ঢাকা,  সোমবার   ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ আন্তর্জাতিক ]

ট্রাম্পের ইরান হামলার হুমকিতে নতুন যুদ্ধের আতঙ্কে উপসাগরীয় দেশগুলো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১:২৩, ২ নভেম্বর ২০২৬
ট্রাম্পের ইরান হামলার হুমকিতে নতুন যুদ্ধের আতঙ্কে উপসাগরীয় দেশগুলো
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে আবারও সামরিক হামলার হুমকিতে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে আরেক দফা সংঘাত শুরু হলে তার বড় ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোকে। বিশেষ করে এসব দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি অবকাঠামো ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সোমবার (২ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দফার সংঘাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এসেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোকে সুরক্ষা দিতে স্থাপন করা মার্কিন ঘাঁটিগুলোই এখন ইরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে।

গত সপ্তাহান্তে বাহরাইনে অনুষ্ঠিত বার্ষিক মানামা সংলাপে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, নীতিনির্ধারক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আলোচনায় এ উদ্বেগ বিশেষ গুরুত্ব পায়। ট্রাম্প আবারও ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দেওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তিনি ইরানে আরেকটি সামরিক অভিযান চালাতে পারেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি সম্ভাব্য নতুন অভিযানের ইঙ্গিত দেন। চারজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরানে হামলা চালানোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যে পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি ও সরঞ্জাম জড়ো করেছে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি সপ্তাহেই হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এমন এক ইউরোপীয় কর্মকর্তা বলেন, ‘যুদ্ধ আসন্ন। কেউই এ যুদ্ধ চায় না।’

মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি মানামা সংলাপে সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তা আগের চেয়ে আরও ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক হবে। এতে কোনো পক্ষেরই লাভ হবে না।

মার্কিন ঘাঁটি থেকে ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এর মধ্যে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও উন্নয়নকেন্দ্রও রয়েছে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামের একটি স্থাপনার কথাও উল্লেখ করেছেন ইউরোপীয় কর্মকর্তারা। তবে সামরিক হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হবে না, বরং কিছুটা দুর্বল হতে পারে বলে তাদের ধারণা।

অন্যদিকে, নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য ইরানও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা তৈরি করেছে। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই তালিকায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল এবং কয়েকটি গোপন সামরিক স্থাপনাও রয়েছে।

এ ধরনের পাল্টা হামলা শুধু সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ না থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো, পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ নগর স্থাপনাগুলোর জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক এমিল হোকায়েম বলেন, ইরানের মূল লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে দেওয়া। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল উপসাগরীয় দেশগুলো এখন সেই নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণেই ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

যুদ্ধের মূল্য দিতে হবে উপসাগরীয় দেশগুলোকে

বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের অন্যতম ভিত্তি। তবে সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির রাজধানীর কাছে জুফাইর এলাকায় মার্কিন ঘাঁটির আশপাশের কয়েকটি স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন এখনো দৃশ্যমান।

একজন উপসাগরীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে পাল্টা আঘাত হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক অবকাঠামোও আক্রান্ত হতে পারে।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, সংঘাত আবার শুরু হবে কি না এবং এর ব্যাপ্তি কতটা হবে, শেষ পর্যন্ত তা একজনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করেন।

এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সব ধরনের বিকল্পই খোলা রয়েছে। তেহরানকে সহজ পথ অথবা কঠিন পথ বেছে নিতে হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতেই সব সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

যুদ্ধ ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা

নতুন করে সংঘাত এড়াতে উপসাগরীয় দেশগুলো কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। গত মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সৌদি আরব জানিয়েছে, সামরিক উত্তেজনা যেন আবার ফিরে না আসে, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সপ্তাহান্তে কাতারের কর্মকর্তারাও তেহরান ও দোহায় একাধিক বৈঠক করেছেন। তাদের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি কমানো।

মানামা সংলাপে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আনোয়ার গারগাশ বলেন, তারা কূটনৈতিক সমাধানের আশায় রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে আরেক দফা সংঘাত দেখতে চান না তারা। তবে সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছে আমিরাত।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে গভীর সংশয় রয়েছে। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব এসব দেশকেই বহন করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের উত্তেজনায় শুধু সামরিক শক্তির লড়াই নয়, দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধের ব্যয় বহন করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের আশঙ্কা, নতুন সংঘাত শুরু হলে সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় অংশ তাদের ওপরই বর্তাবে।

সূত্র: রয়টার্স

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!