ঢাকা,  শনিবার   ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

আরেক আলপনা গ্রামের খোঁজ

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩৯, ৯ জানুয়ারি ২০২০
আরেক আলপনা গ্রামের খোঁজ
ছবি : সংগৃহীত

নাচোলের ছোট্ট টিকইল এখন ‘আলপনা গ্রাম’ নামেই পরিচিত। রংবেরঙের আঁকিবুকি গ্রামটির প্রতিটি বাড়ির দেয়ালজুড়ে। যেন এক রঙের খেলা। তেমনই আরেক গ্রামের খোঁজ মিললো চীনের তাইওয়ানে। এর নাম তাইচুং।

ছবি : সংগৃহীত

তাইওয়ানের এই গ্রামকে অজস্র রঙিন গল্পে সজ্জিত করার নেপথ্যে এক বৃদ্ধের অবদান সবচেয়ে বেশি। তিনি হুয়ান ইয়াং-ফু, বয়স ৯৬ বছর। পুরো গ্রামের চেহারা পাল্টে দেয়ার পেছনেও বড় কারণ আছে। ১৫ বছর আগে তাইওয়ান সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, তাইচুং-এর সব বাড়ি ধ্বংস করে যুগোপযোগী আবাসন বানানো হবে। ক্ষতিপূরণের প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল সবাইকে। কিন্তু ওই প্রস্তাব মেনে নিতে পারেননি হুয়ান। বরং তিনি তুলি হাতে নীরবে আন্দোলন চালিয়ে যান।

Advertisement

ছবি : সংগৃহীত

তাইওয়ান সরকারের আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাওয়ার পরপরই হুয়ান ছবি আঁকতে শুরু করেন দেয়ালে। প্রথমে নিজের বাড়ি এবং পরে পুরো গ্রামেই। নিজের বাড়ির গায়ে প্রথমে একটি পাখি আঁকেন হুয়ান। তারপর অন্যান্য পশুপাখিদের ছবি আঁকতে থাকেন। ধীরে ধীরে তার শিল্প প্রসারিত হয় অন্যান্য পরিত্যক্ত বাড়িগুলিতেও।

ছবি : সংগৃহীত

হুয়ান ইয়াং-ফু বলেন, একসময় বাইরের মানুষ এখানে আসতো না। নতুন রূপে সাজার পর এখানকার আকর্ষণ যেমন বেড়েছে তেমন পর্যটকরাও গ্রামটি দেখতে নতুন করে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তবে নতুন সাজে সজ্জিত করার আগে তাইচুং দেখতে অন্য দশটা সাধারণ গ্রামের মতোই ছিল। গ্রাম রক্ষার পাশাপাশি এসব আমাদের জন্য বাড়তি পাওয়া।

ছবি : সংগৃহীত

গ্রামটির কথা বিশ্ব জেনেছিল ২০১০ সালে। ওই বছরের মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাইচুং-এ ঘুরতে যান। হুয়ানের শিল্পক্রিয়ায় মুগ্ধ হয়ে এবং তার গল্প শোনার পর, এই ছাত্র প্রতিশ্রুতি দেন সবাইকে জানানোর। নিজের তোলা ছবির সাহায্যে গ্রামটিকে বাঁচানোর জন্য একটি ‘ফান্ডরেইজিং ক্যাম্পেন’ শুরু করেন তিনি। এরপর গ্রামটি শুধু তাইওয়ানেই নয়, বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের জন্যও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কাগজে কলমে প্রতিবছর এই গ্রামে ঘুরতে আসা ট্যুরিস্টের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।

ছবি : সংগৃহীত

হুয়ান ইয়াং-ফু মূলত চীনের মানুষ। ওখানেই জন্ম। তিনি দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এমনকি জাতীয়তাবাদীদের হয়ে মাও সেতুংয়ের কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধেও লড়েছিলেন। সেই যুদ্ধে জাতীয়তাবাদীরা হেরে গেলে ২০ লাখ চীনার সঙ্গে হুয়ানও পালিয়ে আসেন তাইওয়ানে। পালিয়ে আসা সামরিক পরিবারদের জন্য সেখানেই বানানো হয়েছিল একটি অস্থায়ী গ্রাম। বিবিসিকে হুয়ান বলেন, যখন আমি এখানে আসি, গ্রামে ১২০০ লোক থাকতো। সবাই ছিল একটা পরিবারের মতো। তবে, এখন প্রায় সবাই নানা জায়গায় চলে গেছে। কেউ বা মারা গেছে। আমি একা হয়ে গেছি, তারপরই ছবি আঁকতে শুরু করি।’

হুয়ান ইয়াং-ফু

হুয়ানের আঁকা ছবির সঙ্গে সঙ্গে তার জীবন কাহিনিও মুগ্ধ করে পর্যটকদের। এই গ্রাম ভেঙে আবাসন বানানোর পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয় তাইওয়ান সরকার। এই গ্রাম এবং হুয়ানের বাড়ি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, হাসিমুখে জানালেন হুয়ান।

ছবি : সংগৃহীত

সবশেষে বলা যায়, সৃষ্টিশীলতার কোনো বয়স নেই, গোত্র নেই। কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বেশিদিন আটকেও থাকে না সৃষ্টিশীলতা। যে কোনো অবস্থান আর বয়সে দাঁড়িয়েও সৃষ্টিশীলতা নিজ গুণে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তবে বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন বয়স বাড়লে সৃষ্টিশীলতা কমে যায়। কিন্তু মানুষের এই স্বাভাবিক ও গড়পড়তা ধারণা পাল্টে দিয়েছেন তাইওয়ানের ৯৬ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এনকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!