শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ অনুকরণীয়

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৯ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৫ ১৪২৭,   ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

শুভ জন্মাষ্টমী

শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ অনুকরণীয়

 প্রকাশিত: ১৫:৩৩ ১১ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৫:৩৪ ১১ আগস্ট ২০২০

বীরেন মুখার্জী

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্ররীতি অনুযায়ী মানবজীবনের চারটি সময়কালের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি এই চারভাগে ভাগ করা হয়েছে পৃথিবীর সময়কাল। শাস্ত্রমতে, সত্যযুগে শ্রীনারায়ণ, ত্রেতাযুগে শ্রীরাম, দ্বাপরযুগে শ্রীকৃষ্ণ এবং কলিযুগে শ্রীচৈতন্যদেব মহাপ্রভু জীবকুলের উদ্ধারে ধরাধামে আবির্ভূত হন। নানা কারণে পৃথিবী যখন পাপাচারে পূর্ণ হয় তখনই সত্য পথের নির্দেশক পরমেশ্বরের আত্মারূপে জীবজগতে অবতারের আবির্ভাব ঘটে। পৃথিবীর এমনই এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পৃথিবীর জীবকুলের প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে ‘অশুভ বিনাশ ও ধর্মারক্ষার্থে’ জীবের ত্রাতারূপে ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। 

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ নিসৃত বাণী শ্রীমদ্ভগবদ্শাস্ত্রমতে, ধর্মের হানি এবং অধর্মের বৃদ্ধি হলে ভগবান সাকাররূপে জনসমক্ষে প্রকট হন। দ্বাপর যুগে তৎকালীন ভারতে চরম অরাজকতার সৃষ্টি হলে ধর্ম সংস্থাপনায় তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন। মহাভারতে উল্লেখ আছে, রাজা জরাসন্ধ একশো রাজাকে বলি দেয়ার জন্য যজ্ঞের আয়োজন করেন। অপরদিকে মধ্য-উত্তর ভারতে এ রাজার জামাতা কংস, পিতা উগ্রসেনকে বন্দি করে মথুরার সিংহাসন অধিকার করে আত্মীয়-স্বজন এবং প্রজাদের ওপর অত্যাচার শুরু করেন। স্বঘোষিত রাজার নিপীড়নে অতিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ সাধারণ জনতা মুক্তির আশায় পরমেশ্বর ভগবানের প্রার্থনা করতে থাকেন। ভক্তের প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে কংসের কারাগারে দেবকী গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বের জীবকুলের ত্রাণকর্তা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। 

কংস তার একমাত্র বোন দেবকীর বিয়ে দেন ধর্মপ্রাণ বসুদেবের সঙ্গে। বিয়ের পর তাদের নিয়ে রথে চড়ে তিনি যখন নগর ভ্রমণ করছিলেন তখন তিনি শুনতে পান এক দৈববাণী। তিনি শোনেন, তারই বোন দেবকীর অষ্টমগর্ভের পুত্রসন্তান তাকে বধ করবে। ক্রোধান্বিত মথুরাধিপতি কংস তখন থেকেই বসুদেব ও দেবকীকে তার কারাগারে বন্দি করে রাখেন। রাজ কারাগারে বন্দি অবস্থায় দেবকী সাতটি সন্তান করেন, কিন্তু অত্যাচারী কংস শিলায় নিক্ষেপ করে নির্মমভাবে শিশুদের হত্যা করেন। এরপর দেবকী অষ্টমবারের মতো সন্তানসম্ভবা হলে কারাগারে বসানো হয় কঠোর নিরাপত্তা। কিন্তু দেবকী যখন সন্তান প্রসব করেন তখন কালঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে রক্ষীসহ সকলে। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রোহিনী নক্ষত্রে দেবকীর কোল আলো করে ধরাধামে নেমে আসেন পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ। 

‘যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্
পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে’
(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা/ জ্ঞানযোগ, শ্লোক- ৭/৮)


শ্রীকৃষ্ণ বলেন, হে ভারত, যখনই পৃথিবীতে অধর্ম বেড়ে যায় তখন সাধুদের রক্ষা, দুষ্টের বিনাশ ও ধর্ম সংস্থাপন করতে ধরাধামে আমি আবির্ভূত হই। ধর্মের গ্লানি এবং অধর্ম বৃদ্ধির তাৎপর্য সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণের দর্শন হলো- ভগবদ প্রেমী, ধর্মান্ধ, সদাচারী, নিরপরাধ মানুষের ওপর নাস্তিক, পাপী, দুরাচারী, বলবান ব্যক্তিদের অত্যাচার বৃদ্ধি পাওয়া। মানুষের মধ্যে সদগুণ সদাচার অত্যন্ত কমে গিয়ে দুর্গুণ-দুরাচারের আস্ফালন। এমনটি হলে মানুষ তার নৈতিকতা বিবর্জিত হয়ে কাম, ক্রোধ, লোভে বশীভূত হয়। ষড়রিপুর তাড়নায় ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের আগে ভারতবর্ষের সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তখন অধমের্র প্রবল প্রতাপে সাধুসজ্জন ব্যক্তিরা নিপতিত হয়েছিলেন। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের কামনায় প্রার্থনাপরায়ণ ছিলেন তারা। দুষ্কৃতকারীরা ভগবান হিসাবে ঘরে ঘরে পূজ্য হতে চেয়েছিলেন। কংস ঘোষণা করেছিলেন রাজ্যে তাকে ছাড়া আর কাউকে পুজো করা যাবে না। সুতরাং এসব দূরাচারিদের বিনাশ অবশ্যম্ভাবি হয়ে পড়েছিল। ধর্ম সংস্থাপনের তীব্র প্রয়োজন অনুভ‚ত হচ্ছিল। সেই যুগপ্রয়োজনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব। সুতরাং শ্রীকৃষ্ণের দর্শন দলিতের পক্ষে এবং দলনকারীদের দমনে। 

দশাবতারের তালিকায় শ্রীকৃষ্ণ অষ্টম অবতার বলে বিশেষায়িত। গীতায় তিনি বলেছেন, ‘আমার জন্ম সাধারণ মানুষদের মতো নয় এবং আমার মৃত্যু সাধারণ মানুষের মতো নয়। মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং মারা যায়; কিন্তু আমি জন্মরহিত হয়েও আবিভর্‚ত হই এবং অবিনশ্বর হয়েও অন্তর্ধান করে থাকি। আবিভর্‚ত হওয়া এবং অন্তর্হিত হওয়া-দুটিই আমার অলৌকিক লীলা।’ অন্যান্য প্রাণী যেমন কর্মের ফলস্বরূপ জন্মগ্রহণ করে, ভগবানের সেরূপ জন্ম হয় না। কর্মের ফলরূপে জন্ম হলে দুটি ব্যাপার থাকে- আয়ু এবং সুখ বা দুঃখভোগ। ভগবানের এ দুটির কোনোটাই হয় না। যে কারণে তিনি গীতার মাধ্যমে মানুষের কর্মের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বলেছেন, নিষ্কাম কর্ম করতে হবে। কর্ম করে ফলের বাসনা করা বৃথা।

পরমাত্মার সঙ্গে নিজের আত্মার মিলন ঘটানোই কর্মযোগের প্রধান উদ্দেশ্য। জীবকুলকে শিক্ষা দিতে তিনি মনুষ্য দেহ পরিগ্রহ করে ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছেন এবং মানুষের মতো লীলা করেছেন। শ্রীকৃষ্ণের জন্মলীলা সুগভীর আধাত্মতত্ত্ব সমৃদ্ধ। শ্রীকৃষ্ণের দর্শন মতে, প্রাণের সঙ্গে দৈবী শক্তির মিলন ঘটলে সাধক চিত্তে ভগবানের আবির্ভাব ঘটে। কামক্রোধাদি রিপুসমূহ প্রতিনিয়ত মনুষ্যদেহকে মন্থন করে চলছে। অতএব এ দেহ মথুরা সমতুল্য আর এর অধিপতি কংস। সে কামনার অধিপতি। মানুষের মন কামনা করেÑ যা আছে তা থাকুক, আর যা নেই তা যেন পাই। কিন্তু ভগবানের উপদেশ হল, এ অবস্থা থেকে নির্বাণ লাভ করতে হবে। সুতরাং নিষ্কাম কর্মে মত্ত থাকতে তিনি জীবকুলকে গীতার মাধ্যমে উপদেশ দিয়েছেন। তিনি তার জীবন চক্রে দেখিয়েছেন, একজন সাধক অহং স্তরে উপনীত হলে ভগবানের পূর্ণ সাক্ষাৎ লাভ করেন। কিন্তু তখনও কাম রিপু সক্রিয় থাকায় তা ভগবৎ দর্শনকে বিঘিœত করতে চায়। সুতরাং এই কাম রিপুকেই সর্বাগ্রে তাড়ানোর সাধনা করতে হবে। 

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম যে ধরাধামে একবার হয়েছে তা নয়। যুগে যুগে সাধক-হৃদয়ে ভগবানের জন্ম হয়। সাধক-হৃদয়ে ভগবানের জন্মকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলার জন্য জন্মাষ্টমী উৎসব উদযাপন। ভগবানের জন্মোৎসব ভক্ত সাধারণের চিত্ত উদ্বোধন ঘটিয়ে আত্মাকে ঊর্ধায়িত করে। সুতরাং প্রতিটি কল্যাণকামী মানুষের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হওয়া উচিত মোহ ত্যাগ করে অতিশয় ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে জীবের সেবা করা। তা হলে সাধনের সব স্তর অতিক্রম করে পরমাত্মায় বিলীন হওয়া সম্ভব। অমৃত সিদ্ধি লাভ অর্থাৎ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে নির্বাণ লাভ করা সম্ভব। মনুষ্য জীবন নানা পাপভারে বিপর্যস্ত। ষড়রিপুর উৎপীড়নে দেহ-মথুরা সর্বদা কামরূপী কংসের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। দেহস্থ আত্মা পরমেশ্বর দর্শনে প্রার্থনাপরায়ণ। সুতরাং আত্মা ও সাধন শক্তিকে আকর্ষণ করে নিজেকে অমৃত সাধনায় প্রবিষ্ট করাতে হবে। এটিই শাস্ত্রের মূল কথা। শ্রীকৃষ্ণের দর্শনও তাই।

বিশ্বের সামগ্রিকতা বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে বর্তমান বিশ্ব বিভিন্ন প্রেক্ষিতে পাপাচারে পূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে দিকেই তাকানো যায় সেদিকেই রক্তপাত, বিভিষিকাময় সন্ত্রাস, লুঠতরাজ লেগে আছে। প্রতিটি গৃহকোণ থেকে শান্তি উবে গেছে। এমতবস্থায় ধরণী যেন কোনো এক মহামানব বা অবতারের আগমনের প্রতীক্ষা করছে। যার অমিয় স্পর্শে পৃথিবীর সব পাপ-তাপ-জরা দূরীভূত হয়ে বিশ্বে পরম শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব প্রাণী হানাহানি, শোক-সন্তাপ মুক্ত হয়ে সুখী ও নিরোগ জীবন লাভ করবে। এ বিশ্বের সকল জীব পাপবিমুখ হয়ে পূণ্যময় পথে পরিভ্রমণ করে ইষ্টপ্রীতি লাভ করুক- শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি শুভ জন্মাষ্টমীতে এই প্রার্থনা করছি। জয়তু শ্রীকৃষ্ণ- কল্যাণ হোক বিশ্বের সব জীবের।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর