ঢাকা,  রোববার   ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

[ ফিচার ]
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস

চেনা মানুষ, চেনা সম্পর্কের ভেতরেও লুকিয়ে থাকে অচেনা বিপদ

এস এম মুকুল
প্রকাশিত: ১৭:১৫, ১১ অক্টোবর ২০২৬
চেনা মানুষ, চেনা সম্পর্কের ভেতরেও লুকিয়ে থাকে অচেনা বিপদ
আমাদের মেয়ে ও ছেলেরা যাতে সমানতালে বেড়ে ওঠতে পারে সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তবে যেহেতু মেয়েরা এখনও নানাভাবে পিছিয়ে রয়েছে তাই তাদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে

* বিশ্বে প্রতি তিন সেকেন্ডে একজন কন্যাশিশু বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে।
* আঠারোর আগেই বিয়ে হয়ে যায় ১ কোটি ২০ লাখের বেশি কন্যাশিশুর
* কন্যাশিশুর বিপদ শুধু রাস্তায় বা অচেনা লোকের কাছে নয়- চেনা মানুষ, চেনা সম্পর্কের ভেতরেও অচেনা বিপদ লুকিয়ে থাকে

বিশ্বের প্রায় ১১০ কোটি কন্যাশিশু- শক্তি, সম্ভাবনা ও সৃজনশীলতার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে দারিদ্র্য, শিক্ষার সুযোগের অভাব, অপুষ্টি, বাল্যবিবাহ, লিঙ্গবৈষম্য এবং বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা এখনো অনেক কন্যাশিশুর স্বাভাবিক বিকাশের পথে বাধা হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবিক সংকটের সময় কন্যাশিশুরা নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে।

ভয়ঙ্কর তথ্যটি হচ্ছে- বিশ্বে প্রতি তিন সেকেন্ডে একজন কন্যাশিশু বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে। বছরে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মেয়ের বিয়ে হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায়। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ হারাচ্ছে লাখো কিশোরী।  

কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা কোথায়
কন্যাশিশুর সুরক্ষা বিষয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  কোথাও নিরাপদ নয় কন্যাশিশুরা।  মেয়ে বা কন্যাশিশুকে নিয়ে মা-বাবার দুশ্চিন্তার যেন শেষ নেই।  কারণ বিপদ শুধু রাস্তায় বা অচেনা লোকের কাছে নয়।  চেনা মানুষ, চেনা সম্পর্কের ভেতরেও বিপদ থাকে।  কন্যাশিশুদের নিরাপত্তার সংকট শুধু ধর্ষণ বা হত্যায় সীমাবদ্ধ নয়। নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও পরিবারগুলোর জন্য তৈরি করছে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা।  স্কুলের পথ, অচেনা মানুষ, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ নিয়ে ভয় অনেকদিনের। সেই পুরোনো তালিকায় এখন যোগ হয়েছে সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন প্রতারণা, যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট, পাচার আর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া। 

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টা, যৌন নিপীড়ন, দৈহিক নির্যাতন, আঘাত, অঙ্গহানি এবং ধর্ষণের পর হত্যার মতো অপরাধ ঘটছে। ভুক্তভোগীদের বয়স পাঁচ থেকে ১৫-১৬ বছর পর্যন্ত। অর্থাৎ যে বয়সে শিশুর প্রধান নিরাপত্তা বলয় হওয়ার কথা পরিবার, স্কুল ও সমাজ—সেই বয়সেই তারা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার লক্ষ্য হচ্ছে।

গ্রামের চেয়ে শহরের শিশুদের ঝুঁকি বেশি পাওয়া গেছে। এখানেই মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল পরিবারের উদ্বেগ। দামি ফোন আর ভালো স্কুল মেয়েকে আগলে রাখছে না। উল্টো তার ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। গ্রুমিং, স্টকিং, সেক্সটিং এখন অনেক অভিভাবকের অজানা শব্দ

  • বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, কেবলমাত্র পত্রিকায় প্রকাশিত ঘটনায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট– এই আট মাসে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর সহিংসতার ঘটনা এক হাজার ৯১৯টি। এর ৮৮৪টিতে ভুক্তভোগী কন্যাশিশু। ধর্ষণের ৩৩১ ঘটনার ২৪০টিতেই শিকার শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার ৩৩টি ঘটনার ২২টিতে এবং ধর্ষণচেষ্টার ১৩৬ ঘটনার ১১২টিতেও তাই। 

ইউনিসেফ বাংলাদেশ ২০২৫ সালের মার্চে কন্যাশিশুর ওপর যৌন সহিংসতা বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। চলতি বছরের মে মাসে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সংস্থাটি আবার একই কথা বলেছে। তাদের মতে, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, পাড়া-প্রতিবেশী, সেবাকেন্দ্র, সবখানেই সুরক্ষা ও জবাবদিহি শক্ত করতে হবে। 

জাতিসংঘের হিসাবে, বিশ্বে প্রতিবছর ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মেয়ের ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। অর্থাৎ গড়ে প্রায় প্রতি তিন সেকেন্ডে একজন মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হয়। বাল্যবিবাহের কারণে অনেক মেয়ের পড়াশোনা ব্যাহত হয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। তবে অগ্রগতিও হয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, শিক্ষা, আইনি সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগের ফলে গত ২৫ বছরে আনুমানিক ৬ কোটি ৮০ লাখ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।

আজ ১১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস।  ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘End child marriage and invest in girls’ rights!’অর্থাৎ, ‘বাল্যবিয়ে বন্ধ করুন এবং মেয়েদের অধিকার সুরক্ষায় বিনিয়োগ করুন’।  

আন্তর্জাতিকভাবে কন্যাশিশু দিবস পালনের মূল লক্ষ্য হলো কন্যাশিশুদের অধিকার সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, লিঙ্গবৈষম্য দূর করা এবং তাদের আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্ব বিকাশে উৎসাহিত করা।

জাতিসংঘ ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, কন্যাশিশু, মেয়েদের নেতৃত্বে পরিচালিত সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও নেতৃত্ব বিকাশে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

যেভাবে শুরু আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর। ওই দিন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ৬৬/১৭০ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে প্রতিবছর ১১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরের বছর, অর্থাৎ ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। প্রথম বছরের মূল বিষয় ছিল বাল্যবিবাহ বন্ধ করা। এর মাধ্যমে কন্যাশিশুদের অধিকার সুরক্ষা ও তাদের বিকাশে বাধা সৃষ্টিকারী সামাজিক সমস্যাগুলোকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এরপর থেকে প্রতিবছর ১১ অক্টোবর কন্যাশিশুদের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের বিভিন্ন বিষয় সামনে রেখে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশেও কন্যাশিশুদের অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছে। তবে বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি, অনলাইন নিপীড়ন, পুষ্টির ঘাটতি ও নিরাপত্তাহীনতার মতো চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

আমাদের মেয়ে ও ছেলেরা যাতে সমানতালে বেড়ে ওঠতে পারে সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তবে যেহেতু মেয়েরা এখনও নানাভাবে পিছিয়ে রয়েছে তাই তাদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। বিশেষ করে কন্যাশিশুদের প্রতি সহিংসতা ও বাল্যবিবাহ রোধে আমাদের সবার নজর দেওয়া দরকার। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!