ঢাকা,  সোমবার   ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ পেশা ও জীবন ]
ভিন্ন চিন্তা

শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন বহুমাত্রিক গুণ বিচারে হওয়া উচিত

উর্মী রহমান সোনিয়া
প্রকাশিত: ১৩:১৬, ২ নভেম্বর ২০২৬
শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন বহুমাত্রিক গুণ বিচারে হওয়া উচিত
আমরা শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী চাই না, আমরা চাই আত্মবিশ্বাসী, মানবিক ও জীবনকে ভালোবাসতে জানা মানুষ। আমরা যদি একটি শিক্ষাবান্ধব ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে সাফল্যে অভিনন্দন জানানো হবে, আর ব্যর্থতায় পাশে দাঁড়ানো হবে

একজন শিক্ষক হিসেবে আজ কিছু কথা বলতে চাই... গতকাল এইচ এস সি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে এই পরীক্ষার ফলাফলকে কেন্দ্র করে আজ একটি মেয়ের আত্মহত্যার খবর আমাকে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছে। একজন শিক্ষক হিসেবে এই সংবাদ আমাকে শুধু শোকাহত করেনি, বরং আমাদের শিক্ষা, পরিবার এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

একটি মেয়ে পরীক্ষায় ফেল করেছে—এটাই কি তার জীবনের সব অর্জন, সব যোগ্যতা, সব সম্ভাবনার সমাপ্তি? তার কি আর কোনো স্বপ্ন ছিল না? তার কি জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর আর কোনো সুযোগ ছিল না?

আমরা শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল করতে বলি, জিপিএ-৫ পেতে উৎসাহিত করি, প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে শেখাই। কিন্তু আমরা কি তাদের শেখাই, ব্যর্থতাকেও কীভাবে গ্রহণ করতে হয়? প্রত্যাশা পূরণ না হলে কীভাবে নিজেকে সামলে নিতে হয়? জীবনের কঠিন সময়ে কীভাবে নতুন করে সাহস সঞ্চয় করতে হয়?

একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন শুধু তার পরীক্ষার খাতার নম্বর দিয়ে হওয়া উচিত নয়। একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রতিভা, সৃজনশীলতা, মানবিকতা, নৈতিকতা এবং ভবিষ্যতে নিজেকে গড়ে তোলার সম্ভাবনাও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

শিক্ষকতা আমার কাছে শুধু পাঠ্যবই পড়ানো কিংবা পরীক্ষার ফলাফল তৈরি করার পেশা নয়। শিক্ষকতা মানে একজন শিক্ষার্থীর মন বোঝার চেষ্টা করা, তার স্বপ্নকে সম্মান করা, তার হতাশার সময়ে পাশে দাঁড়ানো এবং ভুল করলে তাকে শুধরে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।

অভিভাবকদের কাছেও আমার বিনীত অনুরোধ, সন্তানের ফলাফলকে কখনো ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি বানাবেন না। অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করে তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেবেন না। আপনার সন্তান হয়তো পরীক্ষায় পিছিয়ে আছে, কিন্তু জীবনের অন্য কোনো ক্ষেত্রে সে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে।

সহকর্মী শিক্ষকদের প্রতিও আমার আহ্বান—শিক্ষার্থীদের শুধু ভালো ফলাফলের জন্য নয়, ভালো মানুষ হওয়ার জন্যও প্রস্তুত করি। তাদের মানসিক অবস্থার খোঁজ নিই। কোনো শিক্ষার্থী অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ হয়ে গেলে, হতাশায় ভুগলে কিংবা নিজেকে গুটিয়ে নিলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিই। প্রয়োজন হলে অভিভাবক ও পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যোগাযোগ করি।

আজকের এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, শিক্ষার পাশাপাশি জীবনের মূল্য বোঝানোও কতটা জরুরি।

আমি চাই, আমার কোনো শিক্ষার্থী যেন পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ার ভয়ে নিজের জীবনকে মূল্যহীন মনে না করে। তারা যেন জানে, ফলাফল যেমনই হোক, শিক্ষক হিসেবে তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা, মমত্ববোধ ও শুভকামনা অটুট থাকবে।

কারণ আমরা শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী চাই না, আমরা চাই আত্মবিশ্বাসী, মানবিক ও জীবনকে ভালোবাসতে জানা মানুষ।
আমরা যদি একটি শিক্ষাবান্ধব ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে সাফল্যে অভিনন্দন জানানো হবে, আর ব্যর্থতায় পাশে দাঁড়ানো হবে।

শিক্ষার্থীদের বলি—তোমাদের ফলাফল নয়, তোমরাই আমাদের কাছে মূল্যবান। জীবনকে ভালোবাসো, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। তোমাদের সামনে এখনো অনেক পথ, অনেক সম্ভাবনা, অনেক সুন্দর আগামী অপেক্ষা করছে।

একজন শিক্ষক হিসেবে এটাই আমার প্রত্যাশা, এটাই আমার দায়বদ্ধতা।

লেখক : উর্মী রহমান সোনিয়া
প্রভাষক, গার্হস্থ্য বিজ্ঞা, ডাঃ সাইফুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ, মহেশপুর, ঝিনাইদহ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!