ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

[ মতামত ]

মহামারিতে রূপ নিচ্ছে অসংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ

বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় এবং সামাজিক সংকট
এস এম মুকুল
প্রকাশিত: ১৪:১৩, ৮ অক্টোবর ২০২৬
মহামারিতে রূপ নিচ্ছে অসংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ
রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বিভিন্ন সেক্টরকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পদ্ধতির প্রবর্তন করতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় জনশক্তি ও কাঠামোগত উন্নয়ন, ঝুঁকির কারণগুলো সংশোধন ও নিয়ন্ত্রণ, রোগ শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার মাধ্যমে সে

১৯৯০ সালে প্রতি ১০টি মৃত্যুর সাতটিই ছিল সংক্রামক বা  ছোঁয়াচে রোগে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টেছে, প্রতি ১০টি মৃত্যুর সাতটিই ঘটছে এখন অসংক্রামক রোগে।

  • বর্তমানে  দেশের ৬২ ভাগ মানুষ  কোনো না  কোনোভাবে অসংক্রামক  রোগে আক্রান্ত।  মোট আক্রান্তদের মধ্যে ৫৭ ভাগই শহরের বাসিন্দা। দেশে অসংক্রামক রোগের কারণে মৃত্যুর হার প্রায় ৭০ ভাগ। আগের  চেয়ে এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও  ক্রমশ বাড়ছে। 
  • অসংক্রামক  রোগের বার্ষিক খরচ প্রায় ৪ হাজার  কোটি টাকা। 

অসংক্রামক রোগ - দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই এ ধরণের রোগের দ্রুত বিস্তার ঘটছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানাগেছে, দেশে অনেক আগে  থেকেই সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ রয়েছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাংলাদেশে ক্যান্সার, হৃদরোগ, দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক  রোগ মহামারি অনুপাতে বাড়লেও জীবনযাপন  থেকে সৃষ্ট এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে  তেমন প্রস্তুতি  নেই । ফলে দেখা গেছে, অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশের তরুণরাই অসংক্রামক রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। 

অসংক্রামক ব্যাধির মধ্যে বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যানসার, কিডনি রোগের বিষয়ে সচেতন হওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা । এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিমত, আমাদের অসচেতন জীবনযাপনের ধারা পরিবর্তন করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করা, লবণ, চিনি এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত, ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে।

  • বিশেষজ্ঞরা বলেন- স্বাস্থ্যসম্মত জীবনপ্রণালী মেনে চলা প্রয়োজন। ওজন ও স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার ও কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা এবং এসব কারণে মৃত্যু কমানো সম্ভব হবে। 

তবে এ ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে  যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতার প্রবণতাসহ বিভিন্ন অসংক্রামক   রোগ প্রতিরোধে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। তেমনি শিশুদের দিকে আরো গুরুত্বের সঙ্গে নজর রাখা উচিত বলে এই বিশেষজ্ঞ মত প্রকাশ করেন। 

বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, এখন বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের মধ্যেও সব ধরনের অসংক্রামক রোগের প্রকোপ শুরু হয়েছে।  বিষয়টি নিয়ে এখনই উপযোগি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

বাড়ছে অসংক্রামক রোগের হার
মৃত্যুর জন্য বিশ্বে যে মোট দশটি কারণ রয়েছে তার মধ্যে সাতটিই নন কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) বা অসংক্রামক রোগের কারণে হচ্ছে। বাংলাদেশে সংক্রামক রোগের চাইতে অসংক্রামক রোগের বিস্তার বাড়ছে। ক্যানসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের কারণে পূর্বের যে কোনো সময়ের চাইতে মানুষ বেশি অসুস্থ হচ্ছে এবং একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুহারও।  

এনসিডি’র রোগগুলোর মধ্যে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, সিওপিডি ও মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির জন্য তামাক, অ্যালকোহল, অস্বাস্থ্যকর খাবার, বায়ু দুষণ ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা দায়ী বলা হচ্ছে। অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ে তার মধ্যে তামাক, অ্যালকোহল, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, বায়ূু দূষণ ও কায়িক শ্রমের অভাব উল্লেখযোগ্য।  

বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে কোলেস্টোরেলের বৃদ্ধির হার ২৮ দশমিক ৪ ভাগ, উচ্চ রক্তচাপ ২৬ দশমিক ২ ভাগ, ক্যান্সারে আক্রান্ত ১১ ভাগ, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) ১০ ভাগ এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার ৮.৪ ভাগ।

বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় ও সামাজিক সংকট
বাংলাদেশে নীরবে বাড়ছে অসংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ। এরসাথে   পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় ও সামাজিক সংকট। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যাগুলো এখন আর শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়- এগুলো একটি অর্থনৈতিক ও নীতিগত সংকটের রূপ নিয়েছে। 

কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগের বিস্তার যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, বীমা কাঠামোর অনুপস্থিতি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দুর্বলতা এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।

  • বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে, যার মধ্যে প্রায় ৬৭ শতাংশই অসংক্রামক রোগজনিত। এর মধ্যে হৃদরোগে ৩০ শতাংশ, ক্যান্সারে ১২ শতাংশ, শ্বাসতন্ত্রের রোগে ৭ শতাংশ এবং ডায়াবেটিসে ৩ শতাংশ মানুষ মারা যায়। 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- এই রোগগুলোতে আক্রান্তদের বড় অংশ ৩০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী, অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। ফলে শুধু স্বাস্থ্য নয়, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়ছে। এই ব্যাধিগুলোর চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল। এসব ব্যয় মেটাতে গিয়ে বহু পরিবার জমি বিক্রি করছে, ঋণগ্রস্ত হচ্ছে, এমনকি চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। একটি পরিবারের একজন সদস্যের অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়া মানে পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয়। চিকিৎসা খরচ কমাতে এবং রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে হলে স্বাস্থ্যবীমা কাঠামো চালু করা জরুরি। 

বাংলাদেশে এখনো স্বাস্থ্যবীমা ব্যাপকভাবে চালু হয়নি। কিছু বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও তা সীমিত এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কার্যকর নয়। ফলে চিকিৎসার পুরো ব্যয়ই রোগী বা তার পরিবারকে বহন করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যবীমা ছাড়া অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে টেকসই করা সম্ভব নয়।

লাইফস্টাইল এবং খাদ্যাভাস দায়ী 
দেশে অসংক্রামক রোগী বাড়ছে! অসংক্রামক রোগ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে চিকিৎসকরা বলেন, আমাদের কায়িক পরিশ্রম কম। জীবন যাপনে নানামুখি চাপ বেড়ে গেছে এখন। আমরা পরিশ্রম করি কম। আমাদের লাইফস্টাইল এবং খাদ্যাভাস এই অসংক্রামক রোগ বেড়ে যাওয়ার জন্য প্রধান দায়ী। 

অসংক্রামক রোগের বিস্তারের পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাসে অনিয়ম, ধূমপান, মদ্যপান, অনিয়ন্ত্রিত ওজন এবং মানসিক চাপ। শহরাঞ্চলে এই প্রবণতা বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কর্মজীবী মানুষদের মধ্যে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, অনিয়মিত খাদ্যগ্রহণ এবং ব্যায়ামের অভাব এই রোগগুলোর ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। 

খাদ্যাভাস আগে বাংলাদেশে যে রকম ছিল তার থেকে অনেক বদলে গিয়েছে এখন। বর্তমান সময়ে ফাস্টফুড, রিচফুডসহ রাস্তার ধারের পোড়া তেলের খাবার আমাদের শরীরের যে ক্ষতি করে সেটাই এই রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাবার প্রমাণ। এর আরো কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন খাদ্যাভাস, ধূমপান, প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রসার, বায়ু এবং ধুলা দূষণ, মানসিক চাপ এবং সড়ক দুর্ঘটনার প্রকোপকে। 

বিভিন্ন প্রতিবেদনে ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, স্থায়ী বক্ষব্যাধি, শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা, স্নায়ুবিক রোগগুলোকে অসংক্রামক রোগ বলা হয়েছে।  এ থেকে মুক্তি পেতে খাদ্যাভ্যাস এবং লাইফস্টাইল অবশ্যই বদলাতে হবে। তা না হলে দিন দিন অসংক্রামক রোগীর সংখ্যা বেড়েই যাবে। 

রোগ নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম
যুক্তরাজ্যোর বিখ্যাত ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটিসহ দেশি-বিদেশি ৭টি প্রতিষ্ঠান ‘ক্যামব্রিজ প্রোগ্রাম টু এসিস্ট বাংলাদেশ ইন লাইফস্টাইল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিস্ক রিডাকাশন (ক্যাপাবল-ঈঅচঅইখঊ) শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে বলা হয় দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে অসংক্রামক রোগ। 

বর্তমানে দেশের ৬২ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত। মোট আক্রান্তদের মধ্যে ৫৭ ভাগই শহুরে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দেশি-বিদেশি ৭টি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ ও সহায়তায় শুরু হতে যাচ্ছে পরিবেশের সঙ্গে অসংক্রামক রোগের সম্পর্ক নিরূপণে গবেষণা কার্যক্রম। শহর, গ্রাম ছাড়াও বস্তিবাসীদের নিয়ে এ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। 

বিশ্বজুড়ে অসংক্রামক রোগ
সারাবিশ্বে প্রধান অসংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে রয়েছে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যান্সার এবং মানসিক সমস্যা। বিশ্বের ৮০% অকাল মৃত্যু ঘটে এই রোগগুলোর কারণে। প্রাক্কলিত হিসেব অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ৪ কোটি লোক অসংক্রামক রোগের কারণে মারা যায় যা বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৭১%। বয়স বাড়ার সাথে সাথে অসংক্রামক রোগজনিত মৃত্যুর হার বাড়ে। প্রতি বছর ৩০-৬৯ বছর বয়সী দেড় কোটি লোক অসংক্রামক রোগে মারা যাচ্ছে; এই অকালমৃত্যুর ৮৫% ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বের মোট রোগের ৮০%-ই হবে এই অসংক্রামক রোগ। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রতি দশটি মৃত্যুর মাঝে সাতটির কারণ হবে অসংক্রামক রোগ, যার প্রায় অর্ধেক মৃত্যু ঘটবে ৭০ বছর পূর্ণ হবার আগেই। এশিয়ার মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকের কারণ অসংক্রামক রোগ। 

৮০ শতাংশের বেশি হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসজনিত মৃত্যু, ৯০% দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসরোগে মৃত্যু এবং দুই-তৃতীয়াংশ ক্যান্সারজনিত মৃত্যু ঘটে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। বিশ্বের অন্য যেকোন অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধির হার সবচেয়ে দ্রুত। যেখানে ১৯৯০ সালে এই হার ছিল মাত্র ৪০% তা এখন (২০১৪) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০-৭০%-এ।

নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ 
বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে অসুস্থ মানুষদের মধ্যে কমবেশি ৬১ শতাংশই অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত। এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে সকল রোগে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যু সংখ্যার শতকরা ৬৭ ভাগের জন্য দায়ী ছিল অসংক্রামক রোগ। যা ২০১১ সালে ছিল ৫২ শতাংশ। 

সহজ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, অসংক্রাসক রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে।  তথ্য উপা বলছে, দেশের ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ৯৭ শতাংশের কমপক্ষে একটি অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি আছে। বিশ্লেষণ তথ্য অনুযায়ী, এসব রোগের চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে অনেক অসংক্রামক রোগে আক্রান্তকে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়। 

  • অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশের বেশি। যার ফলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যু হ্রাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি লাভ হলেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ। 

যদিও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থ জীবনযাপনে সচেতন করার পাশাপাশি প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও চিকিৎসার মধ্যে দিয়ে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুহার ২০৩০ সালের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। 

২০১৭ সালের বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ প্রতিবেদনে অসংক্রামক  রোগ প্রতিরোধে সরকারের কোনো রকম প্রস্তুতি নেই বলে সতর্ক করা হয়েছে। আর অসংক্রামক রোগ ‘বিস্ফোরণের’ পর্যায়ে আছে উল্লেখ করে 'দ্রুত কাজ করতে হবে’ বলে তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে একসঙ্গে কাজ করবে ৩৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ
বাংলাদেশে হৃদরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগের মতো অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার যৌথ উদ্যোগ আরও জোরদার করতে ১৫ জুলাই ২০২৬ একটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ সভায় ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ফোকাল পার্সনরা অংশ নেন। সভাটি বাংলাদেশ সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পুরাতন সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।

  • বর্তমানে দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশেরও বেশি অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই অকালমৃত্যু। তাই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু স্বাস্থ্য খাত নয়, সরকারের সব খাতের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

এই লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ সরকার অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে একটি যৌথ ঘোষণায় (Joint Declaration) স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করে।

সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আয়োজিত সভায় প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিট, লক্ষ্য ও অগ্রগতি পরিমাপের সূচক নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যাতে সমন্বিতভাবে যৌথ ঘোষণার বাস্তবায়ন আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া যায়। সভাটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশ-এর সহযোগিতায় আয়োজন করে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন শেখ মোমেনা মনি, অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ব স্বাস্থ্য অনুবিভাগ), স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। । প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, সচিব, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।

সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের মধ্যে দেশে প্রায় ২ কোটি লোক কোন না কোন ধরনের কিডনি রোগে ভুগছে। দেশে প্রতি বছর ২৫ হাজার লোকের কিডনি বিভিন্ন কারণে হঠাৎ করে অকেজো হয়ে যায়। প্রতি বছর কিডনিজনিত রোগে প্রায় ৪০ হাজার লোক মারা যায়। 

  • বাংলাদেশে ডায়াবেটিস এখন মহামারী হয়ে উঠছে। দেশে প্রায় ৭১ লাখ, বছরে বাড়ছে আরও ১ লাখ রোগী। শুধু ডায়াবেটিসের কারণে বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে একজনের মৃত্যু হয়।  

রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বিভিন্ন সেক্টরকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পদ্ধতির প্রবর্তন করতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় জনশক্তি ও কাঠামোগত উন্নয়ন, ঝুঁকির কারণগুলো সংশোধন ও নিয়ন্ত্রণ, রোগ শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার মাধ্যমে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সকল পর্যায় শক্তিশালী করতে হবে। 

সচেতনতায় দরকার সমন্বিত উদ্যোগ
‘এনসিডি চ্যালেঞ্জ হেলথ ইন অল পলিসি হোল সোসাইটি অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক এক আলোচনায় উপস্থাপিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, অসংক্রামক রোগের বার্ষিক খরচের বার্ষিক খরচ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। বিশিষ্ট চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে বেশি জোর দেওয়া দরকার। 

জনসচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কারণ দেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ এবং এসব রোগে মৃত্যু অনেক বেশি। দীর্ঘস্থায়ী এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয় অনেক। 

সরকারিভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে- 
- জনসচেতনতা, খাদ্যনিয়ন্ত্রণ, ধূমপানবিরোধী প্রচারণা, ব্যায়াম উৎসাহ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা- এসব কার্যক্রম এখনো পর্যাপ্ত নয়। 
- স্কুল, কর্মস্থল এবং গণমাধ্যমে স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। 
- খাদ্যপণ্যে ট্রান্স ফ্যাট, অতিরিক্ত চিনি ও লবণের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। 
- বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, অসংক্রামক রোগের প্রকোপ কমাতে হলে প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ। 
* প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। 
* সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ নিশ্চিত করতে হবে। 
* স্বাস্থ্যবীমা কাঠামো চালু করে নিম্নআয়ের মানুষদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হবে। 
* জনসচেতনতা বাড়িয়ে জীবনযাত্রার পরিবর্তন আনতে হবে। 

লেখক : স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিবেদক

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!