ঢাকা,  মঙ্গলবার   ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

[ রাজধানী ]

আগুন নিয়ন্ত্রণে, তবু সর্বস্ব হারানোর আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৫২, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
আগুন নিয়ন্ত্রণে, তবু সর্বস্ব হারানোর আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা
সংগৃহীত ছবি

রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের ছোট কাটারা গলিতে মনসুর খান প্লাজায় ভয়াবহ আগুনে পুড়ে গেছে ভবনটির ছয়তলায় থাকা দোকান ও গোডাউনের মালামাল। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত হতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা।

কেউ গোডাউনে রাখা প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন, আবার কেউ কোটি কোটি টাকার মালামাল পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। এর পাশাপাশি নিরাপত্তার কারণে আশপাশের ভবনগুলোর দোকান বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালেও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন অবস্থায় অপেক্ষা করতে দেখা যায়। গোডাউনে থাকা মালামালের কী পরিণতি হয়েছে, তা জানতে উৎকণ্ঠায় সময় কাটছে তাঁদের। অনেকের আশঙ্কা, আগুনে শেষ হয়ে গেছে তাঁদের সারা জীবনের সঞ্চয় ও ব্যবসার পুঁজি।

৪০ লাখ টাকার ব্যাগ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রবিন

গোডাউন মালিক মো. রবিন জানান, সাততলা ভবনটির পাঁচ, ছয় ও সাততলায় কসমেটিকস পণ্য ও ব্যাগের গোডাউন রয়েছে। তাঁদের গোডাউন ছয়তলার ডান পাশে। আগুনও ওই তলায় লেগেছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের গোডাউনে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ ছিল। এখনো ভেতরে যেতে পারছি না। সব মালামাল পুড়ে গেলে আমি সর্বস্বান্ত হয়ে যাব।’

রবিনের ভাষ্য, ভবনটির পাঁচতলা থেকে সাততলা পর্যন্ত ৫০টির বেশি গোডাউন রয়েছে। প্রতিটি গোডাউনে ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকার মালামাল রাখা ছিল। নিচের তলাগুলোতে রয়েছে ব্যাগ ও কসমেটিকসের দোকান।

আগুন লাগার খবর পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, গতকাল বিকেল ৫টার দিকে নিচের একটি দোকানের কর্মচারীর কাছ থেকে আগুন লাগার খবর পান। পাঁচ ও ছয়তলায় গোডাউন থাকায় সেখানে সাধারণত কেউ থাকেন না। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা মালামাল নিতে সেখানে যান। আগুন লাগার পর থেকে তাঁরা আর ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি।

ফায়ার সার্ভিসের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ

ভবনটির নিচতলায় ব্যাগের দোকান রয়েছে মো. ইমতিয়াজের। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সোমবার বিকেল ৫টায় আগুন লাগলেও মঙ্গলবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ধোঁয়া বের হচ্ছিল। এত দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।

ইমতিয়াজ বলেন, ‘আমাদের এমন অবস্থা হয়েছে, সকালে মালিক, বিকেলে ফকির। এই ভবনে কোটি কোটি টাকার মালামাল রয়েছে। আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানাই, উন্নত বিশ্বের মতো দ্রুত আগুন নেভানোর উপযোগী সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হোক।’

আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দেরি হওয়ার জন্য ফায়ার সার্ভিসের গাফিলতিকে দায়ী করে অভিযোগও করেন তিনি। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

কোটি টাকার মালামাল নিয়ে অনিশ্চয়তা

ভবনের অন্যান্য গোডাউনের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় তাঁরা এখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারেননি। গোডাউনে রাখা মালামালের কতটুকু রক্ষা পেয়েছে, তা জানার অপেক্ষায় রয়েছেন সবাই। দীর্ঘ সময় ধরে ছয় ও সাততলায় আগুন জ্বলতে থাকায় কোটি কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তার স্বার্থে ছোট কাটারা গলির আশপাশের আরও ১০ থেকে ১৫টি ভবন বন্ধ করে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব ভবনে কসমেটিকসসহ বিভিন্ন পণ্যের অসংখ্য দোকান রয়েছে। দোকান বন্ধ থাকায় ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

আগুন লাগা ভবনের পাশের একটি ভবনে কসমেটিকসের দোকান রয়েছে মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের। তিনি বলেন, সোমবার বিকেল থেকে তাঁদের দোকান বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ব্যবসা বন্ধ থাকায় তাঁরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে দোকান খোলার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

‘ভেতরে আগুন জ্বলছে, ধোঁয়া বের হচ্ছে’

মনসুর খান প্লাজার দারোয়ান মো. মজিবুল্লাহ বলেন, সোমবার বিকেল ৫টার দিকে আগুন লাগে। তাঁর অভিযোগ, ভবনের ভেতরে পানি দেওয়ার পরও আগুন জ্বলছিল এবং ধোঁয়া বের হচ্ছিল।

১০ ইউনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে মনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগার খবর পায় সংস্থাটি। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট। মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

ফায়ার সার্ভিস সদরদপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ১০টি ইউনিট কাজ করেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, আগুনে মার্কেটটির ছয়তলায় থাকা সব মালামাল পুড়ে গেছে। আগুন নেভানোর সময় তীব্র ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন ফায়ার সার্ভিসের দুই কর্মী।

সরু রাস্তা ও ভবনের কাঠামোগত জটিলতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে বলেও জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা কাটেনি। গোডাউনের দরজা খুলে ভেতরের অবস্থা দেখার আগপর্যন্ত তাঁদের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব হচ্ছে না। কয়েক দশকের ব্যবসার পুঁজি থেকে শুরু করে পরিবারের জীবিকার অবলম্বন—সবকিছু হারানোর আশঙ্কায় অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁদের।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!