‘বিয়ে-মিছিল-মিটিং নেই, ভিক্ষা চাওয়ার সময় এসে গেছে’
রাজধানী ঢাকার আলুবাজার এলাকার হাজী ওসমান গণি রোড। যেখানে ঢুকতেই একে একে নজরকাড়ে ‘ঢাকা ব্যান্ড পার্টি’, ‘বাংলাদেশ ব্যান্ড পার্টি’, ‘স্পেশাল ব্যান্ড পার্টি’ নামের দোকানগুলো।
ঢাকার যেসব ঐতিহ্য এখন পর্যন্ত খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে হলেও টিকে আছে তার মধ্যে নিঃসন্দেহে উপরের সাড়িতেই অবস্থান এই ‘ব্যান্ড পার্টি’ শিল্পের।
বৈশ্বিক মহামারির ছোবলে যেখানে দেশের অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যে কার্যত মন্দা অবস্থা বিদ্যমান। সেখানে কোভিড-১৯ সময়কালে শত বছরের পুরোনো এই ‘ব্যান্ড পার্টি’ শিল্পের শিল্পীদের কীভাবে দিন কাটছে?
অতীতে এবং বর্তমানে তাদের ব্যবসায়ে কি ধরণের পরিবর্তন এসেছে- সেসব বিষয়ে জানতে কথা হয়েছিলো এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মালিক ও শিল্পী পক্ষের সঙ্গে।
উভয়পক্ষই তুলে ধরেন- মহামারিতে অন্য সব ব্যবসা চললেও একেবারেই বন্ধ রয়েছে ব্যান্ড পার্টির সব ধরনের কার্য্ক্রম। মহামারির শুরু থেকেই (মার্চ) আমাদের সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
এখন সবারই কাজ আছে। এমনকি যারা রাস্তায় ফেরি করে মালামাল বিক্রি করে, তাদেরও কাজ আছে। আমাদের ব্যান্ড পার্টির কাজ নেই, এভাবেই আক্ষেপের সুরে নিজেদের করুণ অবস্থা বর্ণনা করছিলেন মোহাম্মদ সাঈদ নামের ঢাকা ব্যান্ড পার্টির এক শিল্পী।
অথচ এরাই গত কয়েক দশক ধরে বিয়ে, জম্মদিন, বৈশাখসহ যেকোনো অনুষ্ঠানে বাংলা ঢোল, সানাইপার্টি, জামাই ছাতা, পাখা, তলোয়ার, ঘোড়ার গাড়ি, ঢুলকি, পালকি, কার্টুন, হাতির মাধ্যমে মানুষের মনে আনন্দ ও সংস্কৃতির খোড়াগ যুগিয়েছেন।
এছাড়া রাজনৈতিক মিছিল, মিটিং, সভা-সমাবেশ,র্যালি, নির্বাচনের বিজয় অনুষ্ঠান এবং সেইসঙ্গে সিনেমা মুক্তি পাওয়ার আগে থেকে প্রচার-প্রসারের কাজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের উপস্থিতিও ছিলো চোখে পড়ার মতো।
তবে ব্যান্ড পার্টির কাজ না থাকায় এ পেশায় নিযুক্ত শিল্পীরা ‘কীভাবে টিকে থাকবেন’ এখন সে চিন্তায় তাদের দিন কাটছে।
শিল্পী সাঈদের ভাষায়, আমাদের ব্যান্ডপার্টির যদি কাজ না হয়, তাহলে আমরা কীভাবে চলবো, কি করে খাবো? ছেলেমেয়ে নিয়ে কীভাবে দিন কাটাবো? ঘর ভাড়া কীভাবে দিবো?
এখন আমাদের রাস্তায় বসে ভিক্ষা চাওয়ার সময় এসে গেছে! এ কথা বলেই কেঁদে ফেলেন মি: সাঈদ।
এটি স্পষ্ট পরিলক্ষিত যে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই নিজেদের পেশা ছেড়ে জীবনের তাগিদে অন্য পেশাকে জীবিকা হিসেবে বেঁচে নিচ্ছেন। তবে ব্যান্ড পার্টি শিল্পীদের ক্ষেত্রে সে কথা ভিন্ন!
বংশ পরপম্পরায় যুগের পর যুগ ধরে যে পেশাকে তারা লালন করে এসেছেন তাদের পক্ষে এই দুর্বিসহ সময়েও সে শিল্পের মায়া কাটিয়ে অন্য পেশাকে গ্রহণ করা দুরূহ। কারণ- তারা যে শিল্পী!
সাঈদ, যিনি গত ৪০ বছর যাবত এই কাজে আছেন, অন্য পেশাকে কেন তারা বেছে নেন না? এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন- অন্য কাজে আমরা যেতে পারি না, অন্য কোনো কাজে আমাদের অভ্যাস নেই। আমরা শিল্পী লোক, এটা আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের দাদার আমল থেকে এ কাজ করে আসছি।
অন্য পেশার মানুষদের যেখানে মাসিক একটি নির্দিষ্ট বেতন থাকে সেখানে ব্যান্ড পার্টির বাজনাদারদের কোনো নির্দিষ্ট বেতন নেই। কোনো পার্টি কাজ পেলে সে পার্টির শিল্পীরা চুক্তি অনুযায়ী তাদের পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। আর কাজ না থাকলে তাদের বসে থাকতে হয় পরবর্তী কাজের আশায়।
আমাদের কাজ হলে পয়সা আছে, না হলে পয়সা নাই। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দুটো ডালভাত খাবো সে পয়সাও পাচ্ছি না, বলছিলেন সাঈদ।
এখন যেহেতু ব্যান্ড পার্টির কাজ বন্ধ সরকারের কাছে সাঈদের দাবি- সবারই তো কাজ আছে, তাদেরকে তো সরকারের সাহায্য করা লাগছে না। আমরা যে কীভাবে চলতেছি, কি করতেছি, এসব তাদের (সরকারের) দেখা উচিত।
এদিকে মহামারির কারণে ব্যান্ড পার্টির বাজনাদারদের অনেকেই ঢাকা ছেড়ে গ্রামে পাড়ি জমিয়েছেন। তবে কেউ কেউ ঋণ করে এখনো ঢাকা শহরে রয়ে গেছেন। যাদের অনেকেই গত পাঁচ মাস ধরে বাসা ভাড়া দিতে পারেনি। প্রতি মাসে আশায় আছেন হয়তো আসছে মাসে কাজ পাবেন।
দুর্যোগকালীন সময়ে অন্যান্য কার্যক্রম বিশেষ করে বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠান (বড় আকারে), কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল-কলেজ, রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধ থাকায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে ব্যান্ড পার্টির দলগুলোতে ।
এ বিষয়ে বলছিলেন প্রায় শত বছরের পুরানো বাংলাদেশ ব্যান্ড পার্টির মালিক মোহাম্মদ হুমায়ূন, আগে আমাদের ব্যবসা অনেক ভালো ছিলো। আমরা সবচেয়ে বেশি পার্টির (রাজনৈতিক কর্মসূচি) কাজ করতাম।
এছাড়া স্কুল-কলেজ,ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কাজ আমরা ১২ মাসই করতে পারতাম। তবে করোনাভাইরাসে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমরা বসে আছি।
যারা স্থায়ীভাবে এ পেশায় আছেন তারা মালিকদের কাছ থেকে কিছু খরচপাতি পেয়ে থাকলেও সেটা তাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়।
যারা আমার স্থায়ী শিল্পী তাদের কিছু খরচাপাতি দিচ্ছি তারা যেন কোনোভাবে জীবন চালাতে পারে। তবে সেটা তাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়, কথাগুলো বলছিলেন হূমায়ূন।
ব্যান্ড পার্টির সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্টদের আশা অক্টোবরে কমিউনিটি সেন্টারগুলো যদি খুলে দেয়া হয়, রাজনৈতিক মিছিল-মিটিং আবার চালু হয় তাহলে আবারো পুরোদমে তারা কাজ শুরু করতে পারবেন।
এ ব্যাপারে জনাব হুমায়ূন বলেন, করোনাভাইরাসে ব্যান্ডপার্টির ব্যবসা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সরকার যদি আমাদের দিকে তাকায় তাহলে আমরা বাঁচতে পারবো।
হুমায়ুন আরো বলেন, আমার যে শিল্পীরা আছে, তারা এই কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজে যেতে পারে না। এখন বিপদে পড়ে, জীবন বাচানোর তাগিদে হয়তো কেউ রিক্সা চালাচ্ছে। কে কোথায়, কীভাবে, কি অবস্থায় আছে, জানি না।
দেশের অন্যান্য প্রান্তের সঙ্গে ঢাকার গোপীবাগ, লালবাগ, মিরপুরে ব্যান্ড পার্টির অস্তিত্ব বিরাজমান থাকলেও মূলত ব্রিটিশ আমলে পুরান ঢাকার আলুবাজারে সর্বপ্রথম ব্যান্ড পার্টির আবির্ভাব ঘটে।
বস্তুত ৯০ এর দশক পর্যন্ত ছিলো ব্যান্ড পার্টির সোনালি সময়। তখনকার দিনের প্রায় সব সিনেমা নাটকেও ব্যান্ড পার্টিকে দেখা যেতো। যেটি এখন বিরল বলা চলে।
অতীতে রাজনৈতিক কর্মসূচির বিপরীতে বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যান্ড দলগুলো বেশি সরব ছিল। যদিওবা বর্তমানে রাজনৈতিক বিভিন্ন প্রোগামে তাদের উপস্থিতি যেন এক আবশ্যক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আধুনিককালে এ শিল্পের অবস্থান একেবারে তলানিতে গিয়ে না ঠেকলেও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই সান্দিহান। দেশে ব্যান্ড পার্টির সংখ্যা এখন পূর্বের তুলনায় চার ভাগের এক ভাগ।
ব্যান্ড শো-সহ আধুনিক নানা জিনিসের আবির্ভাব,ডিজিটাল জিনিসের আধিপত্য, জীবিকার অনিশ্চয়তা ইত্যাদি নানা কারণে নতুন করে তেমন কেউ একাজ শিখতে ও করতে চায় না।
আমাদের ভবিষ্যৎ এখানেই শেষ কিনা কে জানে। নতুন করে লোকে এখন আর এ কাজ শিখতে চায় না। আমাদের পর এটা টিকে থাকবে কিনা এটা বলা মুশকিল, ব্যান্ড পার্টির ভবিষৎ নিয়ে এমন মন্তব্য করেন হুমায়ূন।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যান্ড পার্টির আবেদন হয়তো কমে গেছে। তবে এখন অনেক আভিজাতিক অনুষ্ঠানে ব্যান্ড দলগুলো মানুষকে বিনোদনের এক অভূতপূর্ব আমেজ উপহার দিয়ে চলেছে।