ঢাকা,  রোববার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

আমরা কি সেই বাঁচার দলে থাকবো

মনিরুল ইসলাম জামাল
প্রকাশিত: ১৭:৩৩, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আমরা কি সেই বাঁচার দলে থাকবো
একাত্তরের চেতনা নিয়ে বিতর্ক, জুলাই বিপ্লবের ব্যাখ্যা, তেলের দাম নিয়ে ক্ষোভ — এসব আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর মাঝে একটা প্রশ্ন হারিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব যখন অনিশ্চয়তার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আমরা কি প্রস্তুতি নিচ্ছি — নাকি স্বপ্ন দেখছি? প্রস্তুতি আর কল্পনার ম

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে মাটির নিচে পাঁচশো কিলোমিটারের বেশি টানেল প্রস্তুত। জার্মানি তাদের পাতাল রেল স্টেশনগুলো যাচাই করছে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারযোগ্য কিনা। ফিনল্যান্ড রিজার্ভ বাহিনীর বয়সসীমা ৬৫ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে। এই দৃশ্যগুলো একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই নিয়ে আসে — তাহলে কি সত্যিই বড় কিছু আসছে? পুরা ইউরোপ জুড়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি। মধ্যপ্রাচ্যর সকল স্থানে যুদ্ধ। আমেরিকার পতন আর চীনের উত্থান। বিশ্বযুদ্ধ হতে আর কি ইন্ধন প্রয়োজন ?

সেই প্রশ্নের পিঠে চড়ে আরেকটা কল্পনা মাথাচাড়া দেয়, যেটা আজকাল বেশ ঘোরাফেরা করছে বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে — বিশ্বযুদ্ধ লাগলে বাংলাদেশ নাকি রাতারাতি ধনী হয়ে যাবে। কারণ আমরা কৃষিপণ্য উৎপাদন করি, নদীপথ আছে, আর যুদ্ধের সময় সবাইকে খেতে হবে।

Advertisement

গল্পটা শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু একটু ভাবা দরকার — এই কল্পনার ভেতরে কতটা বাস্তবতা আছে, আর কতটা শুধু ইচ্ছাপূরণ।

প্রথম প্রশ্নটা হলো — আমাদের নদীগুলো কি আসলেই আমাদের হাতে? তিস্তার পানি নিয়ে যে সংকট এক দশক ধরে চলছে, সেটাই বলে দেয় বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কতটা আমাদের নিজের হাতে, আর কতটা উজানের দেশের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। পদ্মা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র — এই নদীগুলোর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয় ভারতের নীতিতে। যুদ্ধের বাজারে হঠাৎ করে এই নদীগুলো "সোনার পথ" হয়ে ওঠার কল্পনাটা এই বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে যায়।

দ্বিতীয় প্রশ্নটা জ্বালানি নিয়ে। ধরা যাক বিশ্বযুদ্ধ লাগল, এয়ারপোর্ট বন্ধ, স্থলপথ অচল — এই কল্পনায় একটা জিনিস ভুলে যাওয়া হয় যে বাংলাদেশ নিজেই জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। আমাদের কৃষি যন্ত্রপাতি চলে ডিজেলে। 

সেচের পাম্প চলে বিদ্যুতে, যার একটা বড় অংশ আসে আমদানি করা জ্বালানি থেকে। সার আসে বিদেশ থেকে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনও ধাক্কা খাবে, অন্য সবার আগে।

অর্থাৎ যে সংকট বিদেশি সৈনিকের কাছে খাবার বিক্রির সুযোগ তৈরি করবে বলে আমরা ভাবছি, সেই একই সংকট আমাদের নিজের উৎপাদন ক্ষমতাকেই দুর্বল করে দিতে পারে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা হলো — সত্যিকারের বিশ্বযুদ্ধ মানে কি শুধু সৈনিকদের খাবার দরকার, নাকি গোটা বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার পতন?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায় — যুদ্ধ শুধু সৈনিকের পেট ভরানোর প্রশ্ন ছিল না। শিপিং রুট বিপর্যস্ত হয়েছিল, বিমা প্রিমিয়াম আকাশছোঁয়া হয়ে গিয়েছিল, মুদ্রার মান ধসে পড়েছিল, আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে গিয়েছিল। 

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ধান বা সবজি উৎপাদন করলেই সেটা "বিদেশি সৈনিকের কাছে" বিক্রি হয়ে যাবে — এই সরল সমীকরণটা বাস্তবতার সাথে মেলে না। কে কিনবে, কীভাবে টাকা পরিশোধ হবে, কোন জাহাজ সেই পণ্য বহন করবে, কোন বন্দর নিরাপদ থাকবে — এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু "নদী আছে তাই বিক্রি হবে" ভাবনাটা একটা রূপকথা।

তাহলে কি ইউরোপের এই প্রস্তুতিগুলো নিয়ে আমাদের একেবারেই ভাবার কিছু নেই ? আছে। কিন্তু ভাবনার জায়গাটা "কীভাবে ধনী হব" তা নয় — "কীভাবে টিকে থাকব।"এটাই চিন্তার বিষয়।

ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, পোল্যান্ড যা করছে, সেটা মুনাফার প্রস্তুতি নয়। এটা বেঁচে থাকার প্রস্তুতি। বাঙ্কার বানানো মানে তারা আশা করছে না যুদ্ধ থেকে লাভ হবে — তারা প্রস্তুত হচ্ছে যাতে যুদ্ধ এলে ধ্বংস না হয়ে যায়।

বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত প্রশ্নটা হওয়া উচিত এই একই জায়গায়। যুদ্ধ লাগলে আমরা কি নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারব? আমদানিনির্ভর জ্বালানি ও সারের বিকল্প কী? আমাদের নিজস্ব কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা কতটা স্বনির্ভর — বিক্রি করার জন্য নয়, নিজেদের বাঁচানোর জন্য।

একাত্তরের চেতনা নিয়ে বিতর্ক, জুলাই বিপ্লবের ব্যাখ্যা, তেলের দাম নিয়ে ক্ষোভ — এসব আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর মাঝে একটা প্রশ্ন হারিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব যখন অনিশ্চয়তার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আমরা কি প্রস্তুতি নিচ্ছি — নাকি স্বপ্ন দেখছি? প্রস্তুতি আর কল্পনার মধ্যে পার্থক্যটা বড়। একটা আমাদের বাঁচায়। আরেকটা শুধু সান্ত্বনা দেয়।

যুদ্ধ থেকে কেউ ধনী হয় না — কিছু মানুষ শুধু বেশি ধ্বংস এড়িয়ে বাঁচে।
প্রশ্নটা হলো — আমরা কি সেই বাঁচার দলে থাকব?

সূত্র : ThinkBeyondHeadlines

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!