ভানু পেল লটারি!
বাঙালির হাসির রাজা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক অবিস্মরণীয় ক্লাসিক সৃষ্টি "ভানু পেল লটারি"। নিটোল হাস্যরসের অন্তরালে লোভ, মোহ আর নাগরিক জীবনের এক নিখাদ বাস্তব ছবি ফুটে উঠেছিল এই গল্পে।
কলকাতার কৌতুক জগতের দুইজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সেরা অভিনেতা/কৌতুকশিল্পী হলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রবি ঘোষ। বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী যুগের এই দুই কিংবদন্তি তাঁদের অসাধারণ অভিনয় শৈলী ও কমিক টাইমিংয়ের জন্য আজও মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন।
তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিচে দেওয়া হলো:
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়:
তিনি বাংলা সিনেমার সর্বকালের অন্যতম সেরা কৌতুক অভিনেতা। তাঁর খাঁটি ঢাকাই বাংলা সংলাপ বলার ধরন এবং সহজাত রসবোধ দর্শকদের হাসাতে বাধ্য করত। 'সাড়ে চুয়াত্তর', 'ভানু পেল লটারি' এবং 'যমালয়ে জীবন্ত মানুষ' চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় চিরস্মরণীয়।
রবি ঘোষ:
তিনি ছিলেন অত্যন্ত শক্তিমান একজন অভিনেতা। কৌতুক চরিত্রের পাশাপাশি সব ধরনের চরিত্রেই তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' চলচ্চিত্রে 'বাঘা' চরিত্রে তাঁর অভিনয় এবং 'গল্প হলেও সত্যি' সিনেমায় তাঁর প্রধান কৌতুকী চরিত্র আজও বাঙালি দর্শকের কাছে প্রিয়।
এক নজরে মূল গল্পের সারসংক্ষেপ:
• সরল গ্রামীণ জীবন: গল্পের মূল চরিত্র ভানু চিত্রকর। গ্রামের এক অতি সাধারণ, মাটির পুতুল তৈরি করা শিল্পী। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারেও তার আনন্দের কমতি ছিল না।
• ভাগ্যের চাকা ও লটারির টিকিট: একদিন ভানুর বন্ধু জহর কলকাতা থেকে এসে তাকে একটি লটারির টিকিট কিনে দেয়। অভাবের সংসারে কপাল জোরে ভানু সত্যিই পেয়ে যায় প্রথম পুরস্কার— তখনকার দিনের বিপুল অংকের ৩ লক্ষ ৯৫ হাজার টাকা!
• কলকাতার গোলকধাঁধা ও লোভের থাবা: লটারি জেতার পর সরল ভানু এসে পৌঁছায় কলকাতা শহরে। আর টাকা পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই চারপাশ থেকে ভণ্ড, জোচ্চোর আর ধূর্ত ব্যবসায়ীদের দল মৌমাছির মতো তাকে ছেঁকে ধরে। নিজেদের ব্যবসায় ভানুর টাকা খাটানোর জন্য শুরু হয় নানান ফন্দি-ফিকির।
• স্বপ্ন নাকি সত্যি? ধূর্তদের এই লোভের জাঁতাকলে পড়ে ভানুর জীবন একেবারে ওলটপালট হয়ে যায়। একপর্যায়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে সে গ্যাস বেলুনে চড়ে পালাবার চেষ্টা করে! আর তখনই ভাঙে তার ঘুম— জানা যায় কলকাতার এই সমস্ত জটিলতা আসলে ছিল ভানুর দেখা একটি দুঃস্বপ্ন।
• এক মহান শিক্ষা: ঘুম থেকে জেগে ভানু যখন জানতে পারে সে বাস্তবেও লটারি জিতেছে, তখন সে লোভের এই শহরের রূপ দেখে টাকা নিজের কাছে না রেখে সমস্ত অর্থ অভাবী ও দুস্থ মানুষের কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
হাসি-কান্না, নিখাদ কমেডি আর জীবনের এক দারুণ দর্শন নিয়েই তৈরি হয়েছিল এই কালজয়ী গল্প। ভানু-জহরের সেই চিরাচরিত রসায়ন আজও আমাদের মনে দোলা দেয়।
লেখক : গোলাম কবীর, টরন্টো, কানাডা।