যান্ত্রিক নগরে মুক্ত শৈশবের সন্ধান
ইট-কাঠের এই নগরে শিশু-কিশোরদের সময় কাটে চার দেয়ালের ভেতরে। নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ। পার্ক বা খোলা জায়গারও অভাব। দূষণে বিষাক্ত আবহাওয়া ও পরিবেশ। দুরন্ত শৈশবেও শিশুরা নির্জীবভাবে বেড়ে উঠছে এই প্রাণহীন শহরে। এ শিশুদের সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার জন্য চাই খোলা আকাশ, উন্মুক্ত প্রান্তর। জনবহুল ঢাকা শহরে এমনটা মেলা মুশকিল। তাই বিকল্প হিসেবে সড়ককেই অনেকে বানিয়ে নেয় খেলার মাঠ। কাটায় কিছু মুক্ত সময়।
রাজধানীর দেয়ালবন্দি শিশু-কিশোরদের জন্য মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে উঠেছে বিশাল এক খেলার মাঠ।
শুক্রবার সকালে ‘ইনস্টিটিউট অফ ওয়েলবিং’ এর আয়োজনে এভিনিউয়ের এক পাশে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে শিশু-কিশোদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।
.png)
এই সুযোগ পেয়ে সকাল থেকেই বিভিন্ন বয়সের শিশু-কিশোর ভিড় জমায় সংসদের দক্ষিণ পাশে। মেতে ওঠে খেলাধুলায়। দৌড়াদৌড়ি আর হুড়োহুড়িতে আনন্দমুখর হয়ে ওঠে দুরন্ত শৈশব। শিশুদের সঙ্গে বাবা-মা ও অভিভাবকদেরও দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা যায়।
যান্ত্রিক নগরজীবনে সন্তানদের একটু খোলা পরিবেশে খেলাধুলার সুযোগ দিতে পেরে তারাও আনন্দিত।
ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটির (ডিটিসিএ) সঙ্গে যৌথভাবে এ আয়োজনে অংশ নেয় ইউনিলিভারের ব্র্যান্ড সার্ফ এক্সেল। সার্ফ এক্সেলের ‘মুক্ত হোক শৈশব’ ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে ছিল ‘গাড়িমুক্ত সড়ক’ শীর্ষক এ আয়োজন। প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা ঘেঁষা মানিক মিয়া এভিনিউয়ের পাশটিতে গাড়ি চলাচল বন্ধ করা হয়। মুক্ত সড়কে শিশুরা নিজের মতো করে কাটায় একান্ত কিছু সময়।
অন্যদিন স্কুল কোচিংয়ের দৌরাত্ম্য থাকলেও আজকের সকালটা ছিল অন্যরকম। স্কুলে যাওয়ার তাড়া ছিল না। এমন চাপহীন দিনে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানরা ছুটে আসে রাজধানীর প্রশস্ততম সড়ক মানিক মিয়া এভিনিউয়ে। জ্যাম ও গাড়িহীন সড়কে ছিল তাদের মনের মতো পরিবেশ। আয়োজকরা শিশুদের খেলাধুলার জন্য নানা রকমের ব্যবস্থা করেছিল।
সকালে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে দেখা যায়, কেউ ব্যস্ত ক্রিকেট খেলায়, কেউ খেলছে ভলিবল। একপাশে চলছে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা। ছিল লুডু, দাবা, ক্যারমও। কাগজের খেলনা বানানো, ছবি আঁকার আয়োজনও ছিল শিশুদের জন্য। কেউ কেউ খেলনা গাড়ি, সাইকেল, ট্রাইসাইকেল নিয়ে এসেছে। একটি খেলা শেষ করে ছুটছে আরেক খেলায়। ফাঁকে সুযোগ পেয়ে কেউ একটু দোল খাচ্ছে দোলনায়। কান্নাকাটি, জেদ, চঞ্চলতা, হুড়োহুড়ি সবই ছিল এভিনিউজুড়ে।
ছোট্ট নফিদ এসেছে বাবার কোলে চড়ে। এতো বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে পেরে সে খুব উচ্ছ্বসিত। তার বাবা নাহিদ মঞ্জুর বলেন, বাসায় একা একা সময় কাটায় এখানে সঙ্গী পেয়ে ছোটাছুটি করছে। খুব মজা পাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে ডিটিসিএর অতিরিক্ত সচিব জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, আমাদের শৈশব ছিল উন্মুক্ত। স্কুলব্যাগ কী জিনিস চিনতাম না। গুটিকয়েক বই বগলদাবা করেই স্কুলে যেতাম। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কেটেছে আমাদের শৈশব। তিনি বলেন, ২২ সেপ্টেম্বর সারা বিশ্বেই ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস পালন করা হয়। ঢাকায় ২০১৬ সালে প্রথম এটি পালিত হয়। এখন প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার মানিক মিয়া এভিনিউ আর শনিবার মোহাম্মদিয়া হাউজিংয়ের তিন নম্বর রাস্তায় গাড়িমুক্ত সড়কে শিশুদের খেলাধুলার আয়োজন করা হয়।
ইনস্টিটিউট অফ ওয়েলবিংয়ের পলিসি অ্যাসিস্ট্যান্ট এ এন এম মাসুম বিল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, শিশুদের স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। তাদের আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে খেলাধুলার বিকল্প নেই। তাই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের কর্মকর্তা জিশান বায়েজিদ রহমান বলেন, একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য মুক্ত পরিবেশে খেলাধুলা করা প্রয়োজন। এ আয়োজনের উদ্দেশ্য শিশুদের খোলামেলা পরিবেশে বেড়ে ওঠার গুরুত্ব সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা।