২২ বছরেও মেলেনি বাবার স্বীকৃতি, পিতৃপরিচয়ের আশায় আদালতে অনিক
যে বয়সে বাবার স্নেহ-ভালোবাসায় বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সে নিজের পিতৃপরিচয়ের স্বীকৃতি পেতে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন কলেজছাত্র কামরুল ইসলাম অনিক। জন্মের পর থেকে বাবার সান্নিধ্য না পাওয়ার বেদনা বয়ে বেড়ানো এই তরুণ এখন মাকে সঙ্গে নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তার চাওয়া, জন্মদাতা বাবার পরিচয়টুকু যেন আইনি স্বীকৃতি পায়।
২২ বছর বয়সী অনিকের বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার তেলকুপি গ্রামে। তার দাবি, খুরশিদ জিন্নাহ ওরফে কার্বন তার বাবা। খুরশিদ গুপিরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার রহমতগঞ্জ মহল্লার আব্দুর রউফ মনির ছেলে।
অনিকের মা হাফিজা খাতুনের দাবি, সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় তাদের দাম্পত্য সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটে। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকতেই স্থানীয় মাতব্বরদের নিয়ে সালিশের মাধ্যমে তাকে তালাক দেন খুরশিদ। এরপর থেকে মা ও সন্তানের আর কোনো খোঁজ নেননি তিনি।
হাফিজা জানান, খুরশিদের সঙ্গে বিয়ের পর তারা তার বাবার বাড়িতে সংসার শুরু করেন। সে সময় খুরশিদ পঞ্চগড়ে গ্লোব এগ্রো কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সেখান থেকে মাঝেমধ্যে তার কাছে আসতেন এবং দু-এক দিন থেকে আবার নিজের বাড়িতে ফিরে যেতেন। এভাবে প্রায় ছয় বছর তাদের সংসার চলে।
একপর্যায়ে খুরশিদ পঞ্চগড়ে আরেকটি বিয়ে করেন বলে জানতে পারেন হাফিজা। বিষয়টি জানার পর তিনি তার কর্মস্থলে গিয়ে অভিযোগ জানান। হাফিজার দাবি, ওই বিয়েকে কেন্দ্র করে খুরশিদসহ কয়েকজন চাকরি হারান।
তার ভাষ্য, দ্বিতীয় বিয়ের পরও তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় ছিল। এমনকি খুরশিদের দ্বিতীয় বিয়েও তিনি মেনে নিয়েছিলেন। এর মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন হাফিজা। গর্ভের সন্তানের কথা জানানোর পর খুরশিদ তাকে বারবার গর্ভপাতের জন্য চাপ দেন বলে অভিযোগ তার। তবে তিনি রাজি হননি। পরে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় মাতব্বরদের উপস্থিতিতে সালিশের মাধ্যমে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে।
২০০৪ সালের জানুয়ারিতে জন্ম হয় কামরুল ইসলাম অনিকের। হাফিজার অভিযোগ, জন্মের পর ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও খুরশিদ একবারের জন্যও ছেলেকে দেখতে আসেননি। নেননি তার কোনো খোঁজখবরও।
অনিককে বড় করতে হাফিজাকে নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে। কখনো পোশাক কারখানায়, কখনো হাসপাতালে নার্স হিসেবে কাজ করে ছেলের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। কিন্তু ছেলেকে বড় করার এই দীর্ঘ পথচলায় বাবার অনুপস্থিতি বারবার কষ্ট দিয়েছে অনিককে।
শৈশবের সেই বেদনার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনিক। তিনি বলেন, ‘যখন আমি বুঝতে শিখেছি, সবার বাবা স্কুলে এসে সন্তানদের টাকা দিচ্ছে, কিন্তু আমার বাবা...।’
কথা শেষ করতে না পেরে কেঁদে ফেলেন তিনি।
অনিক বলেন, ‘পরে মায়ের কাছে জেনেছি, তাদের মধ্যে সম্পর্ক নেই। ছোটবেলা থেকে মামার বাড়িতে মানুষ হয়েছি, মামাকেই বাবা ডেকেছি। এখন আমি বড় হয়েছি, বাবার পরিচয়টা লাগে। কোথাও গিয়ে পরিচয় দিতে পারি না।’
ছেলের ভবিষ্যৎ ও পরিচয়ের স্বীকৃতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হাফিজা খাতুনও। তিনি বলেন, ‘এত দিন নিজের পরিচয়ে ছেলেকে বড় করেছি। এখন ছেলের পিতৃপরিচয় দরকার। এ জন্য ২০২২ সালে সিরাজগঞ্জ আদালতে কামরুল ইসলাম অনিককে বাদী করে মামলা করেছি।’
হাফিজার অভিযোগ, মামলাটি তিন বছর ধরে চললেও এখনো তারা ন্যায়বিচার পাননি। মামলায় ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু বারবার শুনানির তারিখ নির্ধারিত হলেও পরীক্ষা সম্পন্ন হচ্ছে না বলে দাবি তার।
ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে তেলকুপি গ্রামের জিয়াউর রহমান, মনিজা খাতুনসহ স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলা হয়। তাদের দাবি, খুরশিদ জিন্নাহ ও হাফিজা খাতুনের বিয়ে হয়েছিল। হাফিজা আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকতেই তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। অনিকের জন্মের পরও খুরশিদ তার খোঁজ নেননি বলে জানান তারা।
অনিকের মামা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি নিজে কাজি ডেকে এনে কার্বনের সঙ্গে হাফিজার বিয়ে দিয়েছিলাম। বিয়ের দিন তার পরিবারকে ডেকে এনেছিলাম। তারা কৌশলে তাকে নিয়ে যায়। তার পরিবার বিয়ে মেনে নেয়নি।’
ভাগনের শৈশবের স্মৃতি তুলে ধরে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমার ভাগনের জন্য কষ্ট হয়। শিশু অবস্থায় সবাই যখন বাবা ডাকে, অনিক তখন তার বাবাকে পায়নি। আমার মেয়েরা আমাকে ডাকে, সেটা দেখে অনিকও আমাকে বাবা ডাকে। অনেকবার ধমক দিয়ে বলেছি, আমি তোমার মামা। কিন্তু সে এখনো আমাকে বাবা বলেই ডাকে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে খুরশিদ জিন্নাহ কার্বনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘যেটা আদালতে গড়িয়েছে, সেই সিদ্ধান্ত আদালতই দেবে। আমার সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই।’
বাবার পরিচয়ের স্বীকৃতি পেতে অনিক ও তার মায়ের আইনি লড়াই এখনো শেষ হয়নি। আদালতে দায়ের করা মামলার নিষ্পত্তি এবং ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে আছেন তারা। অনিকের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে একদিন তিনি নিজের পিতৃপরিচয়ের আইনি স্বীকৃতি পাবেন।