মেঘালয়ে ফিরতে পারছে না ১৫০ বন্যহাতি, গারো পাহাড়ে বাড়ছে মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব
ময়মনসিংহের গারো পাহাড়সংলগ্ন শেরপুর ও জামালপুরের সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আটকা পড়ে আছে প্রায় ১৫০টি বন্যহাতি। ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে আসা এসব হাতি গত দুই বছর ধরে নিজ আবাসস্থলে ফিরতে পারছে না। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার গেট বন্ধ থাকায় হাতিগুলোর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন খাদ্যসংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে হাতির আক্রমণে ফসল ও ঘরবাড়ির ক্ষতির পাশাপাশি বাড়ছে মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব।
এ পরিস্থিতিতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু শনিবার (১০ অক্টোবর) শেরপুরের বন্যহাতি অধ্যুষিত গারো পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শনে যাচ্ছেন।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায় থাকা গেটগুলো খুলে দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অনুরোধ করা হয়েছে। তবে সেসব অনুরোধে সাড়া মেলেনি। ফলে হাতিগুলো মেঘালয়ের বনাঞ্চলে ফিরতে না পেরে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান করছে।
দুই যুগে বেড়েছে হাতির সংখ্যা
ঢাকার কেন্দ্রীয় বনাঞ্চলের বন সংরক্ষক এএসএম জহির উদ্দিন আকন গণমাধ্যমকে বলেন, একসময় ভারতের মেঘালয় থেকে আসা হাতিগুলো বছরে দুইবার বাংলাদেশে প্রবেশের পর আবার নিজ আবাসস্থলে ফিরে যেত। কিন্তু গত দুই বছরে তারা একবারও মেঘালয়ে ফিরতে পারেনি।
তিনি জানান, ২০০৭ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ শেরপুর ও জামালপুর সীমান্তে প্রায় ৫০ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করে। পরবর্তী সময়ে হাতির পাল কয়েকবার বেড়া ভেঙে ফেলায় সেখানে প্রায় ৪৪টি গেট স্থাপন করা হয়। এ ছাড়া হাতির চলাচলের সুবিধার্থে নদী ও ছড়ার ওপর ১১টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়।
তবে গত দুই বছর ধরে গেটগুলো বন্ধ রয়েছে। হাতিগুলো আন্ডারপাস দিয়ে ভারতে ফেরার চেষ্টা করলে বাধার মুখে পড়ে এবং তাড়িয়ে আবার বাংলাদেশে পাঠানো হয় বলে জানান এই বন কর্মকর্তা।
বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে শেরপুর ও জামালপুরের প্রায় ১২ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ১৫০টি বন্যহাতি বিচরণ করছে। এসব হাতির মধ্যে ২৫ থেকে ৩০টি শাবক রয়েছে। প্রায় দুই দশক আগে ১০ থেকে ১৫টি হাতি নিয়ে শুরু হওয়া এ উপস্থিতি সময়ের সঙ্গে বেড়েছে।
খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে হাতি
বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত খাবার না থাকায় হাতিগুলো প্রায়ই খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। বসতবাড়ি, ধানখেত ও সবজিক্ষেতে হানা দিয়ে নষ্ট করছে কৃষকের ফসল। হাতির আক্রমণ থেকে ফসল ও ঘরবাড়ি রক্ষা করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে হাতির সংঘাত তৈরি হচ্ছে। এতে কখনো মানুষের, আবার কখনো হাতির প্রাণহানি ঘটছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, হাতির কারণে ফসলের ক্ষতি হলেও নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। পাহাড়ি এলাকার বন বিভাগের জমি, খাসজমি ও খ-তফসিলভুক্ত জমিতে ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। এসব জটিলতা কমিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার শর্ত শিথিল করার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা।
নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের দাওধারা গ্রামের কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, গত বোরো মৌসুমে বন্যহাতি তাঁর জমির প্রায় ৪০ মণ পাকা ধান নষ্ট করেছে। তবে এখনো বন বিভাগ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি তিনি।
একই উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের বুরুঙ্গা গ্রামের কৃষক এরশাদ আলম জানান, হাতির আক্রমণের আশঙ্কায় গত দুই বছর ধরে মধুটিলা বনাঞ্চলের কাছে তাঁর আড়াই একর জমিতে চাষাবাদ বন্ধ রেখেছেন।
দুই অর্থবছরে ক্ষতি ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল
বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেরপুরে বন্যহাতির হামলায় অন্তত ৩৫৬টি ঘটনায় ঘরবাড়ি ও ফসলের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সময়ে ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। একই সময়ে মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বে অন্তত ১০ জন মানুষ ও চারটি বন্যহাতির মৃত্যু হয়েছে।
এ পরিস্থিতি স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি হাতি সংরক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সীমান্তে অবাধ চলাচলের ব্যবস্থা চান গবেষক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এমএ আজিজ ‘উত্তর বাংলাদেশে বন্যহাতি, সীমান্ত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, মানব-হাতি দ্বন্দ্ব ও হাতি সংরক্ষণে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণার লেখক।
তিনি বলেন, ফসলের খেতে ঢুকে পড়া হাতিগুলোকে প্রায়ই গ্রামবাসী তাড়া করেন। এ সময় তাড়া খেয়ে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে পৌঁছে আটকা পড়া হাতিগুলো আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এতে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে।
অধ্যাপক এমএ আজিজের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতকে যৌথভাবে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। হাতিগুলোর স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে সীমান্তের গেট খুলে দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ও ভারত ২০১৭ সালে আন্তঃসীমান্ত হাতি সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা শুরু করে। পরে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এ বিষয়ে একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। তবে এরপর উল্লেখযোগ্য কার্যকর অগ্রগতি হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, প্রটোকলটি কার্যত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
অধ্যাপক আজিজ আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে শুধু পাহাড়ি এলাকাকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করলে সমস্যার সমাধান হবে না। হাতির নিরাপদ চলাচল, মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা এবং সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের ব্যবস্থাপনা সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
এআই ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ
মানুষ ও বন্যহাতির সংঘাত কমাতে শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণে কয়েকটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন।
মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, বন্যহাতির আবাসস্থলকে অভয়ারণ্য ঘোষণার জন্য সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বন্যহাতির অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতকে চিঠি দেওয়া হবে।
সীমান্তের গেট খুলে দেওয়া, হাতির চলাচলের পথ নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সময়মতো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা না গেলে গারো পাহাড়ে মানুষ ও বন্যহাতির সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।