কী ঘটছে দিল্লিতে
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা, ব্যাপক ধরপাকড় ও গণপরিবহনে বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) যন্তর মন্তরে নির্ধারিত কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আগেই আন্দোলনের আয়োজক ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতাদের আটক করে পুলিশ। পরে দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিসহ বিরোধী রাজনীতিক ও আন্দোলনকারীদের আটক করার খবর পাওয়া যায়।
বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। বন্ধ রাখা হয় দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার ফটক। মধ্য দিল্লির নির্দিষ্ট এলাকায় সাময়িকভাবে মুঠোফোনের ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ করা হয়। কয়েকশ’ দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল হওয়ায় যাত্রীদের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে।
কেন এই বিক্ষোভ?
ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম নিয়ে বিতর্কের জেরে আন্দোলনের সূত্রপাত। ককরোচ জনতা পার্টি ও বিরোধী পক্ষের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের দাবি, এ বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে।

ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দাবি করেছেন, ২০২৪ সাল থেকে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। তবে এই সংখ্যার পেছনে থাকা প্রক্রিয়া ও অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য হলো তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করা; রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছে। এই দাবিকে কেন্দ্র করে গত ২ অক্টোবর মুম্বাইয়েও বিক্ষোভ হয়েছিল। এবার দিল্লির যন্তর মন্তরে বড় সমাবেশের ডাক দেয় ককরোচ জনতা পার্টি ও সর্বভারতীয় ছাত্র সংগঠনসহ কয়েকটি পক্ষ।
কারা আটক হলেন?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে আটক করা হয়। পরে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও আটক করা হয়। দিল্লির লোধি এস্টেটে নিজের বাসার কাছে আটক হন আম আদমি পার্টির নেতা ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও দিল্লিতে আটক হন। তার সঙ্গে দলের কয়েকজন নেতাকে আটক করার কথা জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম। কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ অন্য বিরোধী নেতা ও আন্দোলনকারীদেরও আটকের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
সিজেপির অভিযোগ, বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর আগেই নেতাদের আটক করে আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে পুলিশ। দলটি এ পদক্ষেপকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার ও অবাধ চলাচলের স্বাধীনতার লঙ্ঘন বলে দাবি করেছে।
অন্যদিকে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য, বিক্ষোভের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি ছিল না। জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এড়াতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে একদিকে প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার যুক্তি সামনে এনেছে প্রশাসন।
বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দিল্লির স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়ও প্রভাব পড়ে। মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলস্টেশনে আসার কথা ছিল—এমন বহু ট্রেন বাতিল করা হয়। কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন সড়কে যান চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। 
সামনে কী?
দিল্লির এই ঘটনা এখন শুধু বিক্ষোভ দমনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, বিরোধীদের প্রতিবাদের অধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা—সবই আলোচনায় এসেছে। তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ এবং এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার দাবি এখনো বিতর্কিত। নির্বাচন কমিশন অভিযোগ অস্বীকার করায় বিষয়টি যাচাইয়ে সংশোধনপ্রক্রিয়ার তথ্য, বাদ পড়া নামের প্রকৃত সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আটক নেতাদের মুক্তি, বিক্ষোভকারীদের পরবর্তী কর্মসূচি এবং নির্বাচন কমিশনের অবস্থান—এসব বিষয়ে পরবর্তী পরিস্থিতি দিল্লির রাজনৈতিক উত্তেজনার গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। আপাতত রাজধানীতে নিরাপত্তা কড়াকড়ি ও ধরপাকড়ের মধ্য দিয়ে ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।