সুদূর নেপাল থেকে এই শিক্ষার্থী বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) পড়তে আসেন ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে। পড়ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের চতুর্থ বর্ষে।
রবি ইয়াদব জানান, ইংরেজি আগে থেকেই জানতেন, সে কারণে ইংরেজি মাধ্যমের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ইংরেজি জানার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্লাসে তার কোনো সমস্যা হতো না। তবে বাংলা ভাষা না জানার কারণে সমস্যায় পড়ে যান বিভিন্নভাবে। রিকশায় চরলে রিকশাওয়ালাকে বুঝাতে পারতেন না নেপালি ভাষা। কোনো কিছু কিনতে গেলেও পড়তেন বিপদে। ভিসার কাজে কিংবা বিভিন্ন কাজে ময়মনসিংহের বাহিরে ঘুরতে গেলেও পড়তেন মহাবিপদে। বাংলাদেশি সহপাঠী বন্ধু ছাড়া একদম চলতেই পারতেন না, কেবল বাংলা ভাষা বুঝতে না পারার কারণে।
.png)
রবি ইয়াদব এখন অনর্গল বাংলা ভাষায় কথা বলছেন বাংলাদেশি বন্ধুদের কাছ থেকে ভাষা শিখে। এখন আর কোনো সমস্যাতেই পড়তে হয় না তার। সবাই এখন তার অনেক আপন শুধু বাংলা ভাষা শিখে এ ভাষায় ভাব আদান প্রদান করার কারণে। এমনকি তার দেখাদেখি অনেকেই এখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিতে নেপালে গেলেও সবাই বাংলা ভাষা জানতে চায়। ফোনে পরিবারের সঙ্গে কথা বললেও টুকটাক বাংলা চলে আসে, তখন সে বাংলা ভাষার অর্থও তাদেরকে বুঝিয়ে দেন। এখন তাদেরও আগ্রহ জন্মেছে বাংলা ভাষা শেখার প্রতি।
তিনি আরো বলেন, ‘শুরুতে বাংলাদেশে পড়তে এসে ভীষণ বিপদে পড়েছিলাম, কেবল বাংলা ভাষা না জানার কারণে। সহপাঠী বন্ধুরা ঠাট্টার ছলে আমাকে নিয়ে মজার ছলে মশকরা করত বাংলা ভাষায়, তা আমি বুঝতাম না, হা করে তাকিয়ে থাকতাম। কারণ তখন আমি তাদের ভাবটা বুঝতাম না, আমাকে ঘিরে কি নিয়ে কথা বলছে তা জানার সুযোগ ছিল না। কিন্তু, এ বন্ধুরায় আমাকে বাংলা শিখিয়েছেন। মনে পড়ে সহপাঠী বাংলাদেশি বন্ধু হুমায়ূন কবিরসহ অনেকের কথা। প্রত্যেকে আমাকে সহযোগিতা করেছে বাংলা ভাষা শেখার জন্য। বাংলা ভাষা শেখার জন্য আমি সহজে সবার কাছাকাছি আসতে পেরেছি, খুব সহজে সবার সঙ্গে মিশতে পারছি। এদেশে পড়াশোনার বিষয়গুলো নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা, গ্রুপ স্টাডি করা সহজ হয়েছে।’
কতদিন লাগলো বাংলা ভাষা শিখতে এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘৪ মাসের মাথায় আমি বাংলা বুঝতে শুরু করি, তখন অল্প অল্প বলতে পারতাম। ৬ মাসের মাথায় পুরোপুরি বলতে শিখে যাই। এখন বাংলা বলার সঙ্গে সঙ্গে লেখারও চেষ্টা করছি।’
বাংলা ভাষায় কথা বলতে কেমন লাগে? উত্তরে তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষা শেখাটা আমার কাছে একটি গর্বের বিষয়। বাংলা একটি মধুর ভাষা। পৃথিবীর সেরা ভাষাগুলোর মধ্যে একটি। আর এ কারণে বাংলা ভাষায় কথা বলতে আমার খুবই ভালো লাগে। বাংলা ভাষার গানগুলো চমৎকার, সেগুলো শুনতে ভালো লাগে। বিশেষ করে বাউল গান বেশি ভালো লাগে। টুকটাক গাইতেও পারি। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে এ ভাষার বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা লাভের একটা ইতিহাস রয়েছে। সারাবিশ্ব এ ভাষার অবদান জানে। সারা বিশ্বে ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ ভাষার মাসে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে শহিদ মিনারে যায়, আমিও নিজেও বইমেলায় ও শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছি। আমি বাংলা ভাষার প্রতি কৃতজ্ঞ।’
এদিকে এসব বিদেশি শিক্ষার্থীদের দেখাশোনার জন্য বাকৃবিতে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক। বর্তমানে এখানে দায়িত্ব পালন করছেন মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের একোয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহফুজুল হক। বিদেশি শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জানার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে পড়তে এসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি শিখছে এটা আমাদের কাছে অনেক ভালো লাগে। শুধু রবি ইয়াদব না তার মতো অনেকেই এখন অনর্গল বাংলা বলতে পারছেন। ওরা আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে এসেও বাংলা ভাষাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে, এতে আমরা বিস্মিত হয়ে যাই। এমনকি ওরা যখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো করে সেখানেও বাংলা ভাষায় নাটক, গান, আবৃত্তি করে। এভাবেই আমাদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে।