ঢাকা,  শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

চুনতি সংরক্ষিত বনে আবারও বালু উত্তোলনের চেষ্টা, নতুন রাস্তা তৈরির অভিযোগ

রায়হান সিকদার, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশিত: ১৯:২২, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
চুনতি সংরক্ষিত বনে আবারও বালু উত্তোলনের চেষ্টা, নতুন রাস্তা তৈরির অভিযোগ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় চুনতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লম্বাশিয়া এলাকায় আবারও পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনের অপচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে একাধিক অভিযান, মামলা ও বালু পরিবহনের সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেও স্থায়ীভাবে তা বন্ধ করা যায়নি। এবার আগের বন্ধ পথ এড়িয়ে নতুন রাস্তা তৈরি করে বালু পরিবহন এবং পাহাড় কেটে নতুন করে বালু উত্তোলনের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চুনতি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাতগড় লম্বাশিয়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড় কেটে এবং পাহাড়ি ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে একটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ অভিযান চালিয়েছে। কখনো বালু পরিবহনের রাস্তা কেটে দেওয়া হয়েছে, কখনো যন্ত্রপাতি উদ্ধার এবং মামলা করা হয়েছে। তবে অভিযান শেষে কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও পরে আবারও বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে।

বছরখানেক আগে লম্বাশিয়ায় বালু উত্তোলনের বিষয়টি নজরে আসার পর এলাকাটি পরিদর্শন করেন তৎকালীন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এ সময় তিনি পাহাড় কাটায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বালু উত্তোলনস্থলে যানবাহনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ করে সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে বলেন।

পরে ওই নির্দেশনা অনুযায়ী বালু উত্তোলনস্থলে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে বালু উত্তোলন ও পরিবহনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সম্প্রতি বন্ধ করা পথের বিকল্প হিসেবে নতুন রাস্তা তৈরি করে আগে উত্তোলিত বালু সরিয়ে নেওয়া এবং নতুন করে পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনের চেষ্টা চলছে। এতে সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় নেওয়া উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

স্থানীয়দের দাবি, লম্বাশিয়া এলাকায় প্রায় এক যুগ ধরে পাহাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের চুনতি রেঞ্জের সাতগড় বনবিটের আওতাধীন এ এলাকায় শ্যালো মেশিন বসিয়ে পাহাড়ি ছড়া থেকে বালু সংগ্রহ এবং তা পরিবহনে অস্থায়ী সড়ক নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।

নথি ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৪ নভেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করে। এর মাত্র তিন দিন পর, ২৭ নভেম্বর অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট গভীর গর্তের পানিতে পড়ে একটি বন্যহাতির মৃত্যু হয়।

এরপর ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ যৌথ অভিযান চালিয়ে বালু পরিবহনের সড়কের বিভিন্ন অংশ কেটে দেয়। এতে কয়েক মাস বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও পরে সড়ক সংস্কার করে আবারও কার্যক্রম শুরু হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২০ মার্চ যৌথ অভিযানে বালু পরিবহনের পাঁচটি স্থানে সড়ক কেটে দেওয়া হয়। তবে এসব উদ্যোগেও স্থায়ীভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করা যায়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, লম্বাশিয়া এলাকায় পাহাড়ের দিকে যাওয়ার পথে একটি সেতুর দুই পাশে বালুবাহী যানবাহনের চলাচল বন্ধ রাখতে স্থাপন করা প্রতিবন্ধকতা এখনো রয়েছে। আগে উত্তোলন করা বালুর তিনটি স্তূপও সেখানে দেখা যায়। তবে স্থানীয়দের দাবি, নতুন রাস্তা তৈরি করে এসব বালু পরিবহন ও সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আবারও পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনের চেষ্টা করছে একটি মহল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার অভিযান চালিয়েও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না। এতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে বনাঞ্চল রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, চুনতি সংরক্ষিত বনাঞ্চল বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। বিশেষ করে এশীয় হাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণ ও চলাচলের জন্য এ বনাঞ্চলের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনের ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তিত হয়, গভীর গর্ত সৃষ্টি হয় এবং পাহাড়ি ছড়া ও আশপাশের ভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন এ ধরনের কার্যক্রম চললে ভূমিক্ষয় ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস নষ্ট হলে তাদের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের চুনতি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আবির হাসান বলেন, লম্বাশিয়া এলাকায় বন বিভাগের নিয়মিত টহল জোরদার রয়েছে। আগে উত্তোলন করা বালু সরিয়ে নেওয়া কিংবা নতুন করে পাহাড় কেটে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অপচেষ্টা কেউ করলে কঠোরভাবে দমন করা হবে।

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দ বলেন, লম্বাশিয়া এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবেশ ধ্বংসের চেষ্টা করা হলে উপজেলা প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেবে। বালু উত্তোলন বা পরিবহনের চেষ্টা করলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/লোহাগাড়া/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!