অনিরাপদ তিমিরে ঘিরেছে কন্যা শিশুর পৃথিবী
দেশে প্রতিদিন গড়ে ২ দশমিক ১৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু হারিয়ে গেছে পুলিশের সাধারণ ডায়েরি অনুযায়ী। অর্থাৎ প্রতি ১৭ মিনিটে এক শিশু হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া শিশুদের মধ্যে অনেকেই মেয়ে। ঘর কিংবা বাইরে-কোথাও নিরাপদ নয় কন্যাশিশু। অনেক ক্ষেত্রে আপনজনের কাছেই তারা যৌন নির্যাতনসহ নানা সহিংসতার শিকার হচ্ছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের আগস্টে দেশে ২৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৫৪ জনের ৩৬ জনই কন্যাশিশু। ৮ কন্যাশিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
- ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে দুজনকে। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১১ জনকে। যৌন সহিংসতার শিকার ২৪ জন এবং সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছে চারজন। অথচ শিশু সুরক্ষায় নানা আইন থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এখনো অধরা। ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, বাল্যবিবাহ, সাইবার সহিংসতা ও শারীরিক শাস্তি-সব মিলিয়ে দিনদিন তিমিরে ঘিরছে মেয়ের নিরাপদ পৃথিবী।
শিশু নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, জুলাইয়ে শিশুহত্যার ঘটনা ছিল ৫২টি, আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে ৯১টি।
.png)
সংঘবদ্ধ ধর্ষণ সাত থেকে বেড়ে ১২টি, ধর্ষণ ও হত্যা তিন থেকে পাঁচটি এবং বলাৎকার পাঁচ থেকে সাতটিতে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বেড়েছে ৭২ শতাংশ এবং হত্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ।
দেশজুড়ে আজ ৩০ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। বিগত বছরগুলোতে সরকারি নানা প্রণোদনা ও উপবৃত্তির সহায়তায় প্রাথমিক পর্যায়ে মেয়েদের শতভাগ ভর্তি এবং লিঙ্গসমতা অর্জনে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছাতেই শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে পরবর্তী ধাপে কন্যাশিশুদের ধরে রাখার ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া এই স্থবিরতা দেশের সামগ্রিক শিক্ষা অগ্রযাত্রায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
দেশে ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু ৫ কোটি ৮৭ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট শিশুর প্রায় অর্ধেকই মেয়ে। এ সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৯৩ লাখ। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশই নিরাপত্তা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। এই স্তরে ছাত্রদের ঝরে পড়ার হার যেখানে ৩০ দশমিক ৬৩ শতাংশ, সেখানে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এ হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে প্রায় ৩৪ দশমিক ৮৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অর্থাৎ প্রাথমিকে সমতা অর্জিত হলেও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের গুরুত্বপূর্ণ ধাপে এসে প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মেয়ে শিক্ষার্থী নিজেদের শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
- পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মেয়েদের এভাবে অকালে বিদ্যালয় থেকে ছিটকে পড়ার প্রধানতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বাল্যবিবাহ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্যমতে, মাধ্যমিকে ঝরে পড়া ছাত্রীদের প্রায় ৭১ শতাংশই অপরিণত বয়সে বিয়ের শিকার হয়ে পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কন্যাশিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা কেবল একটি ব্যক্তির ভবিষ্যৎ নয়, বরং একটি পরিবার ও গোটা জাতির টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ফলে শুধু বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং মেয়েদের শিক্ষাঙ্গনে টিকিয়ে রাখা, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি থেকে তাদের রক্ষা করাই এখন প্রধান জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।