লেখকদের সর্বজনীনতা ও রাজনীতি
সাহিত্যের ইতিহাসে আমরা লক্ষ্য করি যেসব কবি লেখক সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের সাহিত্য গুনে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। তারা প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট কোন দল-মত বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি হয়ে থাকেন নি। নির্দিষ্ট গন্ডি পেরিয়ে তারা হয়ে উঠেছেন সমগ্র জাতির, পৌঁছে গেছেন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়।
তাদের রচিত কবিতা গল্প উপন্যাস একদিকে যুগের বাস্তবতাকে ধারণ করেছে অন্যদিকে চিরন্তন অনুভূতি মানুষের প্রেম, বেদনা ও যাপিত জীবনের সুখ দুঃখ স্বাধীনতা মানবিকতা কে এমন ভাবে প্রকাশ করেছেন যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সবাই নিজেদের সাহিত্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।
অথচ বর্তমান সময়ে দেখা যায় অনেক লেখক নির্দিষ্ট একটা গোষ্ঠী, সাহিত্যচক্র ও যেকোনো একটি মতাদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যায় তাদের পরিচিত সেই নির্দিষ্ট বৃত্তের বাইরে খুব একটা বিস্তৃত হয়ে না।
এর কারণ কি? প্রথম কারণ হল গোষ্ঠী কেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চা করার প্রবণতা বর্তমান বেড়ে গেছে এর ফলে সেই লেখক আর সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না।
মতাদর্শের সংকীর্ণতা, প্রত্যেক লেখক এর ব্যক্তিগত বিশ্বাস থাকতে পারে কিন্তু যখন সাহিত্য কেবল একটি রাজনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রচার মাধ্যমে পরিণত হয়। শুধুমাত্র মতবাদের উপর ভিত্তি করে লেখক এর লেখা বিবেচনা করা হয় ফলে লেখকদের গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন সীমিত হয়ে যায়।
আবার বর্তমান লেখকদের মাঝে যেই বিষয়টা ব্যাপক হরে দেখা দিচ্ছে তা হল লেখকদের উদাসীনতা। শুধুমাত্র প্রশংসা পাওয়ার জন্য নিজস্ব গোষ্ঠীর অনুমোদনকে সাফল্য মনে করেন ফলে বৃহত্তম পাঠক সমাজের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে না। সমালোচনা সহ্য করার মত ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে।
ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক আব্দুল হাই ১৩৬৪ সালে সমকাল পত্রিকায় "তোষামোদের ভাষা" এবং একই পত্রিকায় ১৩৬৫ জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় রাজনীতির ভাষা শিরোনামে দুটি প্রবন্ধ লেখেন। এই থেকে বোঝা যায় রাজনীতির গন্ধ খোঁজার সংস্কৃতি আগেও যেমন ছিল বর্তমানেও আরো ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে।
- একজন লেখকের পক্ষে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকাটা প্রায় অসম্ভব। তবে একজন দায়িত্বশীল লেখকের কাজ হল ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিজের অবস্থানকে যুক্তি সততার সাথে সংবেদনশীলতা প্রকাশ করা তথ্যকে বিকৃত না করা।
সাহিত্যে সব সময় একটি দল ও মত আদর্শের প্রভাব থাকে তবে সব লেখক এক নয়। কিছু লেখক মতাদর্শের তোষামোদ সমাজ করলেও অনেকেই ব্যক্তি সমাজে জীবনে বাস্তব তা ছিল সত্যটি তুলে ধরেন।
বাংলা সাহিত্যে বিখ্যাত কবিগণ প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম সরাসরি রাজনীতির সাথে সক্রিয় ছিলেন তৎকালীন সময়ে ধূমকেতু পত্রিকা য় ব্রিটিশ বিরোধী বক্তব্য প্রকাশ করার কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবার আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি জীবনানন্দ দাশ সরাসরি রাজনীতিতে অংশ নেননি।
কাজী নজরুল ইসলাম সমাজের অসংগতি, বৈষম্য, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অকপটে উচ্চারণ করেছেন ঔপনিবেশিক শাসনের অত্যাচার, ধর্মীয় গোরামি, সাম্প্রদায়িকতা এবং মানুষের ওপর শোষণের বিরুদ্ধে তিনি দৃঢ় কন্ঠে প্রতিবাদ করেছেন এ কারণে তাকে জেল ও খাটতে হয়েছে। অনেকেই লেখক সাময়িক জনপ্রিয়তা অর্জন বা পুরস্কার পাওয়ার জন্য দলগত মতাদর্শের স্থিতিমূলক লেখা লেখে থাকেন।
সাহিত্যের মূল কাজ হল অসংগতি লুকানো সত্য তুলে ধরা তবে অনেকেই ভয় অথবা প্রলোভনের তোয়াক্কা না করে একদম নির্মমভাবে সত্য বাস্তবে সাহিত্যে পাতায় ফুটিয়ে তোলেন। তবে সেটির সংখ্যা বর্তমান খুবই কম দেখা যাচ্ছে।
এর মধ্যে কিছু লেখকের দর্শন অনুযায়ী মানবতাবাদ, মার্কসবাদ ও নারীবাদ বিশ্বাসী হয়ে নিজেকে ব্যাখ্যা করেন। লেখকদের স্বাধীন চিন্তার চর্চা করতে হবে কোন দল বা গোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতি থাকতেই পারে কিন্তু সত্য ন্যায়ের প্রশ্নে লেখক এর বিবেক হওয়া উচিত প্রধান আশ্রয়। সাহিত্য যদি স্বাধীন না হয় তবে সাহিত্য স্থায়িত্ব কমে যায়।
লেখকদের সর্বজনীনতা বলতে যা বোঝায় জাতি ধর্ম ভাষা বর্ণ কিংবা রাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ ও মর্যাদা কে গুরুত্ব দেয়া। অন্যদিকে রাজনীতি হলো মানুষের মৌলিক অধিকার, ক্ষমতা, রাষ্ট্র, ন্যায়বিচার ও সামাজিক সম্পর্কের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
- সর্বজনীন লেখক হতে গেলে প্রথমে পাঠকের মন বুঝতে হবে এবং মানুষের জীবনযাপন সংগ্রাম, বেদনা, স্বপ্ন, দুঃখ ব্যর্থতাকে লেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে হবে। লেখকদের নিজস্ব ভাষা থাকতে হবে এবং দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত করতে হবে।
তেমনই কবি আল মাহমুদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা বিতর্কিত হয়ে থাকলেও তার সাহিত্যকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বহু সাহিত্য সমালোচকরা দলমতের ঊর্ধ্বে গিয়ে আলোচনা করেছেন। তার কবিতায় যেমন বাংলার মাটি ও মানুষের কথা উঠে এসেছে তেমনি ইতিহাস মানবতা ও প্রেম নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। সোনালি কাবিন, লোক লোকান্তর, কালের কলস, প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ সাহিত্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
ভাষার শক্তি লোকজ সাহিত্যের ব্যবহার কাব্যিক সৌন্দর্য পাঠকদের মুগ্ধ করেছে ফলে ভিন্ন মতাদর্শের পাঠকরা তার সাহিত্য কর্মকে সম্মানের সাথে আগ্রহ নিয়ে পাঠ করে গবেষণার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আধুনিক বাংলা কবিতায় তিনি নিজস্ব ভাষা চিত্রকল্প সৃষ্টির মাধ্যম এক স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন।
প্রত্যেক লেখককে তার নিজস্ব ভাষাকে জীবন্ত ও মানবিক করতে হবে সহজ ভাষা মানেই সাধারণ লেখা নয় গভীর ভাবকে সহজ ভাবে প্রকাশ করার মধ্যে প্রকৃত শিল্পের পরিচয় রয়েছে।
আমরা বলে থাকি বর্তমান পাঠকের সংখ্যা কমে গেছে কিন্তু এর কারণ যদি দেখি একটা সামান্য গল্প অথবা কবিতায় যখন লেখক দুর্বোধ্য ভাষা ব্যবহার করে সহজ বিষয়কে জটিল করে তোলে তখন সাধারণ পাঠকরা পড়তে স্বাচ্ছন্দবোধ করেনা। বিষয়টি এড়িয়ে যেতে থাকে। সাহিত্য গভীর হতে পারে কিন্তু অপ্রয়োজনীয় দুর্বোধ্যতা সর্বজনীন করে না।
একজন লেখক সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরতে গিয়ে রাজনীতিকে পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারেন না। ইতিহাসে বহু লেখক তাদের সময়ের রাজনীতি ও সামাজিক সংকটকে সাহিত্যের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তাদের লেখায় তৎকালীন রাজনীতি শুধু একটি দলিল নয় মানবিক সত্য গভীরভাবে প্রকাশের কারণে যুগ যুগ ধরে প্রাসঙ্গিক হয়ে আছেন। নির্দিষ্ট কোন মতাদর্শের গণ্ডির ভেতর না থেকে মানুষের স্বাধীনতা ন্যায় মর্যাদা ও সহমর্মিতার মত চিরন্তন মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
বর্তমান বিশ্বের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং তথ্যপ্রবাহের যুগে লেখকদের ওপর রাজনৈতিক চাপ জনমত ও বিভাজনের প্রভাব এর আগে তুলনায় অনেক বেশি এমন পরিস্থিতিতে একজন লেখকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বাধীন চিন্তা বজায় রেখে সাহিত্য চর্চার করা। সাহিত্য তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয় যখন সমসাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনার উর্ধ্বে উঠে মানুষের নৈতিক দিকগুলো তুলে ধরা।
সর্বজনীন লেখক হওয়া এটি একটি দীর্ঘ পথ অনেক সাধনা নিরন্তন আত্ম সমালোচনা ও মানুষের কর্তৃক গভীর ভালোবাসার ফল। সাময়িক জনপ্রিয়তা অর্জন করা সম্ভব হলেও ইতিহাসে স্থান পায় তারাই যাদের সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের গভীরে পৌঁছাতে পারে। নির্দিষ্ট কোন গোষ্ঠীর চেয়ে মানুষের আস্থা বেশি মূল্যবান।
লেখক : ফজিলা ফয়েজ, কবি ও প্রাবন্ধিক