ঢাকা,  সোমবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ অর্থনীতি ]

যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল, কেন এত বেশি?

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:২৮, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল, কেন এত বেশি?
সংগৃহীত ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও। এরই মধ্যে দেশের বাজারে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। কয়েক মাস আগেও আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছিল। তখন দেশে জ্বালানির দাম এতটা বাড়ানো হয়নি। ফলে এখন হঠাৎ করে কেন এত বেশি দাম বাড়ানো হলো—তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং পরিবহন ব্যয় বা ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশে সে অনুযায়ী জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়নি। এতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প ছিল না বলে জানানো হয়েছে।

Advertisement

অর্থাৎ, দেশে নতুন দাম নির্ধারণের দিন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমলেও সরকারের সিদ্ধান্তটি কেবল ওই এক দিনের বাজারদরের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়নি। এর পেছনে গত কয়েক মাসের আন্তর্জাতিক বাজারদর, যুদ্ধের কারণে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিপিসির পুঞ্জীভূত লোকসানের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাব ও বাড়তি পরিবহন ব্যয়
আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার পেছনে একাধিক ভূরাজনৈতিক সংকট কাজ করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের প্রভাব পড়েছে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে। একই সময়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথ ও সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিকল্প পরিবহনপথের ওপরও চাপ বেড়েছে। ফলে তেল পরিবহনে সময় ও ব্যয়—দুটিই বেড়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত একসঙ্গে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল, ডিজেল ও জাহাজের জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য তা বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিপিসির লোকসান ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি ব্যয় এবং বিপিসির পুঞ্জীভূত লোকসান সমন্বয়ের অংশ হিসেবেই দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নতুন দাম অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে দাম কত?
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের জ্বালানি তেলের দামের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ভারতে (কলকাতা) ১৩৪ দশমিক ৭৬ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৪ দশমিক ৮৩ টাকা, নেপালে ১৬১ দশমিক ২৪ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ দশমিক ৪২ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ দশমিক ২২ টাকা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ দশমিক ৭১ টাকা, ফিলিপাইনে ১৬৮ দশমিক ৫৩ টাকা, পাকিস্তানে ১৮৫ দশমিক ৪৮ টাকা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ দশমিক ৭৯ টাকা।

দেশে জ্বালানির দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেছে জ্বালানি বিভাগ।

এলএনজি বাজারেও যুদ্ধের প্রভাব থাকলেও বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। তাদের ভাষ্য, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সচল রাখা এবং জ্বালানি পাচার ঠেকাতে জ্বালানির দাম সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই।

ডিজেলে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা
প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে ডিজেলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এতে দৈনিক লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানো হলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে, গত ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। একই সময়ে কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা, পেট্রোলের দাম ১৯ টাকা এবং অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়ানো হয়। পরে জুনে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের প্রথম দিক পর্যন্ত এসব জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত ছিল।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার দিনেও বাংলাদেশে কেন বাড়ল?
বাংলাদেশের বাজারে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার দিন আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ছিল কিছুটা ভিন্ন চিত্র। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ক্ষয়ক্ষতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও প্রত্যাশার তুলনায় তেলের সরবরাহ শক্তিশালী থাকায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে।

সিএনবিসির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১৫ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)-এর দাম ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে ৯৮ দশমিক ৪৬ ডলারে দাঁড়ায়।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এক দিনের দামের ওঠানামা এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তন এক বিষয় নয়। সৌদি আরবের তেল সরবরাহপথে বিঘ্ন ঘটলেও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দেশটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি বাড়িয়েছে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমেছে।

হরমুজ প্রণালি ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি বাজার
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাত অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচল কমে গেলে সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার শোধনাগারগুলোতে হামলা এবং ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তনও ডিজেলের বাজারকে প্রভাবিত করছে। ফলে শুধু অপরিশোধিত তেলের দাম নয়, পরিশোধিত জ্বালানি এবং পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তনও আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের সাম্প্রতিক এক দিনের দর নয়, বরং গত কয়েক মাসের আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং বিপিসির বড় অঙ্কের লোকসান বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের বক্তব্য। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হবে কি না, সেটি নির্ভর করবে বৈশ্বিক বাজারের গতিপ্রকৃতি এবং সরকারের মূল্য সমন্বয় নীতির ওপর।

ডেইলি-বাংলাদেশ/একেকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!