সেই গল্পের ভবিষ্যৎ আজ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট, জলাভূমি ধ্বংস, বন উজাড়, দূষণ এবং অবৈধ শিকারের সম্মিলিত চাপে বিশ্বজুড়েই হুমকির মুখে পরিযায়ী পাখির অস্তিত্ব। ক্রমে ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে পরিযায়ী পাখি।

প্রতিবছর অক্টোবর ও মে মাসে পালিত হয় বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস। দিবসটির উদ্দেশ্য কেবল পাখির সৌন্দর্য উদ্‌যাপন নয়; বরং তাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আবাসস্থল রক্ষা, মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং দেশ-দেশান্তরে সমন্বিত সংরক্ষণ উদ্যোগ জোরদার করা। 

২০২৬ সালে দিবসটির দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্তর্জাতিক উদ্‌যাপন ১০ অক্টোবর। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘Every Bird Counts – Your Observations Matter!’ অর্থাৎ, প্রতিটি পাখিই গুরুত্বপূর্ণ, আপনার পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। পাখির সংখ্যা, বিচরণক্ষেত্র ও চলাচলের পরিবর্তন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পর্যবেক্ষণও যে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সংরক্ষণ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, সেই বার্তাই তুলে ধরা হয়েছে এবারের আয়োজনে।

বৈশ্বিক পরিসংখ্যান যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে:
পরিযায়ী পাখির সংকট এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দেশের সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য সংকটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের ২০২৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত State of the World’s Birds প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় ৪৫ শতাংশ পরিযায়ী পাখির প্রজাতির সংখ্যা কমছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি নয়টি পরিযায়ী পাখির প্রজাতির একটির বিলুপ্তির হুমকি রয়েছে। সামুদ্রিক আবাসস্থল, বন ও উপকূলীয় জলাভূমিনির্ভর পাখিরা বিশেষভাবে সংকটাপন্ন।

  • জাতিসংঘের পরিযায়ী বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক কনভেনশন (সিএমএস) ২০২৪ সালে প্রকাশিত State of the World’s Migratory Species প্রতিবেদনে জানায়, তাদের কনভেনশনের আওতাভুক্ত পরিযায়ী প্রাণী প্রজাতির ৪৪ শতাংশের জনসংখ্যা কমছে এবং ২২ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে। ২০২৬ সালের হালনাগাদ মূল্যায়নে পরিস্থিতির আরও অবনতির তথ্য উঠে এসেছে। তাতে দেখা যায়, কনভেনশনের আওতাভুক্ত পরিযায়ী প্রজাতির ৪৯ শতাংশের জনসংখ্যা নিম্নমুখী এবং ২৪ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যান শুধু পাখির নয়, পাখিসহ বিভিন্ন শ্রেণির পরিযায়ী প্রাণীর সামগ্রিক পরিস্থিতি নির্দেশ করে।

পরিসংখ্যানগুলো একটি নির্মম বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে—প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী পরিযায়ী প্রাণীদের অস্তিত্ব ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। আর এই সংকটের পেছনে মানুষের কর্মকাণ্ডের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে পরিযায়ী পাখির জীবনচক্র:
পরিযায়ী পাখির জীবন প্রকৃতির ঋতুচক্র, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং উপযুক্ত আবাসস্থলের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শীতের তীব্রতা, জলাশয়ের অবস্থা কিংবা খাদ্যের প্রাচুর্যের ওপর নির্ভর করে অনেক প্রজাতি তাদের বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তন করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটছে।

বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে অনেক অঞ্চলে শীতের সময়কাল, বৃষ্টিপাতের ধরন এবং জলাভূমির পানির স্তরে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা, আবার কোথাও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় আবাসস্থলকে হুমকির মুখে ফেলছে। ফলে পরিযায়ী পাখিরা যেসব স্থানে বিশ্রাম নেয়, খাবার সংগ্রহ করে কিংবা দীর্ঘ যাত্রার জন্য শক্তি সঞ্চয় করে, সেসব স্থান অনুপযোগী হয়ে উঠতে পারে।

বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ও ঋতুচক্রের পরিবর্তন পাখির পরিযায়নের সময়সূচি এবং খাদ্যপ্রাপ্তির মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে। পাখি যে সময়ে কোনো অঞ্চলে পৌঁছায়, সে সময়ে সেখানে পর্যাপ্ত খাদ্য না থাকলে তাদের শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় ব্যাহত হয়। দীর্ঘ যাত্রার পথে এমন পরিস্থিতি বারবার তৈরি হলে প্রজনন ও বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশে এ বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ দেশের হাওর, বিল, নদী, চর ও উপকূলীয় জলাভূমি পরিযায়ী পাখির বিশ্রাম, খাদ্য সংগ্রহ ও আশ্রয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এসব অঞ্চলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হলে তার প্রভাব শুধু স্থানীয় পাখির ওপর নয়, হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে আসা অতিথি পাখির ওপরও পড়তে পারে।

আবাসস্থল হারালে পাখির আকাশও ছোট হয়ে আসে:
পরিযায়ী পাখির জীবন শুধু উড়ে বেড়ানোর গল্প নয়; তাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে একটি বিস্তৃত ভৌগোলিক অঞ্চলের ওপর। প্রজননক্ষেত্র থেকে শীতকালীন আবাসস্থলে পৌঁছাতে গিয়ে তাদের একাধিক স্থানে থামতে হয়। এসব স্থানকে বলা হয় বিরতিস্থল বা স্টপওভার সাইট। এখানে তারা খাবার সংগ্রহ করে, বিশ্রাম নেয় এবং পরবর্তী দীর্ঘ যাত্রার জন্য শক্তি সঞ্চয় করে।

কিন্তু জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কৃষিজমির সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন, নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং উপকূলীয় পরিবেশের পরিবর্তনে এসব আবাসস্থল হারিয়ে যাচ্ছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরতিস্থল ধ্বংস হয়ে গেলে তার প্রভাব একটি নির্দিষ্ট এলাকার পাখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো পরিযায়নপথে পাখির টিকে থাকার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের টাঙ্গুয়ার হাওর এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। 

  • আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই জলাভূমিতে ২০০৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণায় ৬৯ প্রজাতির জলচর পাখির উপস্থিতি নথিভুক্ত করা হয়। গবেষণায় ৪৭টি প্রজাতির জনসংখ্যার প্রবণতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৫৯ শতাংশ প্রজাতির সংখ্যা কমার প্রবণতা ছিল; অন্যদিকে ৪১ শতাংশ প্রজাতির সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। তবে সব প্রজাতির সামগ্রিক সংখ্যা একই দিকে এগিয়েছে, এমন নয়। গবেষণাটি জলাভূমির পরিবেশগত অবস্থা ও পাখির জনসংখ্যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তুলে ধরে।

এই গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো জলাভূমিতে একসময় বিপুলসংখ্যক পাখি দেখা গেলেই সেখানে তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। পাখির প্রজাতিভিত্তিক সংখ্যা, দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা, খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং আবাসস্থলের মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

নির্বিচার শিকার: মানুষের লোভে প্রাণ হারায় অতিথি পাখি
প্রকৃতির বিরূপ পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেওয়া পাখিরা যখন বাংলাদেশের জলাভূমিতে এসে পৌঁছায়, তখনও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। কিছু অসাধু ব্যক্তি মাংসের চাহিদা, বিক্রির লোভ কিংবা নিছক বিনোদনের জন্য পাখি শিকার করে। ফাঁদ পাতা, জাল ব্যবহার, বিষটোপ প্রয়োগ এবং অবৈধভাবে পাখি ধরে বিক্রির মতো কর্মকাণ্ড তাদের অস্তিত্বের জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি।

  • দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা পাখিদের শরীরে তখন পর্যাপ্ত শক্তি সঞ্চয়ের প্রয়োজন থাকে। এ সময় শিকার, মানুষের অতিরিক্ত উৎপাত কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব তাদের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে হুমকির মুখে থাকা পরিযায়ী পাখির ক্ষেত্রে শিকার ও ফাঁদে আটকে ফেলার মতো কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তবে পাখির সংখ্যা হ্রাসের কারণ অঞ্চল ও প্রজাতিভেদে ভিন্ন হতে পারে; কোথাও আবাসস্থল ধ্বংস, কোথাও কৃষির নিবিড়তা, আবার কোথাও জলবায়ু পরিবর্তন প্রধান ভূমিকা পালন করে।

অতএব, পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণে শুধু শিকার বন্ধ করলেই চলবে না। পাখির আবাসস্থল রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যশৃঙ্খল অক্ষুণ্ন রাখা এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপ কমানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্যসংকট ও দূষণের অদৃশ্য আঘাত:
পরিযায়ী পাখির অনেক প্রজাতি জলজ পোকামাকড়, ছোট মাছ, শামুক, কাদায় বসবাসকারী অমেরুদণ্ডী প্রাণী কিংবা জলজ উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল। জলাভূমি দূষিত হলে, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হলে অথবা প্রাকৃতিক খাদ্যভান্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হলে এসব পাখির খাদ্যপ্রাপ্তি কমে যায়।

  • শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক, কৃষিজ রাসায়নিক এবং অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য জলাশয়ের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে জলাভূমিতে অতিরিক্ত মাছ ধরা, পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন পাখির খাদ্য সংগ্রহের সুযোগ সংকুচিত করে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার: পাখির সংখ্যা কমে যাওয়া মানেই সব ক্ষেত্রে সরাসরি খাদ্যসংকটই একমাত্র কারণ নয়। খাদ্যের প্রাপ্যতা, আবাসস্থলের গুণমান, শিকার, রোগ, জলবায়ু এবং প্রজননের সাফল্য—সবকিছু মিলিয়ে জনসংখ্যার পরিবর্তন ঘটে। তাই কার্যকর সংরক্ষণের জন্য অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।

পরিযায়ী পাখি হারালে ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রকৃতির ভারসাম্য
পরিযায়ী পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না; তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি পোকামাকড়ের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে, বীজ বিস্তারে সহায়তা করে এবং জলাভূমির খাদ্যজালের অংশ হিসেবে বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখে।

  • তাদের উপস্থিতি একটি এলাকার পরিবেশগত অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবেও কাজ করতে পারে। কোনো জলাভূমিতে নির্দিষ্ট প্রজাতির পাখির উপস্থিতি কমে গেলে কিংবা তাদের আগমনের সময় বদলে গেলে সেটি আবাসস্থল, খাদ্যপ্রাপ্তি বা জলবায়ুর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।

সুতরাং পরিযায়ী পাখির সংকটকে শুধু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জলাভূমি ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা এবং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

আইন আছে, প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ:
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য আইনি কাঠামো রয়েছে। তবে আইন ও বিধানের কার্যকারিতা নির্ভর করে সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর।

  • পাখি শিকারের প্রবণতা রয়েছে এমন জলাভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ বিচরণক্ষেত্রে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। অবৈধভাবে পাখি ধরা, পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ে তোলা জরুরি।

তবে আইনের সঠিক প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের মনোভাব পরিবর্তন করাও গুরুত্বপূর্ণ। পাখি শিকারকে বিনোদন বা সহজ আয়ের উপায় হিসেবে দেখার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। বিদ্যালয়, কলেজ, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।

সংরক্ষণে দরকার বিজ্ঞান, জনসম্পৃক্ততা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা:

পরিযায়ী পাখি কোনো একটি দেশের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ নয়। একটি পাখি প্রজননের জন্য এক দেশে, শীতকালীন আশ্রয়ের জন্য অন্য দেশে এবং যাত্রাপথে আরও কয়েকটি দেশে অবস্থান করতে পারে। তাই একটি দেশের বিচরণক্ষেত্র রক্ষা করলেও অন্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে গেলে তার অস্তিত্ব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এ কারণে পরিযায়নপথজুড়ে দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়, যৌথ গবেষণা এবং আবাসস্থল সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। একই সঙ্গে পাখির সংখ্যা গণনা, প্রজাতি শনাক্তকরণ, আগমনের সময় নথিভুক্ত করা এবং বিচরণক্ষেত্রের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। 

২০২৬ সালের বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবসের প্রতিপাদ্যেও এই জনসম্পৃক্ত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, পাখিপ্রেমী, শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করলে কোন প্রজাতির সংখ্যা কমছে, কোন জলাভূমি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং কোথায় দ্রুত সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন—তা চিহ্নিত করা সহজ হবে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিতে নিয়মিত পাখি গণনা, প্রজাতিভিত্তিক তথ্যভান্ডার তৈরি, আবাসস্থলের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এবং সংরক্ষণ উদ্যোগের ফলাফল মূল্যায়ন করা দরকার। সংরক্ষিত এলাকাগুলোতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, যাতে প্রকৃতি রক্ষার সঙ্গে মানুষের জীবিকা ও আর্থসামাজিক বাস্তবতার সমন্বয় ঘটে।

এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত:
বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পাখির কলতানে মুখর প্রকৃতি রেখে যেতে পারব?

  • আজ যেসব পাখি শীতের সকালে হাওরের পানিতে ভেসে বেড়ায়, নদীর চরে খাবার খোঁজে কিংবা উপকূলের কাদামাটিতে আশ্রয় নেয়, আগামী দিনে তাদের দেখা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে—যদি আমরা তাদের আবাসস্থল ধ্বংস করি, নির্বিচার শিকার চলতে দিই এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিই।

তবে পরিস্থিতি অপরিবর্তনীয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোরও কারণ নেই। বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, শিকার বন্ধ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অনেক প্রজাতির জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব।

এ জন্য প্রথমেই পাখির আবাসস্থলকে উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের সময় জলাভূমি, বন, নদী ও উপকূলীয় পরিবেশের গুরুত্ব বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

পাখি শিকার না করা, পাখি বা বন্যপ্রাণীর অবৈধ বেচাকেনায় অংশ না নেওয়া, জলাভূমিতে ময়লা না ফেলা এবং পাখির নিরাপদ বিচরণে বাধা সৃষ্টি না করাও ব্যক্তিপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

শেষ কথা হলো, পরিযায়ী পাখিরা আমাদের কাছে কোনো দেশের সীমানায় আটকে থাকা সম্পদ নয়; তারা পৃথিবীর সম্মিলিত প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করা মানে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা, আগামী প্রজন্মের জন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা।

একদিন যদি শীত আসে, অথচ বাংলার আকাশে অতিথি পাখির দল আর দেখা না যায়, তবে সেটি শুধু পাখির অনুপস্থিতি হবে না—আমাদের প্রকৃতির গভীর অসুস্থতারও একটি সতর্কসংকেত হবে। সেই দিন আসার আগেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে: পাখির নিরাপদ আকাশ নিশ্চিত করব, নাকি নিজেদের অবহেলায় তাদের হারিয়ে যেতে দেব?

পরিযায়ী পাখি যেন কেবল বইয়ের ছবি কিংবা ইতিহাসের স্মৃতি হয়ে না থাকে। তাদের ডানায় ভর করেই ফিরে আসুক প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ, জলাভূমির প্রাণচাঞ্চল্য এবং পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের সৌন্দর্য।

লেখক: শফিকুল ইসলাম খোকন, সাংবাদিক কলাম লেখক ও গবেষক।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!