গায়ে ধাক্কা লাগায় খুন
শুক্রবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজ পড়ে বাসায় ফিরছিলেন চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও থানার খলিফাপাড়া এলাকার আবু সিদ্দিকের ছেলে সাজ্জাদ হোসেন। এ সময় রাস্তায় আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েকজন কিশোর। হেঁটে যাওয়ার সময় তাদের মধ্যে ফারুক নামে একজনের সঙ্গে ধাক্কা লাগে সাজ্জাদের। এ নিয়ে ফারুক ও সাজ্জাদের কথা কাটাকাটি হয়।
সন্ধ্যার ঘটনার পর রাত সোয়া ৯টার দিকে খাজা রোড এলাকার একটি চায়ের দোকানে বন্ধুদের নিয়ে চা পান করছিলেন সাজ্জাদ। এ সময় ফারুকসহ কয়েকজন সাজ্জাদের পায়ে ও বুকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যান। পরে সাজ্জাদকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরের দিন শনিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) ভোরে তার মৃত্যু হয়।
.png)
এ ঘটনায় চান্দগাঁও থানায় মামলা করেন সাজ্জাদের বাবা। মামলার পর মৌলভীপাড়া ও হামিদচর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ফারুকসহ দুই কিশোরকে গ্রেফতার করে চান্দগাঁও থানা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি উদ্ধার করা হয়।
রিকশা থামিয়ে ছিনতাই
শুক্রবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের নিউমার্কেট মোড়ে শিখা চৌধুরী নামে এক নারীর রিকশা থামিয়ে তার ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। ব্যাগটিতে একটি মোবাইল ফোন ও ৫০ হাজার টাকাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল। ঘটনার পর ঐ নারী থানায় মামলা করলে ছিনতাইকারীদের ধরতে অভিযানে নামে কোতোয়ালি থানা পুলিশ।
পরের দিন শনিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পুরাতন রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকা থেকে চক্রের মূলহোতাসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে দুইজন কিশোর। তাদের কাছ থেকে ছিনতাই হওয়া একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
সপরিবারে ছিনতাইয়ের শিকার
গত ১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোডের ছিন্নমূল এলাকায় পরিবারসহ ছিনতাইয়ের শিকার হন মহিউদ্দিন হৃদয় নামে একজন।
ঐ ঘটনায় ৫ জানুয়ারি রাতে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলা হয়। মামলার পর অভিযান চালিয়ে ছিন্নমূল এক নম্বর গেট এলাকা থেকে এক কিশোরসহ দুইজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহৃত একটি ধারালো ছোরাসহ ভুক্তভোগীর ছিনতাই করা মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও টাকা উদ্ধার করা হয়।
মূলহোতা ‘বড়ভাই’
যদিও এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নানামুখী তৎপরতার কথা বলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবুও যেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কিশোর অপরাধীদের। এর কারণ হিসেবে অনুসন্ধান বলছে- কিশোরদের এসব অপকর্মের মূলে থাকে তাদের কথিত ‘বড়ভাই’। নগর থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপজেলায়ও কথিত বড় ভাইদের ইশারায় অপরাধজগতে পা বাড়ায় উঠতি বয়সী কিশোররা। নানা সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে এসব কিশোররা ধরা পড়লেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যান কথিত বড় ভাইয়েরা। ফলে বড় ভাইদের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন অপরাধ
বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন- এলাকায় চাঁদাবাজি, সরকারি দফতরগুলোতে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, জমি দখল, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল কিংবা কোণঠাসা করাসহ বিভিন্ন কাজে কিশোরদের ব্যবহার করছেন কথিত বড় ভাইরা। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণও প্রায় অসম্ভব।
নগরে সক্রিয় অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং
জানা গেছে, চট্টগ্রাম শহরজুড়ে সক্রিয় রয়েছে ৫০টিরও বেশি কিশোর গ্যাং। রাতভর চলে তাদের ছিনতাই কার্যক্রম। সম্প্রতি তাদের ধরতে রোবাস্ট পেট্রোলিং শুরু করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং অপরাধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানও রাখে এটি।
সম্প্রতি নগরের একেখান মোড়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কিশোর গ্যাংয়ের নানা কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব আলম। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড একটি আলোচিত বিষয় এবং ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা। অল্প বয়সী কিশোররাই এসব গ্যাং বা গ্রুপের সদস্য। তারা পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠনের মাধ্যমে নিজেদের সংঘবদ্ধ করে। নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে গিয়ে এসব গ্রুপের সদস্যরা ঝগড়া, মারামারি দিয়ে শুরু করে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সন্ত্রাস, মাদক, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, হত্যা ও ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরো বলেন, ইদানীং কিশোর গ্যাং অপরাধের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। নগরের বিভিন্ন স্থানে ৫০টির বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এরই মধ্যে অনেককে আইনের আওতায় আনা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ছিনতাইয়ে জড়িতদের বয়স ১৪ থেকে ১৮
নগরে ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছেন এমন কয়েকজন জানান, ছিনতাইয়ে জড়িতদের বেশিরভাগের বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছর। বয়স কম হলেও পেশাদার ছিনতাইকারীদের মতো নগরজুড়ে ছিনতাই করে বেড়ায় তারা। ছিনতাইকালে তাদের সঙ্গে থাকে ছুরি, চাকুসহ ধারালো অস্ত্র।
৫ বছরে অর্ধশত খুন কিশোরের হাতে
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে নগরে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ঘটেছে অন্তত অর্ধশত খুনের ঘটনা। তাদের দৌরাত্ম্য কমাতে ২০১৯ সালে নগরের ৩০০ স্পটে সক্রিয় থাকা ৫০০ কিশোর গ্যাং সদস্যের তালিকা তৈরি করে নগর পুলিশ। তাদের দমাতে শুরু হয় অভিযানও। অভিযানের মুখে সেসময় দাপট কিছুটা কমলেও বন্ধ হয়নি কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কতিপয় ছাত্র-যুব নেতা, কিছু জনপ্রতিনিধি এবং বস্তি এলাকায় সন্ত্রাসীরা নিয়ন্ত্রণ করছে কিশোর গ্যাং।
কিশোরদের দিয়ে অপকর্ম করানো সহজ!
পুলিশের পরিদর্শক পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, যেকোনো ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট রয়েছে পুলিশ। কিন্তু একজন প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীকে ধরে সরাসরি আইনের আওতায় আনা গেলেও কিশোরদের ক্ষেত্রে তা কিছুটা ভিন্ন। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিশোরদের ব্যবহার করে অপকর্ম করে বেড়ায় একটি অপরাধী মহল। তাদের আইনের আওতায় আনা গেলেই কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।
হিরোইজম থেকে অপরাধে কিশোররা
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ডেপুটি গভর্নর আমিনুল হক বাবু বলেন, বর্তমান সময়ে কিশোর গ্যাং একটি বড় সমস্যা। এটি সমাজের বিষফোঁড়ার মতো। উঠতি বয়সী কিশোরদের মধ্যে এক ধরনের হিরোইজম কাজ করে, সেটিকে পুঁজি করে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত করে একটি মহল। আর নিজেরা থেকে যায় আড়ালে। দিনশেষে বড় থেকে আরো বড় অপরাধী হয়ে ওঠে একজন কিশোর।
এক সময়ের কিশোর অপরাধী এখন ছিনতাইকারী গ্রুপের প্রধান
গত ১ ফেব্রুয়ারি নগরের কোতোয়ালি থানার জলসা মার্কেটের সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন ইব্রাহিম সিফাত নামের এক যুবক। ছিনতাইকারীরা তার মোবাইল ফোন, মানিব্যাগসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র নিয়ে যায়। ঐ ঘটনায় থানায় মামলা হলে ছিনতাইকারীদের ধরতে অভিযানে নামে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৭ ফেব্রুয়ারি মেরিনার্স রোড এলাকা থেকে গোলাম রসুল সানিকে গ্রেফতার করা হয়।
সানির কাছ থেকে লুণ্ঠিত মালামাল ও দুই রাউন্ড কার্তুজ এবং সানির দেওয়া তথ্যে একটি দেশীয় তৈরি এলজি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, নগরীতে ‘বড় ভাই’ গ্রুপ নামে একটি ছিনতাইকারী চক্র রয়েছে। সেই চক্রটির নেতৃত্ব দিতেন সানি। এক সময়ের কিশোর অপরাধী সানির বিরুদ্ধে বর্তমানে কোতোয়ালিসহ বিভিন্ন থানায় নয়টি মামলা রয়েছে বলে জানায় পুলিশ।
প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা
সম্প্রতি বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ) কর্তৃক আয়োজিত ‘কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও মিডিয়ার ভূমিকা এবং আমাদের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা জানান, রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে শুধু আইনের কঠোরতা দিয়ে শিশু-কিশোর বা গ্যাং কালচারের অপরাধে জড়িতদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এর নেপথ্য মদদদাতাদের চিহ্নিত করে তাদেরও আইনের আওতায় আনা অতি আবশ্যক। কিছু রাজনৈতিক নেতা তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিশোরদের ব্যবহার করেন, যা মোটেও কাম্য নয়।
জনপ্রতিনিধির ভূমিকা
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ডেপুটি গভর্নর আমিনুল হক বাবু বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একার পক্ষে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এজন্য প্রতিটি এলাকার জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কিশোরদের কল্যাণকর কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাহলেই খুব সহজে এই সমস্যার সমাধান হবে।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) আবদুল মান্নান মিয়া বলেন, কিশোর অপরাধ দমনে আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। অপরাধ যেই করুক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, উঠতি বয়সী ছেলেদের মধ্যে এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চার কাজ করে। ইন্টারনেট ঘাঁটার ফলে নিজেকে জাহির করার একটি কালচার তাদের মধ্যে তৈরি হয়। এর ফলে দেখা যায় হঠাৎ করে একটি অপরাধ করে বসে। তবে কোথাও এ ধরনের কিছু পেলে আমলে নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে আমাদের থানার ওসিদের নির্দেশনা দেওয়া আছে।
২০১৯ সালে করা নগর পুলিশের তালিকার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তালিকা করে কিন্তু আমরা বসে নেই। সেই তালিকা প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করা হচ্ছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।