স্ট্রোক প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ‘ফিটনেস প্ল্যান’
স্ট্রোক হলে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্ট্রোকের ক্ষেত্রে শুধু জরুরি চিকিৎসা নয়, তার আগের প্রতিটি দিনও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তন স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
স্ট্রোককে অনেকে হঠাৎ ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা হিসেবে দেখেন। বাস্তবে এর পেছনে দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত ওজন এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মতো একাধিক ঝুঁকি কাজ করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, উচ্চ এলডিএল কোলেস্টেরল ও রক্তে বেশি গ্লুকোজ স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
শুধু ওজন কমানো নয়, শরীরকে সক্রিয় রাখা জরুরি
স্ট্রোক প্রতিরোধে ব্যায়ামের ভূমিকা শুধু ওজন কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, ওজন এবং হৃদ্রক্তনালির স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করার পরামর্শ দেয়।
এর অর্থ প্রতিদিন জিমে যেতে হবে এমন নয়। দ্রুত হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার, নাচ, সিঁড়ি ব্যবহার কিংবা নিয়মিত সক্রিয় থাকা সবই শারীরিক কার্যক্রমের অংশ হতে পারে।
একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকাও কমানো জরুরি। স্ট্রোক প্রতিরোধের সাম্প্রতিক গাইডলাইনেও sedentary behaviour কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
খাবারের ক্ষেত্রে ‘ডায়েট’ নয়, দরকার টেকসই খাদ্যাভ্যাস
স্ট্রোক প্রতিরোধের জন্য কোনো একক ‘সুপারফুড’ নেই। বরং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যতালিকায় বেশি রাখতে হবে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস। অন্যদিকে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিমাণ কমানো উচিত। WHO-ও ফল ও সবজিসমৃদ্ধ এবং কম লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত সুষম খাদ্য গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
American Heart Association/American Stroke Association-এর ২০২৪ সালের প্রাথমিক স্ট্রোক প্রতিরোধ নির্দেশিকায় Mediterranean dietary pattern-কে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর অর্থ অন্ধভাবে ‘Mediterranean diet’ অনুসরণ করা নয়। বরং আমাদের পরিচিত খাবারের মধ্যেই বেশি শাকসবজি, ডাল, মাছ, পূর্ণ শস্য ও বাদাম রাখা এবং অতিরিক্ত লবণ, ভাজাপোড়া ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানো।
রক্তচাপ যেটিকে অবহেলা করা যাবে না
স্ট্রোক প্রতিরোধের আলোচনায় উচ্চ রক্তচাপকে আলাদা গুরুত্ব দিতে হয়। World Stroke Organization-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি এবং প্রায় অর্ধেক স্ট্রোকের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
অনেকের কোনো উপসর্গ না থাকলেও রক্তচাপ বেশি থাকতে পারে। তাই শুধু মাথা ঘোরা বা মাথাব্যথা হলে রক্তচাপ মাপার অপেক্ষা না করে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে শুধু জীবনযাপন পরিবর্তন করাই যথেষ্ট কি না তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
ধূমপান ও অ্যালকোহল: ‘কমিয়ে দেব’ নয়, ঝুঁকি বুঝুন
ধূমপান স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই স্ট্রোক প্রতিরোধে ধূমপান বন্ধ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শও এড়িয়ে চলা উচিত।
অ্যালকোহলের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত গ্রহণ স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই গ্রহণ করলে তা সীমিত রাখা এবং অতিরিক্ত গ্রহণ এড়িয়ে চলা জরুরি।
ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথাও ভুললে চলবে না
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মানে শুধু খাবার ও ব্যায়াম নয়। পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত জীবনযাপনও সামগ্রিক কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের অংশ।
তবে স্ট্রোক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ‘স্ট্রেস কমালেই স্ট্রোক হবে না’ এ ধরনের সরলীকরণও ঠিক নয়। বরং মানসিক স্বাস্থ্যকে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার একটি অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
আর স্ট্রোক হলে?
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ চিনতে পারা।
হঠাৎ মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, এক হাত বা পায়ে দুর্বলতা বা অবশভাব, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা বুঝতে সমস্যা হওয়া, হঠাৎ দৃষ্টির সমস্যা, মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানোর মতো লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা করা যাবে না।
FAST মনে রাখা যেতে পারে Face, Arm, Speech, Time।
মুখ বেঁকে গেছে?
হাত দুর্বল হয়েছে?
কথা জড়িয়ে যাচ্ছে?
তাহলে Time জরুরি চিকিৎসার সময় এখনই।
স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। World Stroke Organization-এর এবারের বার্তাও তাই Every M1nute Counts।
স্ট্রোক প্রতিরোধ কোনো এক দিনের কাজ নয়। এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের ফল আজ কতটা হাঁটলাম, খাবারে কতটা লবণ দিলাম, ধূমপান থেকে দূরে থাকলাম কি না, রক্তচাপ পরীক্ষা করলাম কি না, দীর্ঘ সময় বসে থাকার মাঝখানে উঠে দাঁড়ালাম কি না।
স্ট্রোক প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ‘ফিটনেস প্ল্যান’ হলো এমন জীবনযাপন, যা দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা সম্ভব। কারণ স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ আর প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রতিটি দিন।
লেখক : রাইসা মেহজাবীন, ফিটনেস পুষ্টিবিদ
পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
পিজিটি (Nutrition and Fitness Training), ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার
স্পেশালাইজড ইন ফিটনেস নিউট্রিশন ট্রেনিং, নিউট্রিশন সলিউশনস
চিফ নিউট্রিশন কনসালটেন্ট ও ফিটনেস ট্রেইনার
ইয়োগা ফাউন্ডেশন বসুন্ধরা
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ
ইয়োগা ট্রেইনার, ফিট ফেমি বসুন্ধরা