যেমন যাচ্ছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের গৃহবন্দী বৈশাখ
নতুন বছরকে বরণ করে নিতে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নানা আয়োজনে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন করা হয় পহেলা বৈশাখ। সারাবছর যেমনই কাটুকনা কেন অন্তত এই একটি দিন বাঙালির আয়োজনে কমতি থাকে না। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের মহামারিতে বেঁচে থাকাই যেন এখন একটা স্বপ্ন। কেমন কাটছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গৃহবন্দী শিক্ষার্থীদের বৈশাখ? কয়েকজন শিক্ষার্থীর বৈশাখ উদযাপনের অনুভূতি জানাচ্ছেন শফিকুল ইসলাম।
তামান্না সুলতানা, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ
নিঃসন্দেহে পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতির অন্যতম ঐতিহ্য এবং উৎসবমুখর একটি দিন। আমরা সবাই চেষ্টা করি নানা আয়োজনে দিনটিকে উপভোগ করতে। আর ক্যাম্পাসের বৈশাখ মানে অন্যরকম অনুভূতি। প্রায় একমাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় বৈশাখের পূর্ব প্রস্তুতি। একদিকে রঙ-বেরঙের ফেস্টুন, মুখোশ, আলপনার কাজে এক কথায় রঙের খেলা শুরু হয়ে যায় পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে। অন্যদিকে চলে স্টলের প্রস্তুতি। আর গান-বাজনা তো আছেই। বন্ধুবান্ধব, শিক্ষকমণ্ডলী সবাই মিলে এক অন্যমাত্রার আনন্দ আর মজায় কাটে পুরো দিনটা। কিন্তু এবার ভীষণভাবে মিস করছি আনন্দে ভরা আমার প্রিয় ক্যাম্পাসের বৈশাখকে। মঙ্গলশোভাযাত্রা ছাড়া একদম পানসে লাগছে এবারের বৈশাখ। তবু দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে, এই মহামারি থেকে নিজেকে, পরিবারকে এবং আশেপাশের মানুষকে ভালো রাখতে ঘরে থেকেই যতটা উপভোগ করা যায়। সবার একটু সচেতনতায় পৃথিবী সুস্থ হলে হয়তো সামনে আরও অনেকগুলো বৈশাখ দেখতে পাবো। এই বৈশাখে তাই একটাই প্রত্যাশা সবাই ঘরে থাকি, ঘরোয়া আয়োজনেই বৈশাখকে উপভোগ করি। সবাইকে নববর্ষের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
ঐশ্বর্য বিশ্বাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
শুভ নববর্ষ। বাঙালির ঐতিহ্য বহন করে নববর্ষ। প্রতিবছরই আমরা নতুন নতুন স্বপ্ন নিয়ে বছরটিকে বরণ করে নিই। সব দুঃখ, কষ্ট, গ্লানি, ব্যর্থতাকে ছাপিয়ে আমরা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দিনটিকে খুব আনন্দের সাথে উদযাপন করি। নতুন বছরকে বরণ করার জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু হয়ে যায় সপ্তাহ খানেক আগে থেকেই। বিভাগের সকল শিক্ষার্থীই খুব আন্তরিকতার সাথে সকাল-সন্ধ্যা অক্লান্ত পরিশ্রম করে নিজের বিভাগকে নতুন করে সাজিয়ে তোলার জন্য। নববর্ষের দিন সকাল থেকে শুরু হয় আনন্দ র্য্যালী, থাকে রং-বেরঙের ফেস্টুন, সবার পোশাকেও থাকে বাঙালীয়ানার ছোঁয়া, থাকে নতুন উদ্দীপনা। ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় মাঠে দিনব্যাপী চলে বৈশাখী মেলা, মুক্তমঞ্চে চলতে থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কিন্তু এ বছর আছে শুধু আতঙ্ক। এখন সবার একটাই আশা, সেটা হল বেঁচে থাকার আশা। আর তাই এবারের ১লা বৈশাখ সবাইকে ঘরে বসেই পালন করতে হচ্ছে। নতুন বছরে সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা, করোনা সংকট থেকে মুক্তির প্রার্থনা।
সামিহা তাসনিম, আইন বিভাগ
গত ডিসেম্বরে মেলায় এক জোড়া সাদা ঝুমকো আর ডজন দুই চুড়ি কিনে রেখেছিলাম এই এপ্রিলের জন্য। ভেবেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ বৈশাখে কোনো কিছু মিস করা যাবে না। রঙিন প্ল্যাকার্ডে ঢোলের তালে নাচতে থাকা শোভাযাত্রা, সামনের গেটে মুড়ি-মুড়কি, ডিপার্টমেন্টের মিষ্টি মুখ আর সুন্দরী কমলা গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচ কিংবা নাগরদোলায় উঠে বন্ধুর ভয়ে কাঁপা গলা, সাপের খেলা, মোরগ লড়াই দেখা কতো কি! অথচ ভাগ্যের লিখন কে করিবে খন্ডন। এবারের নববর্ষের সকালে হবে হয়তো নিত্যদিনের মতো করে টিভিতে খেলার স্কোর বোর্ডের মতো বোর্ডে উঠে থাকা করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা গুণে প্রতিদিনের মতো বৈশাখের প্রথম দিনেও হয়তো হাজারো লাশে সাদা কাপড় জড়ানো হবে পৃথিবী জুড়ে, বাংলাদেশ তার বাইরে না। তবুও, একটা খুশির খবর আছে, এবার বৈশাখ হবে পরিবার নিয়ে। মা বললো, ফ্রিজে নাকি একটা ইলিশও আছে। তা ভাজা হবে। এর সঙ্গে চার পদের ভর্তা হবে। আমিই বানাবো ঠিক করেছি। কাল কী হবে কে জানে!
আলিসা মুনতাজ, মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান
বাংলায় বৈশাখ এলেই নতুনত্ব আর বাঙালীয়ানায় মুখরিত হয় চারপাশ। নিজের মধ্যে অসম্ভব ভালো লাগার সাথে সাথে চলে দিনটি উৎযাপনের নানারকম চিন্তাভাবনা। ‘শাড়িতেই যে নারী’ এই উক্তিকে প্রমাণ করার জন্যে লাল-সাদা শাড়িতে নিজেকে মুড়িয়ে নিই প্রতিবার। কিন্তু এবার পহেলা বৈশাখের এই আনন্দের সুর বাংলাসহ গোটা বিশ্বে স্থবীর হয়ে আছে। করোনাভাইরাসের মারাত্মক আক্রমণে গোটা মানবজাতির কেউ ভালো নেই। কোয়ারেন্টাইনে থেকে নিজের কাছের মানুষের সুস্থতার চিন্তা, আর যাদের কাছে কোয়ারেন্টাইন মানে ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা সেই মানুষগুলোর কথা ভেবেই অস্থির হয়ে আছি। অভ্যাসবশত বৈশাখের আনন্দ মনে আসলেও সেই পুলক জাগানো, হৃদয় ছোঁয়া আহ্বানতো (বৈশাখ) জানাতে পারছি না। সবচেয়ে বেশি হতাশা কাজ করছে নিজের মধ্যে। পান্তা-ইলিশের আয়োজন ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর খেতে না পাওয়া যন্ত্রণার কাছে আজকে ম্লান মনে হচ্ছে। বাড়িতে বৈশাখের সব উপকরণ সাজানো থাকলেও তাকে আয়োজনে রূপান্তরিত করা একরকম ঔদ্ধত্যের ন্যায় লাগছে।