সঠিক-ভুল দ্বন্দ্বে এপ্রিল ফুল

ঢাকা, বুধবার   ২৭ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৩ ১৪২৭,   ০৩ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

সঠিক-ভুল দ্বন্দ্বে এপ্রিল ফুল

 প্রকাশিত: ১৬:১১ ১ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৬:৫০ ১ এপ্রিল ২০২০

তরুণ লেখক রনি রেজা। ছাত্রজীবনে দেশের প্রথম সারির দৈনিকগুলোতে লিখতেন ফিচার, প্রবন্ধ, গল্প ও কবিতা। সে থেকেই যোগাযোগ গণমাধ্যমের সঙ্গে। একসময় এই সাহিত্যের গলি বেয়েই ঢুকে পড়েন সাংবাদিকতায়। বর্তমানে ডেইলি বাংলাদেশ-এ কর্মরত। পাশাপাশি অব্যহত রেখেছেন দৈনিক পত্রিকাগুলোয় লেখালেখি। প্রকাশিত গ্রন্থ- গল্পগ্রন্থ ‘এলিয়েনের সঙ্গে আড্ডা’ (২০১৯), শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ ‘পাখিবন্ধু’ (২০২০)। স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ‌‌‘বেহুলাবাংলা বেস্ট সেলার সম্মাননা-২০১৯’।

বাঙালি জন্মগতভাবেই উৎসবপ্রেমী। যে কোনো উৎসব ধর্ম, বর্ণ, জাতি ভেদাভেদ ভুলে পালন করতে বাঙালি এক উজ্জল দৃষ্টান্ত। স্বভাবতই সামনে কোনো উৎসব পেলে মেতে ওঠে মহানন্দে। আড়ম্বরে পালন করে বুঝে কিংবা না বুঝে। আবার অনেকে এতে দ্বন্দ্ব খোঁজে। 

অন্যান্য সব দিবসের মত এপ্রিল ফুলও এর এই সমীকরণের বাইরে নয়। আছে হাস্য-কৌতুকে বা একে অপরকে বোকা বানিয়ে আনন্দ খোঁজার মানুষের অভাব হয় না দিনটিতে। আবার উল্টো কথাও বলতে শোনা যায়। সবই প্রচলিত। ইতিহাস কী বলে? খরার শেষে কৃষি মৌসুম শুরুর উদযাপন আর বসন্তের উৎসব, নাকি নববর্ষ পালনের দিন ভুলে যাওয়ায় তামাশার পাত্র বনে যাওয়া? নানান সংস্কৃতিতে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্য থেকে পালন করা হলেও এপ্রিল মাসের প্রথম দিন বা বছরের এ সময়টিকে বিশেষভাবে উদযাপনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। অন্যান্য সংস্কৃতির মত এটির জন্ম পাশ্চাত্যে। পরে ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ইংরেজি বর্ষের একটি মাস (April) এপ্রিল এবং ইংরেজি (Fool) শব্দের অর্থ বোকা। অতএব, শাব্দিক অর্থে দাঁড়ায়, এপ্রিলের বোকা। ১ এপ্রিল কাউকে বোকা বানানোর মধ্য দিয়ে এ দিবসটি পালন করা হয়। তবে এ দিবসটি নিয়ে বিভিন্ন জনের রয়েছে বিভিন্ন মত। এরমধ্যে আসল কোনটি সেটি নিয়েই রয়েছে অনেকের মধ্যে ধোঁয়াশা। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এপ্রিল ফুল সম্পর্কে যে তথ্যগুলো পাওয়া যায় তার মধ্যে বেশি আলোচিত হচ্ছে ‘১৪৯২ সালের ১ এপ্রিল দুর্ভাগ্য তাড়িত গ্রানাডাবাসী অসহায় নারী ও মাসুম বাচ্চাদের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে খ্রীষ্টানদের আশ্বাসে বিশ্বাস করে খুলে দেয় শহরের প্রধান ফটক। সবাইকে নিয়ে আশ্রয় নেয় আল্লাহর ঘর মসজিদে। শহরে প্রবেশ করে খ্রীষ্টান বাহিনী মুসলমানদের মসজিদের ভেতর আটকে রেখে প্রতিটি মসজিদে তালা লাগিয়ে দেয়। এরপর একযোগে শহরের সমস্ত মসজিদে আগুন লাগিয়ে বর্বর উল্লাসে মেতে ওঠে হায়েনারা। লাখ লাখ নারী-পুরুষ-শিশু অসহায় আর্তনাদ করতে করতে জীবন্ত দগ্ধ হয়। মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারায় মসজিদের ভেতর।

প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখায় দগ্ধ অসহায় মুসলমানদের আর্তচিৎকার যখন গ্রানাডার আকাশ-বাতাস ভারি ও শোকাতুর করে তুলল তখন রাণী ইসাবেলা হেসে বলতে লাগলো, ‘হায় এপ্রিলের বোকা! শত্রুর আশ্বাস কেউ বিশ্বাস করে?’ সেই থেকে খ্রীষ্টান জগৎ প্রতি বছর ১ এপ্রিল আড়ম্বরের সঙ্গে পালন করে আসছে- ‘April Fool’ মানে এপ্রিলের  বোকা উৎসব। এছাড়া আরো যে তথ্যগুলো পাওয়া যায় তা হলো- প্রাচীনকালে জনপ্রিয় উৎসবসমূহ পালিত হত বসন্তকালীন বিষুব সময়ে (vernal equinox), অর্থাৎ যে সময়ে দিনরাত মোটামুটি সমান থাকে। সময়টি হলো ২১ মার্চ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ঋতু পরিবর্তনের প্রান্তিক সময় ২৫ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল (অর্থাৎ শীতের শেষে বা বসন্তের শুরুতে) পুরাতন জুলিয়ীও (Julian) ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পুরো ইউরোপে সপ্তাহব্যাপী উৎসব উদ্দীপনা চলতো। এর বাইরে মধ্যযুগে মার্চের ২৫ তারিখে মহাসমারোহে নবান্ন উৎসব পালিত হতো সারা ইউরোপ জুড়ে। রোমানদের মতো হিন্দুরাও নতুন বছরের শুরু এপ্রিলের ১ অথবা এর আশেপাশে একদিন পঞ্জিকানুযায়ী পালন করতো। আঠার শতকে এপ্রিল ফুল বর্তমান অবয়ব ধারণ করার আগ পর্যন্ত গ্রেট বৃটেনে সাধারণ মানুষদের ঐতিহ্যবাহী মেলা বসতো প্রতি বছরের পহেলা এপ্রিলে । স্কটল্যান্ডে এই দিনটিকে বলা হতো ‘কোকিল শিকারের দিন (hunting the gowk or cuckoo)’। এপ্রিল ফুল নতুন রূপে জন্মলাভের পর এর নামকরণ করা হয় এপ্রিল-কোকিল (April-gowks)। পুরাতন কাহিনীর সঙ্গে এই দিনের যোগসূত্র স্থাপন করতে গিয়ে ১৪০০ খ্রীষ্টাব্দের চোসার (Chaucer)-এর The Nun’s Priest’s Tale গল্পের দুই বোকার ৩২ দিনের কাহিনী (Thirty days and two) চলে আসে। আর ৩২ দিনের শুরুটি হলো মার্চের ১ তারিখ, অর্থাৎ শেষ দিনটি কিনা ১ এপ্রিল।

ইউরোপে সম্ভবত এপ্রিল ফুলের বিস্তৃতি ঘটে প্রথমে ফ্রেঞ্চ জাতির মধ্যে। ফ্রেঞ্চরা ১৫০৮ সাল এবং ডাচরা ১৫৩৯ সাল থেকে এপ্রিল মাসের প্রথম দিনকে কৌতুকের দিন বা বছরের সবচেয়ে হালকা দিন হিসেবে পালন করা শুরু করে। ফ্রান্সই হলো প্রথম দেশ যে দেশে সরকারিভাবে নবম চার্লস (Charles IX) ১৫৬৪ সালে এক ফরমানের মাধ্যমে ১ জানুয়ারিকে নববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি এটি করেন ১৫৮২ সঙ্গে ইতালীয়ান পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী (Pope Gregory XII) প্রবর্তিত গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার (যেটিকে আমরা বর্তমানে ইংলিশ ক্যালেন্ডার হিসেবে জানি) হিসেবে প্রচলন হওয়ারও আগে। এরই সঙ্গে ১ এপ্রিলে বন্ধু-বান্ধবদের উপহার দেয়া নেয়ার প্রথাটি বদল হয়ে চলে যায় ১ জানুয়ারি বা নিউ ইয়ার উদযাপনের প্রাক্কালে। কারণ তখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে জুলিয়ীও ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নিউ ইয়ার পালিত হতো ১ এপ্রিলে। অনেকেই এই পরিবর্তনকে মেনে নিতে না পেরে এদিনই অর্থাৎ ১ এপ্রিলেই তাদের পুরোনো প্রথাসমূহ চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু বিপরীত ১ জানুয়ারির পক্ষের লোকজন এদেরকে ফাঁকি দিতে ১ এপ্রিলে ভুয়া উপহার পাঠানোর কালচারটি চালু করে দেয়।

ফ্রান্সে কাউকে বোকা বানালে বলা হত এপ্রিল মাছ (April fish), ফ্রেঞ্চ ভাষায় poisson d’avril। এরকম অদ্ভুত নামকরণের ব্যাখায় বলা হয়, রাশিচক্র অনুযায়ী স্বর্গের কাল্পিক রেখা অতিক্রম করাকালে এপ্রিলে সূর্যকে মাছের মত দেখায়। এইদিনে তারা ছুটি কাটাত এবং মরা মাছ এনে তাদের বন্ধুদের পেছনে সেটে দিয়ে মজা করত। এখন মরা মাছের বদলে ছোটরা আসল মাছের স্টিকি কাগজ বন্ধুদের শার্টের পেছনে গেঁথে দেয়। ক্যান্ডি শপ ও বেকারিগুলোও মাছ আকৃতির মিষ্টি পরিবেশন করে এইদিন স্মরণ করে।

ডাচদের পহেলা এপ্রিল পালন করার আরো কিছু কারণ আছে। স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ (King Philip II) ১৫৭২ সালে নেদারল্যান্ড শাসন করতেন। যারা তার শাসন অমান্য করেছিল তারা নিজেদেরকে গুইয়েন (ডাচে Geyuen ও ফ্রেঞ্চে guexu বলা হয়, যার অর্থ ভিখারি) বলে পরিচয় দিত । ১৫৭২ সালের এপ্রিলের ১ তারিখে গুইযেন বা বিদ্রোহীরা উপকূলীয় ছোট শহর ডেন ব্রিয়েল (Den Briel) করায়ত্ব করে ফেলে। তাদের এই সফলতায় বিদ্রোহের দাবানল দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। শেষমেষ স্প্যানিশ সেনাপ্রধান বা দ্যা ডিউক অব অ্যালবা (the Duke of Alba) প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হন। ‘ব্রিয়েল’ হল ডাচ শব্দ, যার অর্থ কাঁচ। ১৯৭২ সালের ১ এপ্রিল স্মরণে ডাচরা বিদ্রুপ করে স্প্যানিশদের ‘অ্যালবা কাঁচ হারিয়েছে (Alba lost glasses)’ বলে পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করে থাকে। উল্লেখ্য, অ্যালবা হল স্পেনের শহরের নাম যেখানে দ্যা ডিউক অব অ্যালবার সদর দফতর ছিল।

এপ্রিল ফুলের আরেকটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রফেসর জোসেফ বসকিন (Joseph Boskin)। তিনি বলেছেন, এই প্রথাটির শুরু হয় রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের (২৮৮-৩৩৭ খ্রীঃ) শাসনামলে। হাসি-ঠাট্টা নিয়ে মেতে থাকে এমন একদল বোঁকা গোপাল ভাঁড়েরা সম্রাটকে কৌতুক করে বলে, তারা রাজার চেয়ে ভালোভাবে দেশ চালাতে পারবে। রাজা মহোদয় বেশ পুলকিত হলেন। রাজা গোপাল ভাঁড়দের সর্দার কুগেল (Kugel)কে একদিনের জন্য বাদশাহ বানিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন। আর কুগেল সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে রাজ্যময় আইন জারি করে দিল, প্রতি বছরের এইদিনে সবাই মিলে তামাশা করবে। প্রফেসর বসকিন আরো বলেন, প্রাচীন ওই সময়ের মারাত্মক দিনগুলোতে রাজাদের দরবারে কিন্তু বোকারুপীরাই ছিল প্রকৃত জ্ঞানী। তারা মজা বা হাঁসি-ঠাট্টার মাধ্যমে অনেক কাজ কৌঁশলে হাসিল করে নিত বা জ্ঞানের কথা রসালোভাবে চারদিকে ছড়িয়ে দিত।

১৯৮৩ সালে বার্তা সংস্থা এপি পরিবেশিত বসকিনের এই ব্যাখ্যাটি অনেক কাগজে নিবন্ধাকারে প্রকাশিত হয়। বসকিন মূলত আগের সব ব্যাখ্যাকে উড়িয়ে দিয়েছেন। আর্টিকেলটি ছাপানোর আগে এপি দুই সপ্তাহ ধরে ভেবেছে তারা নিজেরাই এপ্রিল ফুল বোকামির শিকার হচ্ছে না তো!

পাশ্চাত্যের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে কাউকে বিভিন্নভাবে বোকা বানানোর প্রথা চালু রয়েছে। রোমানদের হিলারিয়া (Hilaria) উৎসব এর মধ্যে অন্যতম। তারা মার্চের ২৫ তারিখে আট্টিসের (Attis) পুনরুত্থান নিয়ে এইদিনে হালকামি করতো, ইহুদিরা করত পুরিম (Purim) উপলক্ষ্যে। হিন্দুরাও হোলি (Holi) উৎসব এইদিনের আশেপাশে করে থাকে। ইসলামে মিথ্যা কথা বলে ঠকানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যেমন, নবী (সা.) বলেছেন, ‘যারা ধোঁকাবাজি করে তারা আমাদের দলভুক্ত নয়।’ তবে ইসলামে সত্য কথা বলেও হাস্যরস করা বা বিভিন্ন রকমের জ্ঞানোদ্দীপক কৌতুকের প্রচলন রয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তার সঙ্গীসহ ইসলামি ব্যক্তিত্বের অনেকের জীবনীতেই প্রচুর রসালো গল্পের উদাহরণ ইতিহাসে পাওয়া যায়।

অন্যান্য দিবসের মত এই দিবসটিরও উৎপত্তি পাশ্চাত্যে শুরু হলেও এর বিস্তৃতি এখন দেশে দেশে। তবে বর্তমানে অনেকেই এ দিবসটির বিরোধীতা করছে। অনেক পণ্ডিতেরাও এ সংস্কৃতিটি পালনের বিরোধীতা করে বলেন, মানুষকে মিথ্যা বলে ঠকানো বা বোকা বানিয়ে মজা পাবার কিছুই নেই। মিথ্যা বলা কোনো ধর্মই সমর্থন করে না। এমনকি কোনো সভ্য সমাজও নয়। তাই মিথ্যা বলে মানুষকে বোকা বানানো কোনো উৎসব হতে পারে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর/আরএম