ঢাকা,  রোববার   ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

জাতীয় যুব পুরস্কারে দেশসেরা নাটোরের রায়হান

নাটোর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৮:৩৫, ১ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয় যুব পুরস্কারে দেশসেরা নাটোরের রায়হান
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

নাটোরের লালপুর উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা মো. আব্দুল মোত্তালেব রায়হান জাতীয় যুব পুরস্কার-২০২৬-এ সফল আত্মকর্মী ক্যাটাগরিতে সারাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন। কৃষি, মৎস্য, তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, ব্যাংকিং ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে উদ্যোগ গড়ে তোলার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখায় তিনি এ স্বীকৃতি পেয়েছেন।

রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় যুব দিবসের অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর আয়োজিত অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিতরণ করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’।

২০১৪ সালে যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ছয়টি গরু নিয়ে খামার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করেন রায়হান। সময়ের সঙ্গে তাঁর উদ্যোগের পরিধি বেড়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন খাতে একাধিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছেন তিনি।

মৎস্য খাতে নিজের ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্থানীয় মাছচাষিদের বাজারজাতকরণের সমস্যা সমাধানে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘সোনার বাংলা মৎস্য আড়ত’। কৃষি খাতে মিশ্র ফলবাগানে জৈব পদ্ধতিতে বিষমুক্ত ফল উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছেন। পাশাপাশি ‘আশার আলো জৈব সার কারখানা’র মাধ্যমে ট্রাইকো কম্পোস্ট ও ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করছেন। তাঁর উৎপাদিত জৈব সার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটিতে বসবাসরত রাশিয়ান নাগরিকদের জন্য উৎপাদিত শাকসবজি ও ফল চাষেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারখানায় কাজ করছেন প্রায় ৩০ জন।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘লিড টপার’ ও ‘হলিটেক আইটি’। প্রতিষ্ঠান দুটি থেকে প্রায় ৩০০ তরুণ প্রশিক্ষণ নিয়ে আয়ের সুযোগ পেয়েছেন। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০ জন কর্মরত এবং আরও ১০০ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

লালপুরের কৃষকদের সেচসংকট মোকাবিলায় বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও উদ্যোগের মাধ্যমে ২৪টি গভীর নলকূপ স্থাপনে সহযোগিতা করেছেন রায়হান। স্থানীয় মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ডক্টরস পয়েন্ট অ্যান্ড ডায়াবেটিক সেন্টার’। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২০ জনের।

প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের ব্যাংকিং সেবা সহজ করতে ইসলামী ব্যাংকের গোপালপুর ও আব্দুলপুরে দুটি এজেন্ট শাখা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ২০২০ ও ২০২১ সালে চালু হওয়া শাখা দুটিতে কাজ করছেন ১৪ জন। এ ছাড়া জনতা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির লালপুর কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রায় আট বছর ধরে ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন এবং পিএসপি এক্সপ্রেস প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে কুরিয়ার সেবা দিয়ে আসছেন।

উদ্যোক্তা কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখছেন রায়হান। তিনি গ্রীন লালপুর প্রকল্পের সমন্বয়ক, গ্রীন ভয়েসের লালপুর উপজেলা শাখার উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) লালপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি। এসব সংগঠনের উদ্যোগে প্রতিবছর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার ফলজ ও বনজ গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করা হয়।

২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় মাস্ক বিতরণ, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং প্রাকৃতি ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় অসহায় ও আক্রান্ত মানুষের বাড়িতে খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দেন তিনি। এসব মানবিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছ থেকেও সম্মাননা পেয়েছেন।

শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নেও তাঁর অংশগ্রহণ রয়েছে। আর্থিক সংকটে উচ্চশিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়া মেরিনা, ফাতেমা, সানজিদা ও প্রার্থনাসহ কয়েকজন মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এ ছাড়া প্রাকৃতি ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এবং তাঁর সভাপতিত্বে লালপুরের দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে ‘আলোর দরজা শিশু বিদ্যা নিকেতন’।

সাংবাদিকতার মাধ্যমেও এলাকার বিভিন্ন সমস্যা, অনিয়ম ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরেছেন রায়হান। সরকার টেক্সটাইল স্থানান্তরের প্রতিবাদ এবং সামাজিক বনায়নের গাছ রোপণ নিয়ে অনিশ্চয়তা নিরসনের দাবিতে তাঁর নেতৃত্বে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় মানুষের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতে প্রতিষ্ঠা করেছেন সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘লালপুর বার্তা’।

ছাত্রজীবন থেকেই বিএনসিসি, বাংলাদেশ স্কাউটস ও রোভার স্কাউটসহ বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন তিনি। এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি সাংবাদিকতা বিষয়েও একাধিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

রায়হানের বিভিন্ন উদ্যোগে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় তরুণদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি, কৃষকদের সহযোগিতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তাঁর উদ্যোগগুলো ভূমিকা রাখছে।

রায়হানের বাড়ি লালপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামে। তাঁর বাবা মো. মজিবর রহমান এবং মা মোছা. রওশনআরা বেগম। জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের খবরে লালপুরের স্থানীয় সচেতন মহল ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, তাঁর এই সাফল্য এলাকার তরুণদের উদ্যোক্তা হতে এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করতে উৎসাহিত করবে।

উল্লেখ্য, জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে দুটি ক্যাটাগরিতে জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে মোট ১৪ জনকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!