শিশুর নিরাপত্তা শুরু হোক পরিবার থেকেই
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। স্কুল ছুটি হওয়ার পর অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও শিশুটির বাড়ি ফেরার কথা। কিন্তু সে ফিরছে না।
প্রথমে পরিবার ভাবল, হয়তো কোনো বন্ধুর বাসায় গেছে। ফোন করা হলো। সাড়া নেই। বন্ধুদেরও কিছু জানা নেই। শুরু হলো স্কুলে যোগাযোগ, পরিচিতদের ফোন এবং আশপাশে খোঁজাখুঁজি।
.png)
সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপের পাশাপাশি ভাবতে হয়, এর আগেই পরিবার কী করতে পারে?
নিরাপত্তা শুধু নজরদারি নয়
শিশু কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে এবং কখন ফিরবে—এসব জানা দরকার। তবে তার চেয়েও জরুরি, কোনো বিপদে পড়লে সে যেন পরিবারের কাউকে বিষয়টি বলতে পারে।
ধরা যাক, কোনো বন্ধু তাকে কোথাও যেতে বলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও সঙ্গে পরিচয় হয়েছে কিংবা স্কুলে কোনো সমস্যা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ‘বাড়িতে বললে বকা খাব’—এমন ভয় থাকলে শিশু বিষয়টি গোপন করতে পারে।
তাই প্রতিদিনের ছোট ছোট কথাবার্তায় ভরসার জায়গাটি তৈরি করা দরকার।
সন্তানের জন্য কিছুটা সময়
এর জন্য বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। একসঙ্গে খাওয়া, স্কুলের গল্প শোনা, হাঁটতে যাওয়া, খেলাধুলা করা কিংবা ঘরের কাজে তাকে সঙ্গে নেওয়াই হতে পারে কথা বলার সুযোগ।
সময় কাটানো মানেই প্রশ্ন করা নয়। মন দিয়ে শোনাও এর অংশ।
‘আজ কেমন লাগল?’, ‘কোনো কিছু নিয়ে মন খারাপ?’—এমন সাধারণ প্রশ্ন শিশুকে নিজের কথা বলতে উৎসাহিত করে। বিশেষ করে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সে বন্ধু, স্কুল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নিজের স্বাধীনতার বিষয়গুলো তার জীবনে বড় হয়ে ওঠে।
শিশু কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে বকা বা বিচার না করে আগে শোনা দরকার। পরিবারের প্রতিক্রিয়াই অনেক সময় ঠিক করে দেয়, সে পরেরবার নিজের কথা বলবে কি না।
নিয়ম থাকবে, চাপ নয়
শিশুর জন্য একটি সহজ রুটিন থাকা ভালো। কখন স্কুলে যাবে, পড়বে, খেলবে ও বাড়ি ফিরবে—এসব জানা থাকলে তার স্বাভাবিক চলাফেরাও বোঝা যায়।
তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সেগুলো নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। অতিরিক্ত শাসন বা সব বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ শিশুকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
অবশ্য কোনো শিশু নিখোঁজ হলে পরিবারকে দায়ী করা যায় না। প্রতিটি ঘটনার পেছনে পরিস্থিতি ভিন্ন। তবে পরিবারে কথা বলার পরিবেশ থাকলে অনেক বিষয় আগেই জানা সম্ভব।
জরুরি সময়ের প্রস্তুতি
শিশু নির্ধারিত সময়ে না ফিরলে কে স্কুলে ফোন করবেন, কে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন এবং কে থানায় যাবেন—এসব আগে ঠিক করে রাখা যেতে পারে।
সিসিটিভি থাকলে সেটি সচল রাখা এবং প্রয়োজনে শেষবার দেখা এলাকার ফুটেজ দ্রুত সংরক্ষণ করা দরকার। শিশুর অবস্থান জানার কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করলে তার নির্ভুলতা, নেটওয়ার্ক এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়ও বিবেচনায় রাখা উচিত।
নিখোঁজ হলে শিশুর সাম্প্রতিক ছবি, পোশাক, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, মুঠোফোন নম্বর ও সর্বশেষ অবস্থানের তথ্য প্রস্তুত রাখুন। বন্ধু, স্কুল বা কোচিংয়ে খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি দ্রুত থানায় যোগাযোগ করে সাধারণ ডায়েরি করুন।
নিখোঁজ শিশুর ছবি ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর আগে সেগুলো যাচাই করা উচিত। প্রমাণ ছাড়া কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়।
শিশু সহায়তার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের ১০৯৮ নম্বরে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
নিরাপত্তার প্রথম ঠিকানা
শিশু নিখোঁজ হলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। কিন্তু প্রস্তুতি শুরু হয় তারও আগে—পরিবারের ভেতর থেকে।
প্রতিদিন হয়তো বেশি সময় দেওয়া সম্ভব নয়। তবু দিনের কিছুটা সময় শুধু সন্তানের কথা শোনার জন্য রাখা যায়।
এতে সব ঝুঁকি দূর হবে না। কিন্তু শিশুর মনে একটি বিশ্বাস তৈরি হতে পারে—‘কিছু হলে আমি আমার পরিবারের কাছে বলতে পারব।’
শিশুর নিরাপত্তা শুধু সে কোথায় যাচ্ছে, তা জানার মধ্যে নয়। কোনো বিপদে পড়লে সে যেন জানে—ফিরে যাওয়ার মতো একটি জায়গা তার আছে।
লেখক: প্যারেন্টিং এক্সপার্ট ও কিডস টাইমের প্রতিষ্ঠাতা