ঢাকা,  শুক্রবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]
পর্ব-৩

সূরা বাকারা: ৮৪-১০২ নম্বর আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট

মাওলানা ওমর ফারুক
প্রকাশিত: ১৪:৪০, ৩ ডিসেম্বর ২০১৯
সূরা বাকারা: ৮৪-১০২ নম্বর আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট
ফাইল ফটো

আমরা এখানে সূরা বাকারার ৮৪-১০২ নম্বর আয়াতসমূহের উল্লেখযোগ্য শানে নুযুল (আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট) তুলে ধরছি-

আরো পড়ুন>>> সূরা বাকারা: ২৬-৭৯ নম্বর আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট পর্ব-২

وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ لاَ تَسْفِكُونَ دِمَاءَكُمْ وَلاَ تُخْرِجُونَ أَنفُسَكُم
অর্থ : যখন আমি তোমাদের থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা পরস্পর খুনাখুনি করবে না এবং লোকদের দেশ থেকে বহিষ্কার করবে না, তখন তোমরা তা স্বীকার করেছিলে এবং তোমরা তার সাক্ষ্য দিচ্ছিলে। (আয়াত: ৮৪)।

Advertisement

শানে নুযুল : (১) পরস্পর খুনাখুনি করবে না। (২) কেউ কাউকে বহিষ্কার করবে না। (৩) নিজেদের মধ্যে কেউ বন্দি হলে তাকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনবে। 

এই তিনটি নির্দেশের মধ্যে প্রথম দু’টি তারা লঙ্ঘন করত। কিন্তু তৃতীয়টি মানার ব্যাপারে তারা ছিল তৎপর। ঘটনাটির মূল বিবরণ হলো এই, মদিনাতে দু’টি আনসার গোত্র বাস করত। আউস এবং খাজরাজ। আউস এবং খাজরাজের মাঝে দ্বন্দ লেগেই থাকত। কখনো এ দ্বন্দ যুদ্ধের পর্যায়ে চলে যেত। পাশাপাশি সেখানে দু’টি ইহুদি গোত্র বাস করত। বনী কুরাইজা ও বনী নজীর। বনী কুরাইজা ছিল আউস এর বন্ধু এবং বনী নজীর ছিল খাজরাজেব বন্ধু। ফলে আউস এবং খাজরাজের লড়াই যখন শুরু হত তখন বনী কুরাইজা বনু নজীর তাদের বন্ধুদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহন করত। তাতে আউস এবং খাজরাজের লোক যেমন মারা যেত তেমনি বনী কুরাইজা ও বনী নজীর লোকও মারা যেত। একে অপরকে দেশান্তর করত কিন্তু তাদের একটি আচরণ ছিল অদ্ভূত। যখন তাদের কেউ প্রতিপক্ষের হাতে বন্দী হত তখন মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনত। তাদের এহেন দৃষ্টান্ত পূর্ণ আচরণ এর জবাবে আল্লাহ পাক এই আয়াতগুলো নাজিল করেন। আর তাদেরকে যখন জিজ্ঞাসা করা হত আপনারা বন্দীদের মুক্তিপন দিয়ে ছাড়িয়ে আনেন কেন? তখন তারা বলে এটা আল্লাহর নির্দেশ। তাহলে যুদ্ধ করেন কেন? আমাদের মিত্ররা হেরে যাবে এই লজ্জায়।

وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِّنْ عِندِ اللهِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَهُمْ وَكَانُواْ مِن قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُواْ فَلَمَّا جَاءَهُم مَّا عَرَفُواْ كَفَرُواْ بِهِ فَلَعْنَةُ اللَّه عَلَى الْكَافِرِينَ.
অর্থ : যখন তাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই কিতাব আসল, (অর্থাৎ কোরআন) যা তাদের (তাওরাত) সত্যায়ন করেছে। পূর্ব থেকে যা তাদের নিকট সংরক্ষিত রয়েছে। (তখন তারা কী করল) তারা নিজেরা পূর্ব থেকে কাফেরদের (মূর্তি পূজারীদের) মোকাবিলায় (এই কিতাবের সাহায্যে) বিজয় প্রার্থনা করত। কিন্তু যখন তা তাদের নিকট আসল যা তাদের জানা ছিল তা তারা একে অস্বীকার করল। সুতরাং আল্লাহর লানত এমন কাফেরদের ওপর। (আয়াত: ৮৯)।

শানে নুযুল : হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, খায়বারের ইহুদিরা গাতফান সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুদ্ধ করত। যখনই এ উভয়দল সমরযুদ্ধ মুখোমুখি হত ইহুদিরা পরাজয় বরণ করত। তাই ইহুদিরা দোয়া করত যে, হে আল্লাহ! আমরা তোমার কাছে সেই উম্মি নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর সততার উসিলায় আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যার ব্যাপারে তুমি আমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছ যে, তাকে আমাদের জন্য শেষ জামানায় প্রেরণ করবে এখন তাদের বিরুদ্ধে আমাদের কেন সাহায্য করছ না! অত:পর তারা যখনই মুখোমুথি হত তখন এ দোয়া করত। ফলে তারা গাতফান সম্প্রদায়কে পরাজিত করত। কিন্তু যখন মুহাম্মাদ (সা.) প্রেরিত হলেন তখন তারা তাঁকে অস্বীকার করে বসে। এরই প্রেক্ষিতে وكانوا من قبل يستفتجون علي اللذين كفروا

শানে নুযূল: তখনো পর্যন্ত রাসূল (সা.) পৃথিবীতে আগমন করেননি। ইহুদিরা রাসূল (সা.)-কে অসিলা বানিয়ে আল্লাহর কাছে বিজয় কামনা করত। কিন্তু যখন আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সা.)-কে আরব ভূখণ্ডে প্রেরণ করেন, তখন ইহুদিরা রাসূল (সা.)-কে এবং তাঁর সম্বন্ধে যা বলত সে কথাকেও অস্বীকার করে। তাই হজরত মুআজ ইবনে জাবাল, বিণর ইবনে বারা এবং দাউদ ইবনে সালামা (রা.) তাদেরকে বললেন, হে ইহুদি সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, মুসলমান হয়ে যাও। (কারণ) তোমারা তো ইতোপূর্বে মুহাম্মাদ (সা.) এর উসিলায় আমাদের বিজয় কামনা করতে। আর তখন আমরা মুশরিক ছিলাম। তখন তো তোমরা আমাদেরকে তার পদার্পণের সংবাদ দিতে। তার গুণাবলী বলে বেড়াতে! তখন বনী নাযীর গোত্রের এক লোক বলল, আমাদের কাছে এমন কিছু আসে নাই যা আমরা জানি এবং আমরা যার ব্যাপার বলতাম তিনি এ ব্যক্তি নন। অত:পর আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত নাজিল করেন। (লুবাবুন নুকুল ও আসবাবুন নুযুল)।

وَلَن يَتَمَنَّوْهُ أَبَدًا بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ وَاللهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمينَ.
অর্থ : আর (আমরা বলছি) কস্মিনকালেও তারা মৃত্যু কামনা করবে না। তারা তাদের যেসব কৃতকর্ম আগে পাঠিয়েছে, সে সবের কারণে কস্মিনকালেও এমন আকাক্সক্ষা তারা পোষণ করবে না। আল্লাহ জালেমদের ব্যাপারে সম্যক অবগত। (আয়াত-৯৫)।

শানে নুযূল : পূর্ববর্তী আয়াত নাাজল হবার পর রাসূল (সা.) ইহুদিদের লক্ষ্য করেন বললেন যে, তোমাদের (ইহুদি ও নাসারাদের) জন্য জান্নাত নির্ধারিত তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাক, তাহলে তোমরা আল্লাহর নিকট এভাবে প্রার্থনা করবে হে আল্লাহ! যার হাতে আমার প্রাণ-তুমি আমাদের মৃত্যু দান কর। তোমাদের থেকে কেউই এ প্রার্থনা করবে না; বরং একজন  তাকে থুথু দেয় ফলে সে মৃত্যু বরণ করে। ফলে তারা এমনভাবে প্রার্থনা করতে অপছন্দ ও অস্বীকার করল। তখন সে পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য আয়াত নাজিল হয়। (দুররুল মানছুর ৯৮/১)

قُلْ مَن كَانَ عَدُوًّا لِّجِبْرِيلَ فَإِنَّهُ نَزَّلَهُ عَلَى قَلْبِكَ بِإِذْنِ اللهِ مُصَدِّقاً
অর্থ : হে নবী আপনি বলে দিন, যে কেউ জিবরাইলের শত্রু হয় যেহেতু তিনি আল্লাহর আদেশে এ কালাম আপনার অন্তরে নাজিল করেছেন যা সত্যায়নকারী তাদের সম্মুখস্থ কালামের এবং মুমিনদের জন্য পথ প্রদর্শক ও সুসংবাদদাতা। (আয়াত-৯৭)।

শানে নুযুল: একবার ইবনে সুরিয়া নামক একজন ইহুদী পাদ্রি হুজুর (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার কাছে ওহী নিয়ে আসে কে? রাসূল (সা.) বলেন, হজরত জিবরাইল (আ.)। এর পর সুরিয়া বলল, জিবরাইল আমাদের দুশমন সে আজাব নিয়ে আসে। যদি মিকাঈল (আ.) ওহী নিয়ে আসতেন তাহলে অবশ্যই আমরা আপনার ওপর ঈমান আনতাম। কেননা সে শান্তি নিয়ে আসে।

وَلَقَدْ أَنزَلْنَآ إِلَيْكَ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ وَمَا يَكْفُرُ بِهَا إِلاَّ الْفَاسِقُونَ
অর্থ : আমি আপনার প্রতি উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ অবতীর্ণ করেছি। অবাধ্যরা ব্যতীত কেউ এগুলো অস্বীকার করে না। (আয়াত-৯৯)।

শানে নুযুল : একবার ইবনে সুরিয়া হুজুর (সা.)-কে বলল, আপনি তো আমাদের সামনে নবুওয়াতের কোনো প্রমাণ আনেননি। তখন আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত নাজিল করেন।

وَلَمَّا جَاءَهُمْ رَسُولٌ مِّنْ عِندِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَهُمْ نَبَذَ فَرِيقٌ مِّنَ الَّذِينَ أُوتُواْ الْكِتَابَ كِتَابَ اللَّهِ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ كَأَنَّهُمْ لاَ يَعْلَمُونَ.
অর্থ : যখন তাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রাসূল আসল, যিনি সেই (তাওরাতের) সত্যায়ন করছিল যা এদের কাছে রক্ষিত আছে, তখন আহলে কিতাবের একটি চক্র আল্লাহর কিতাব (তাওরাত ও ইঞ্জিল)-কে এভাবে লুকাল যে এ সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। (আখেরি নবী (সা.) সম্পর্কে যে নির্দেশনা ও ভবিষ্যতবাণী ছিল তা তারা গোপন করে রাখল)। (আয়াত-১০১)।

শানে নুযূল : তাওরাত ও ইনজীলে নবী করিম (সা.) এর আগমনের পর ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের নবীজির ওপর ঈমান আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূল (সা) ইহুদি সর্দার মালেক ইবনে সায়েফকে তাওরাতের সেই প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করে দেন। তখন সে শপথ করে অস্বীকার করে, আর বলে, মুহাম্মাদ (সা.) সম্পর্কে আমাদের নিকট হতে কোনো ওয়াদা নেয়া হয়নি। তখন উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়।

وَاتَّبَعُواْ مَا تَتْلُواْ الشَّيَاطِينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَانَ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَكِنَّ الشَّيْاطِينَ كَفَرُواْ يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَا أُنزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولاَ إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلاَ تَكْفُرْ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ وَمَا هُم بِضَآرِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلاَّ بِإِذْنِ اللَّهِ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلاَ يَنفَعُهُمْ وَلَقَدْ عَلِمُواْ لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الآخِرَةِ مِنْ خَلاَقٍ وَلَبِئْسَ مَا شَرَوْاْ بِهِ أَنفُسَهُمْ لَوْ كَانُواْ يَعْلَمُونَ .
অর্থ : আর এই বনি ইসরাইল (সেই মন্ত্রর) অনুগামী হলো যা (সোলায়মান আ.) এর বাদশাহীর সময় শয়তান পাঠ করত। (সোলায়মান আ.) কোনো কুফর করেনি। বরং শয়তান মানুষকে যাদু শিক্ষা দিয়ে কুফরীর অনুগামী করেছিল। বরং (এই বনি ইসরাইল) সেই বিষয়ের অনুগামী হলো যা বাবেল শহরে হারুত-মারুত নামক দু’জন ফেরেশতার ওপর নাজিল করা হয়েছিল। এ ফেরেশতাদ্বয় কাউকে তখন পর্যন্ত কিছু শেখাত না যখন পর্যন্ত তাদের কাছে এ অঙ্গীকার ঘোষণা না করত; আমরা শুধু পরীক্ষার জন্য প্রেরিত হয়েছি। তোমরা (যাদুর অনুগামী হয়ে) কুফর গ্রহণ করো না। তারপরও এই লোকেরা সেসব শিখতে লাগল যা দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করত। (একথা স্পষ্ট) তারা এসবের মাধ্যমে কাউকে আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম হত না। কিন্তু তারা এমন সব মন্ত্র শিখত যা তাদের ক্ষতিসাধন করত এবং তাদের কোনো উপকারে আসত না। তারা একথা খুব ভালো করে জানত, যে লোক এসব বিষয় অর্জন করবে (চর্চা করবে) আখেরাতে তার কোনো অংশ থাকবে না। মূলত এসব ছিলো খুবই খারাপ বিষয়। যার বিনিময়ে তারা তাদের জীবন বিক্রি করে দিয়েছে। হায়! এসব বিষয়ের রহস্য তারা যদি জানত। (আয়াত-১০২)।

শানে নুযুল: আবু হাতেম বলেন, আসেফ ছিলেন সুলাইমান (আ.) এর কেরানী। তিনি ইসমে আজম জানতেন। তিনি সব কিছুই সুলায়মান (আ) এর আদেশক্রমে লিখতেন। আর তা সুলায়মান (আ) এর সিংহাসনের নিচে পুঁতে রাখতেন। পরবর্তীতে সুলায়মান (আ.) যখন ইন্তেকাল করলেন, তখন শয়তানরা তা বের করে প্রতি দু’লাইনের ফাঁকে ফাঁকে জাদু ও কুফুরী বাক্য লিখে রাখে। আর তারা বলতে লাগল যে, সুলায়মান যা আমল করতেন তাহলো এগুলো। তখন অজ্ঞ ও মূর্খ মানুষেরা তাকে কুফুরির অভিযোগে অভিযুক্ত করে এবং তাকে ভর্ৎসনাও করে। সে সঙ্গে তাদের ওলামারাও একসঙ্গে তাল মিলায়। সুতরাং অজ্ঞ ইহুদিরা সুলাইমান (আ)-কে ভর্ৎসনা করতে থাকে। তাদের অপকৌশলের পরিপ্রেক্ষিতে শয়তানের  চক্রান্ত এবং সুলায়মান (আ) এর নিষ্কুলতা লোক সমাজে বর্ণনা করার পক্ষে আল্লাহ তায়ালা আলোচ্যে আয়াত নাজিল করেন।
চলবে...

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!