ঢাকা,  বুধবার   ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

[ পেশা ও জীবন ]

জিপিএ-৫ নয়- সন্তানের ফলাফলে সন্তুষ্ট থাকা উচিত

জোবাইদুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১৩:১২, ৭ অক্টোবর ২০২৬
জিপিএ-৫ নয়- সন্তানের ফলাফলে সন্তুষ্ট থাকা উচিত
ফিনল্যান্ড বা জাপানের মতো দেশে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয় সৃজনশীলতা, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপর। আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে। কারণ, ভবিষ্যৎ সেই প্রজন্মের—যারা কেবল প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে না, বরং নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।

স্টিভ জবস, বিল গেটস, মার্ক জাকারবার্গ তাঁদের সাফল্যের পথ কোথায় জিপি-৫ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল? স্টিভ জবস কলেজও শেষ করেননি, অথচ তাঁর সৃষ্ট ‘এপেল’ আজ প্রযুক্তি বিপ্লবের প্রতীক। 

অন্যদিকে, আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন যাঁরা হয়তো জিপিএ-৫ পাননি, কিন্তু তাঁদের দক্ষতা, সততা ও উদ্ভাবনী চিন্তাধারায় কর্মক্ষেত্রে অর্জন করেছেন অসাধারণ সাফল্য।

জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতি অতিরিক্ত মোহ এমন একটি সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে শেখার চেয়ে গ্রেডই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। অভিভাবকরা সন্তানদের কোচিং সেন্টারে ঠেলে দিচ্ছেন। শিক্ষার্থী বাস্তবে কতটুকু শিখতে পারল তার চেয়ে অধিক নম্বর পাওয়া যেন মূখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরদিকে, শিক্ষার্থীরাও বোঝার পরিবর্তে মুখস্থবিদ্যার দিকে বেশি ধাবিত হচ্ছে। জ্ঞান অর্জন নয়, পরীক্ষায় নম্বর বেশি পাওয়াই যেন জীবনের মূল লক্ষ্য।

একটি পরীক্ষার ফল কখনোই একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবনকে নির্ধারণ করে না।  জীবনে এগিয়ে যেতে নম্বরের পাশাপাশি দরকার দক্ষতা, সৃজনশীলতা, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস ও ভালো মানুষ হওয়ার মানসিকতা।
আজ যে ফল আশানুরূপ হয়নি, আগামীকাল সে-ই হয়তো জীবনের বড় সাফল্য অর্জন করবে।  তাই সন্তানকে শুধু জিপিএ-৫-এর জন্য নয়—জীবনের জন্য প্রস্তুত করুন।

সাধারণত পরীক্ষার মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর মেধা যাচাই করা হয়। পরীক্ষার ফলাফল যদি ভালো হয় বা শিক্ষার্থী যদি তথাকথিত জিপিএ-৫ পায় তাহলে ধরে নেওয়া হয় সেই শিক্ষার্থী মেধাবী।

আর কোনো কারণে যদি কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ না পায় তাহলে মনে করা হয় যেই ছাত্র বা ছাত্রী মেধাবী নয়। কিন্তু জিপিএ-৫ নামক যে ভয় আমরা সন্তানদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছি, তা তাদের মানসিকতায় কতটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে সেটা কি কখনো ভেবেছি?

গত ১৫ বছরের (২০২৪ সাল পর্যন্ত) পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ার পেছনে প্রকৃত শিক্ষার মানোন্নয়নের চেয়ে অন্যান্য কারণই বেশি প্রভাব ফেলেছে। ২০০৯ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী। ২০১৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ হাজারেরও বেশি। এরপর আসে ২০২০, মহামারির বছর, সেবার কোনো পাবলিক পরীক্ষাও হয়নি। তবু আগের পরীক্ষার ফলাফল ও অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের ভিত্তিতে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজারে। পরবর্তী বছরগুলোতেও চলতে থাকে এই গ্রেড-স্ফীতি। ২০২১ সালে ১ লাখ ৮৯ হাজার এবং ২০২২ সালে ১ লাখ ৭৬ হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করে। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৭৮ হাজারে। কিন্তু ২০২৪ সালে আবার বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজারে পৌঁছায়।

এসএসসি ও সমমানের অথবা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় যারা জিপিএ-৫ পায়নি তারা হতাশ, তাদের পিতা-মাতার মুখ মলিন। কিন্তু কেন? এই জিপিএ-৫ পাওয়া মানেই কি সফলতা? জিপিএ-৫ পেলেই কি জীবনের সার্থকতা? কেন জিপিএ-৫ না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে?

  • সব প্রশ্নের উত্তরই জানার চেষ্টা করব। প্রথমে আসি যারা এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ না পেয়ে হতাশ হয়ে গেছে তাদের কথায়। একটি কথা মনে রাখা দরকার, তাহলো জিপিএ-৫ না পেলে হতাশার কোনো কারণ নেই।

আমরা এমন অনেক শিক্ষার্থীকে দেখব যারা বর্তমানে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ালেখা করছে কিন্তু তাদের এসএসসি পরীক্ষার ফলে জিপিএ-৫ ছিল না। তুমি এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওনি বলে হতাশ হয়ে যেও না; সামনের এইচএসসি পরীক্ষায় তুমি তোমার কাক্সিক্ষত জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য চেষ্টা করো, তোমার সামনে আরো সুযোগ আছে নিজেকে প্রমাণ করার।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘জিপিএ-৫’ যেন এক পৌরাণিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পত্রিকার প্রথম পাতায়, ব্যানার, পোস্টারে, সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায়—‘অমুক বোর্ডে সর্বোচ্চ জিপিএ-৫ প্রাপ্তির রেকর্ড’! অথচ এর আড়ালে থেকে যায় হাজারো কিশোর-কিশোরীর চাপ, দুশ্চিন্তা, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাস হারানোর গল্প।

যারা জিপিএ-৫ পায়নি তাদের পিতা-মাতার মুখটা মলিন। পাশের বাড়ির ছেলেটা, দু’বাড়ি পরে যে মেয়েটার বাড়ি সেও জিপিএ-৫ পেয়েছে তাদের মা-বাবা মিষ্টি পাঠিয়েছে এই দেখে নিজের সন্তানটা জিপিএ-৫ পায়নি বলে তাদের মুখটা মলিন হয়ে যায়। 

মনে রাখা দরকার, পিতা-মাতা যদি সন্তানের ফল নিয়ে খুশি থাকেন এবং তাদের ভবিষ্যতে আরো ভালো ফল করার জন্য উৎসাহ দেন তবেই সন্তানরা ভবিষ্যতে ভালো কিছু করতে পারবে। জিপিএ-৫ না পাওয়ায় পিতা-মাতার মলিন মুখ তাদের আরো বেশি হতাশাগ্রস্ত করে। সুতরাং পিতা-মাতার উচিত হবে সন্তানের ফলে সন্তুষ্ট থাকা।

জিপিএ-৫ পাওয়া মানেই কি সফলতা? আমাদের দেশে প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হচ্ছে। এরপর তারা উচ্চশিক্ষার জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অসংখ্য জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় পাসও করতে পারছে না অথচ এমন অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাচ্ছে যারা জিপিএ-৫ পায়নি। তাই জিপিএ-৫ পাওয়া মানেই যে সে জীবনে সফল হয়ে যাবে বিষয়টা এমন নয়।

সঠিক পন্থায় চেষ্টা চালিয়ে গেলে, জীবনে সৎ ও আদর্শবান হিসেবে গড়ে উঠতে পারলে যে কেউ জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারবে। তাই আমাদের শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকদের মনে রাখা দরকার যে, জিপিএ-৫ মানেই সফলতা নয়। 

ফিনল্যান্ড বা জাপানের মতো দেশে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয় সৃজনশীলতা, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপর। আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে। কারণ, ভবিষ্যৎ সেই প্রজন্মের—যারা কেবল প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে না, বরং নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।

লেখক : শিক্ষার্থী,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!