ভয় থেকে পালালে ভয় বাড়ে
ছোটবেলায় সাঁতার শেখার কথা মনে আছে? প্রথম দিন পানিতে নামতেই বুক কেঁপে উঠেছিল। মনে হয়েছিল — এখনই ডুবে যাব। কেউ যদি সেদিন বলত, “ভয় লাগছে? থাক, উঠে এসো” — আপনি আজও সাঁতার জানতেন না। আর পুকুর দেখলেই ভয় পেতেন।
কিন্তু আপনি নেমেছিলেন। একটু একটু করে। প্রথমে হাঁটু পানি। তারপর কোমর। তারপর গলা। আর একদিন টের পেলেন — ভয়টা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
- মনোবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক রান ডি. অ্যানবার বলছেন, ভয় সবসময় আমাদের শত্রু নয়। বরং বিপজ্জনক কিছু থেকে দূরে রাখতে ভয় আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়। বিষাক্ত কিছু খাওয়া, চলন্ত গাড়ির সামনে ছুটে যাওয়া কিংবা বুনো প্রাণীকে আদর করতে এগিয়ে যাওয়া থেকে যে ভয় আমাদের থামায়, সেটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। সমস্যা তখনই, যখন ভয় এমন সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, যা আমাদের জীবনের জন্য ভালো নয়।
তাই ভয় পেলেই প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘আমি যা নিয়ে ভয় পাচ্ছি, সেটি কি সত্যিই বিপজ্জনক, নাকি শুধু ভয় লাগছে?’
বেশিরভাগ সময় মানুষ ভয় পেলে 'ফাইট অর ফ্লাইট' অর্থাৎ ভীতিকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে সেটা সামলাোর চেষ্টা করে অথবা সে পরিস্থিতির মুখে পালিয়ে যায় বা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। এ সময় মানুষের হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যায়, যা ক্রমেই বাড়তে থাকে।
কথায় আছে- ভয় থেকে পালালে ভয় বাড়ে। আর ভয়ের দিকে হাঁটলে ভয় ছোট হয়।
নিজের শক্তির কথা মনে করুন
ভয় সামনে এলে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, এর আগেও কত ভয় পেরিয়ে এসেছি। সাইকেল চালানো, সাঁতার শেখা, গাড়ি চালানো, নতুন শহরে যাওয়া, নতুন চাকরি শুরু করা—প্রথমবার সবকিছুই অচেনা এবং কিছুটা ভয়ংকর। পরে সেগুলোই স্বাভাবিক হয়ে যায়।
তাই ভয় লাগলে নিজের পুরোনো অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে তাকানো যেতে পারে। মনে করুন, এর আগেও আপনি কঠিন পরিস্থিতি সামলেছেন। ভুল করেছেন, শিখেছেন, আবার চেষ্টা করেছেন। প্রয়োজন হলে সাহায্যও চেয়েছেন।
ওসিডি-র সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা ঠিক এই নীতিতেই কাজ করে। ERP: যে চিকিৎসা সত্যিই কাজ করে। এই চিকিৎসার নাম ERP — Exposure and Response Prevention। বাংলায় — ভয়ের মুখোমুখি হওয়া, এবং কম্পালশন না করা।
মনোবিজ্ঞানী জোনাথন গ্রেসন তাঁর Freedom from OCD বইয়ে ERP-কে ওসিডি চিকিৎসার মেরুদণ্ড বলেছেন। আর আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকাগুলোতেও ওসিডি-র জন্য প্রথম সারির সাইকোথেরাপি হিসেবে ERP-নির্ভর CBT-কেই সুপারিশ করা হয়।
নামটা দুই ভাগে। দুটোই সমান জরুরি।
E — Exposure (মুখোমুখি হওয়া)
যে জিনিস, পরিস্থিতি বা চিন্তা ভয় জাগায় — ইচ্ছা করে, পরিকল্পনা করে, ধাপে ধাপে তার কাছে যাওয়া।
RP — Response Prevention (কম্পালশন থামানো)
ভয় জাগার পর যে কাজটা করতে মন চায় — হাত ধোয়া, চেক করা, আশ্বাস চাওয়া — সেটা না করা।
শুধু মুখোমুখি হলে হবে না। মুখোমুখি হয়ে যদি সাথে সাথে হাত ধুয়ে ফেলেন, ব্রেইন আবার সেই পুরনো শিক্ষাই পাবে — “হাত ধুয়েছিলাম বলেই বাঁচলাম।” দুটো একসাথে হলেই ব্রেইন নতুন কিছু শেখে।
ব্রেইন আসলে কী শেখে?
পুরনো ধারণা ছিল — বারবার মুখোমুখি হলে ভয় ধীরে ধীরে কমে যায়, যেমন ঠান্ডা পানিতে নামলে শরীর সয়ে যায়।
কথাটা আংশিক সত্য। কিন্তু নতুন গবেষণা আরও গভীর একটা জিনিস দেখিয়েছে।
ERP-তে ব্রেইন আসলে দুটো নতুন সত্য শেখে —
সত্য ১: “যে বিপদের ভয় পাচ্ছিলাম, সেটা ঘটল না।”
সত্য ২: “অস্বস্তি নিয়েও আমি টিকে থাকতে পারি।”
এই দ্বিতীয়টাই আসল।
অনেক সময় এক্সপোজারের পরেও অস্বস্তি পুরোপুরি যায় না। তাতে ব্যর্থতা নেই। আপনি অস্বস্তি নিয়ে বসে থাকতে পেরেছেন, কম্পালশন করেননি, দিনটা চালিয়ে গেছেন — এটাই বিজয়।
ওসিডি আপনাকে বলে, “এই অস্বস্তি তুমি সহ্য করতে পারবে না।”
ERP প্রমাণ করে, “পারি।”
ভয়ের সিঁড়ি
ERP মানে এই নয় যে প্রথম দিনেই সবচেয়ে বড় ভয়ের মুখে ঝাঁপ দেবেন।
এটা একটা সিঁড়ি। নিচ থেকে ওপরে। এক ধাপ, এক ধাপ করে।
মনোবিজ্ঞানে একে বলে Fear Hierarchy — ভয়ের সিঁড়ি।
ধরুন কারও ওসিডি জীবাণু নিয়ে। তাঁর সিঁড়িটা হতে পারে এমন (০–১০০ স্কেলে অস্বস্তি):
— ঘরের দরজার হাতল ছুঁয়ে ৫ মিনিট হাত না ধোয়া → ৩০
— বাসের হাতল ছুঁয়ে ১৫ মিনিট হাত না ধোয়া → ৫০
— বাইরের জুতা ছুঁয়ে তারপর নিজের কাপড় ছোঁয়া → ৬৫
— পাবলিক টয়লেটের দরজা ছুঁয়ে খাবার খাওয়া → ৮৫
শুরু হয় ৩০–৪০ মাত্রার ধাপ দিয়ে। ভয় আছে, কিন্তু সামলানো যায় — এমন জায়গা থেকে।
একটা ধাপ সহজ হয়ে এলে, তবেই পরের ধাপ।
কষ্টের সাথেই স্বস্তি
ERP শুনে অনেকে ভয় পান। ইচ্ছা করে কষ্টের দিকে যাব? হ্যাঁ। কারণ এই কষ্টটা অর্থহীন নয়। এটা মুক্তির দাম।
কুরআনে আল্লাহ পরপর দুইবার একই কথা বলেছেন — “নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।” (সুরা ইনশিরাহ, ৯৪:৫–৬)
খেয়াল করুন — “কষ্টের পরে” নয়, “কষ্টের সাথেই।” ERP ঠিক এই অভিজ্ঞতা। অস্বস্তির ভেতর দিয়ে হাঁটার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মুক্তি। আর ওসিডি যে স্বস্তি দেয় — সেটা উল্টো। আগে স্বস্তি, পরে আরও বড় কষ্ট।
একটা ধার করা শান্তি। আরেকটা অর্জিত শান্তি। কোনটা বেছে নেবেন, সিদ্ধান্ত আপনার।
আজকের একশান প্ল্যান (৭ দিনের চর্চা)
ধাপ ১ — ভয়ের তালিকা বানান (দিন ১)
যত পরিস্থিতি, জিনিস বা চিন্তা আপনার ওসিডি জাগায় — সব লিখুন। অন্তত ১০টা।
বড়, ছোট — সব। বিচার করবেন না।
ধাপ ২ — নম্বর দিন (দিন ২)
প্রতিটার পাশে লিখুন: এর মুখোমুখি হলে, কম্পালশন না করলে, অস্বস্তি কত হবে? ০ থেকে ১০০।
তারপর কম থেকে বেশি সাজান। এটাই আপনার সিঁড়ি।
ধাপ ৩ — প্রথম ধাপ বেছে নিন (দিন ৩)
৩০ থেকে ৪০ নম্বরের একটা কাজ বেছে নিন। এর নিচে নয় — তাতে কিছু শেখা হবে না। এর ওপরে নয় — তাতে ভেঙে পড়বেন।
ধাপ ৪ — প্রতিদিন একবার, পুরো সময় (দিন ৩–৭)
কাজটা করুন। তারপর কম্পালশন ছাড়া থাকুন — অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট।
শুরুতে, ১০ মিনিট পর, আর শেষে অস্বস্তির নম্বর লিখে রাখুন।
মনে মনে বারবার বলুন: “আমি এটা সহ্য করতে পারি।”
প্রতিদিন একই ধাপ। দেখবেন — দিনে দিনে শুরুর নম্বরটাই নামছে।
ধাপ ৫ — লুকানো কম্পালশন থেকে সাবধান (প্রতিদিন)
এক্সপোজারের সময় মনে মনে দোয়া গোনা, “সব ঠিক আছে” বলে নিজেকে বোঝানো, অন্যমনস্ক থাকার জন্য ফোন ঘাঁটা — এগুলোও কম্পালশন। এগুলো করলে এক্সপোজার কাজ করবে না।
ভয়কে পুরোপুরি অনুভব করতে দিন। তাতেই শেখা হয়।
ধাপ ৬ — সপ্তাহ শেষে ফিরে দেখুন (দিন ৭)
প্রথম দিনের নম্বর আর সপ্তাহ শেষের নম্বর পাশাপাশি রাখুন।
নম্বর কমলে পরের সপ্তাহে এক ধাপ ওপরে উঠুন। না কমলে একই ধাপে আরেক সপ্তাহ। তাড়াহুড়ার কিছু নেই।
সতর্কতা: ERP শক্তিশালী চিকিৎসা, তাই সঠিকভাবে করা জরুরি। ওসিডি যদি তীব্র হয়, অন্যের ক্ষতির ভয় নিয়ে হয়, অথবা সাথে বিষণ্নতা থাকে — একা না করে একজন ERP-প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে করুন। আর কখনো সিঁড়ির সবচেয়ে উঁচু ধাপ দিয়ে শুরু করবেন না।
সৌজন্য : Soul Wellness
আরো বিস্তারিত জানতে পড়;তে পারেন-
বই: https://www.facebook.com/share/1DLxhsoXiR/?mibextid=wwXIfr
ভিডিও: https://www.facebook.com/share/v/193dBy6eKA/?mibextid=wwXIfr