ঢাকা,  সোমবার   ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ ধর্ম ]

সূরা আল ফাতিহা: পবিত্র কোরআনের সার-সংক্ষেপ

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫:৫৬, ২৮ আগস্ট ২০১৮
সূরা আল ফাতিহা: পবিত্র কোরআনের সার-সংক্ষেপ

প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) এরশাদ করেছেন যে, ‘যার হাতে আমার জীবন-মরণ, আমি তাঁর শপথ করে বলছি, সূরা আল-ফাতিহার দৃষ্টান্ত তাওরাত, ইনজীল, যাবুর প্রভৃতি অন্য আসমানী কিতাবে তো নেই-ই, এমনকি পবিত্র কোরআনেও এর দ্বিতীয় নেই।

সূরা আল ফাতিহা-
 
শ্রেণী: মক্কী সূরা
 
নামের অর্থ: শুরু
 
অন্য নাম: উম্মুল কিতাব, চাবি, উম্মুল কোরআন, সূরা আল হামদ্‌
 
অবতীর্ণ হওয়ার সময়: নবী হজরত মোহাম্মাদ (সা.) এর নবুয়্যত প্রাপ্তির শুরুর দিকে
 
পরিসংখ্যান-
 
সূরার ক্রম: ১
 
আয়াতের সংখ্যা: ৭
 
পারার ক্রম: ১
 
রুকুর সংখ্যা:  ১
 
সিজদার সংখ্যা: নেই
 
বিশেষ বিষয় সম্পর্কে আয়াতের সংখ্যা-
 
আল্লাহ্‌র প্রশংসা: ৩
 
স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে সম্পর্ক: ১
 
মানবজাতির প্রার্থনা: ৩
 
পরবর্তী সূরা: সূরা আল-বাকারা
 
সূরা আল ফাতিহা (আরবি: سورة الفاتحة‎‎) মুসলমানদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ পবিত্র কোরআনের ১ নম্বর সূরা, এর আয়াত সংখ্যা ৭ এবং রূকু সংখ্যা ১। ফাতিহা শব্দটি আরবি ‘ফাতহুন’ শব্দজাত যার অর্থ ‘উন্মুক্তকরণ’। 
 
এটি মহান আল্লাহ'র তরফ থেকে বিশেষ উপহার। সূরা আল ফাতিহা অন্যান্য সূরার ন্যায় বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম দিয়ে শুরু। আল ফাতিহা সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে বিধায় মক্কী সূরা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ।
 
সূরা আল ফাতিহা:
 
(১.১) بسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيم
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)।
 
(১.২) الْحَمْدُ للّهِ رَبِّ الْعَالَمِين
আল্লাহরই জন্য সমস্ত প্রশংসা, যিনি বিশ্বজগতের রব।
 
(১.৩) الرَّحمـنِ الرَّحِيم
যিনি পরম দয়ালু, অতিশয় করুণাময়।
 
(১.৪) مَـالِكِ يَوْمِ الدِّين
যিনি বিচার দিবসের মালিক।
 
(১.৫) إِيَّاك نَعْبُدُ وإِيَّاكَ نَسْتَعِ
আমরা শুধুমাত্র (একমাত্র) আপনারই ইবাদাত করি এবং শুধুমাত্র (একমাত্র) আপনারই নিকট সাহায্য চাই।
 
(১.৬) اهدِنَــــا الصِّرَاطَ المُستَقِيم
আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।
 
(১.৭) صِرَاطَ الَّذِينَ أَنعَمتَ عَلَيهِمْ غَيرِ المَغضُوبِ عَلَيهِمْ وَلاَ الضَّالِّين
তাদের পথ, যাদের আপনি অনুগ্রহ করেছেন। আর তাদের পথে নয়, যাদের প্রতি আপনার গজব বর্ষিত হয়েছে, তাদের পথও নয় যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।
(আমিন)
 
নামকরণ:
 
এ সূরার বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখেই এর এই নামকরণ করা হয়েছে। যার সাহায্যে কনো বিষয়, গ্রন্থ বা জিনিসের উদ্বোধন করা হয় তাকে ‘ফাতিহা’ বলা হয়। অন্য কথায় বলা যায়, এ শব্দটি ভূমিকা এবং বক্তব্য শুরু করার অর্থ প্রকাশ করে।
 
নাজিল হওয়ার সময়-কাল:
 
এটি প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত লাভের একেবারেই প্রথম যুগের সূরা। বরং হাদীসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে জানা যায়, এটিই মুহাম্মাদ (সা.) এর ওপর নাজিলকৃত প্রথম পূর্ণাঙ্গ সূরা। এর আগে মাত্র বিচ্ছিন্ন কিছু আয়াত নাজিল হয়েছিল। সেগুলো সূরা ‘আলাক্ব’, ‘মুয্‌যাম্‌মিল’ ও ‘মুদ্‌দাস্‌সির’ ইত্যাদিতে সন্নিবেশিত হয়েছে।
 
বিষয়বস্তু:
 
আসলে এ সূরাটি হচ্ছে একটি দোয়া। যে কোনো ব্যক্তি এ গ্রন্থটি পড়তে শুরু করলে মহান আল্লাহ প্রথমে তাকে এ দোয়াটি শিখিয়ে দেন। গ্রন্থের শুরুতে এর স্থান দেয়ার অর্থই হচ্ছে এই যে, যদি যথার্থই এ গ্রন্থ থেকে তুমি লাভবান হতে চাও, তাহলে নিখিল বিশ্ব-জাহানের মালিক মহান আল্লাহর কাছে দোয়া এবং সাহায্য প্রার্থনা করো।
 
মানুষের মনে যে বস্তুটির আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদা থাকে স্বভাবত মানুষ সেটিই চায় এবং সে জন্য দোয়া করে। আবার এমন অবস্থায় সে এই দোয়া করে যখন অনুভব করে যে, যে সত্তার কাছে সে দোয়া করছে তার আকাংখিত বস্তুটি তারই কাছে আছে। কাজেই পবিত্র কোরআনের শুরুতে এই দোয়ার শিক্ষা দিয়ে যেন মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, সত্য পথের সন্ধান লাভের জন্য এ গ্রন্থটি পড়, সত্য অনুসন্ধানের মানসিকতা নিয়ে এর পাতা ওলটাও এবং নিখিল বিশ্ব-জাহানের মালিক ও প্রভু মহান আল্লাহ হচ্ছেন জ্ঞানের একমাত্র উৎস। 
 
একথা জেনে নিয়ে একমাত্র তাঁর কাছেই পথনির্দেশনার আর্জি পেশ করেই এ গ্রন্থটি পাঠের সূচনা কর। এ বিষয়টি অনুধাবন করার পর একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, পবিত্র কোরআন ও সূরা ফাতিহার মধ্যকার আসল সম্পর্ক কোনো বই ও তার ভূমিকার সম্পর্কের পর্যায়ভুক্ত নয়। বরং এ মধ্যকার আসল সম্পর্কটি দোয়া ও দোয়ার জবাবের পর্যায়ভুক্ত। 
 
সূরা ফাতিহা বান্দার পক্ষ থেকে একটি দোয়া। আর পবিত্র কোরআন তার জবাব মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। বান্দা দোয়া করে, হে মহান প্রভু! আমাকে পথ দেখাও। জবাবে মহান প্রভু এই বলে সমগ্র পবিত্র কোরআন তার সামনে রেখে দেন: এই নাও সেই হিদায়াত ও পথের দিশা যে জন্য তুমি আমার কাছে আবেদন জানিয়েছ।
 
বৈশিষ্ট্য:
 
এই সূরাটি পবিত্র কোরআনের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সূরা। প্রথমত: এ সূরা দ্বারাই পবিত্র কোরাআন আরম্ভ হয়েছে এবং এ সূরা দিয়েই সর্বশ্রেষ্ঠ এবাদত সালাত আরম্ভ হয়। অবতরণের দিক দিয়েও পূর্ণাঙ্গ সূরারূপে এটিই প্রথম নাজিল হয়। সূরা 'ইকরা', 'আল-মুজাম্মিল' ও 'আল-মুদ্দাসসির' এর ক'টি আয়াত অবশ্য সূরা আল-ফাতিহার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সূরারূপে এ সূরার অবতরণই সর্বপ্রথম। 
 
যে সকল সাহাবী (রা.) সূরা আল-ফাতিহা সর্বপ্রথম নাজিল হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন, তাদের সে বক্তব্যের অর্থ বোধহয় এই যে, পরিপূর্ণ সূরারূপে এর আগে আর কনো সূরা নাজিল হয়নি। এ জন্যই এ সূরার নাম 'ফাতিহাতুল-কিতাব' বা কোরআনের উপক্রমণিকা রাখা হয়েছে।
 
'সূরা আল ফাতিহা' এদিক দিয়ে সমগ্র পবিত্র কোরআনের সার-সংক্ষেপ। এ সূরায় সমগ্র পবিত্র কোরআনের সারমর্ম সংক্ষিপ্ত আকারে বলে দেয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের অবশিষ্ট সূরাগুলো প্রকারান্তরে সূরা ফাতিহারই বিস্তৃত ব্যাখ্যা। তাই এ সূরাকে সহীহ হাদীসে 'উম্মুল কিতাব', 'উম্মুল কোরআন', 'কোরানে আযীম' বলেও অভিহিত করা হয়েছে। 
 
ইমাম তিরমিযী আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রসূলে কারীম (সা.) আরো বলেছেন যে, ‘সূরায়ে ফাতিহা প্রত্যেক রোগের ওষুধবিশেষ’।
 
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা:
 
সূরা আল-ফাতিহার প্রথমে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এ সূরার প্রথম তিনটি আয়াতে মহান আল্লাহ’র প্রশংসা ও তারীফের বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর তফসীরে একথা সুস্পষ্ট হয়েছে যে, তারীফ ও প্রশংসার সঙ্গে সঙ্গে ঈমানের মৌলিক নীতি ও মহান আল্লাহ’র একত্ববাদের বর্ণনাও সূক্ষভাবে দেয়া হয়েছে। 
 
তৃতীয় আয়াতে এর দুইটি শব্দে তারীফ ও প্রশংসার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের বিপ্লবাত্মক মহোত্তম আকীদা যথা কিয়ামত ও পরকালের বর্ণনা প্রমাণসহ উপস্থিত করা হয়েছে। চতুর্থ আয়াতের এক অংশে তারীফ ও প্রশংসা এবং অপর অংশে দোয়া ও প্রার্থনা করা হয়েছে।
 
মানবজীবন তিনটি অবস্থায় অতিবাহিত হয় - অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত। পূর্বের তিনটি আয়াতের মধ্যে الْحَمْدُ للّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ এবং الرَّحْمـنِ الرَّحِيمِ - এ দুইটি আয়াতে মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, অতীতে সে কেবল মাত্র আল্লাহ মুখাপেক্ষী ছিল, বর্তমানেও সে একমাত্র তারই মুখাপেক্ষী। অস্তিত্বহীন এক অবস্থা থেকে তিনি তাকে অস্তিত্ব দান করেছেন। 
 
পরবর্তী আয়াতে مَـالِكِ يَوْمِ الدِّينِ - এর মধ্যে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতেও সে আল্লাহ’র মুখাপেক্ষী। প্রতিদান দিবসে মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো সাহায্য পাওয়া যাবে না। একজন বুদ্ধিমান ও বিবেকবান ব্যক্তি মনের গভীরতা থেকেই এ স্বত:স্ফুর্ত স্বীকৃতি উচ্চারণ করছে যে, আমরা তোমাকে ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করি না। এ মৌলিক চাহিদাই إِيَّاكَ نَعْبُدُ তে বর্ণনা করা হয়েছে। অভাব পূরণকারী একক সত্তা আল্লাহ‌, সুতরাং নিজের যাবতীয় কাজে সাহায্যও তার নিকট প্রার্থনা করবে। এ মৌলিক চাহিদাই বর্ণনা وإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এ করা হয়েছে। 
 
মোটকথা, এ চতুর্থ আয়াতে একদিকে মহান আল্লাহর তারীফ ও প্রশংসার সঙ্গে একথারও স্বীকৃতি রয়েছে যে, ইবাদত ও শ্রদ্ধা পাওয়ার একমাত্র তিনিই যোগ্য। অপরদিকে তার নিকট সাহায্য ও সহায়তার প্রার্থনা করা এবং তৃতীয়ত; আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করার শিক্ষাও দেয়া হয়েছে। 
 
শেষ তিনটি আয়াতে মানুষের দোয়া ও আবেদনের বিষয়বস্তু এবং এক বিশেষ প্রার্থনা পদ্ধতি শিক্ষা দেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে -
 
اهدِنَــــا الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنعَمتَ عَلَيهِمْ غَيرِ المَغضُوبِ عَلَيهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ 
 
আমাদেরকে সরল পথ দেখাও, সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাজিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। 
 
এই তিনটি আয়াতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যেমন, সরল পথের হেদায়াতের জন্য যে আবেদন এ আয়াতে শিক্ষা দেয়া হয়েছে, এর আবেদনকারী যেমনিভাবে সাধারণ মানুষ, সাধারণ মুমিনগণ, তেমনি আওলিয়া, গাউস-কুতুব এবং নবী-রাসূলগণও বটে। 
 
পবিত্র কোরআনের শিক্ষায় স্পষ্টত:ই এ তথ্য ব্যক্ত হয়েছে যে, সৃষ্টির প্রতিটি স্তর, এমনকি প্রতিটি অণু-পরমাণু পর্যন্ত নিজ নিজ অবস্থানু্যায়ী প্রাণ ও অনুভূতির অধিকারী। স্ব-স্ব পরিমন্ডলে প্রতিটি বস্তুর বুদ্ধি-বিবেচনা রয়েছে। অবশ্য এ বুদ্ধি ও অনুভূতির তারতম্য রয়েছে। কোনটাতে তা স্পষ্ট এবং কোনটাতে নিতান্তই অনুল্লেখ্য। 
 
বুদ্ধি ও অনুভূতির ক্ষেত্রে এ তারতম্যের জন্যই সমগ্র সৃষ্টিজগতের মধ্যে একমাত্র মানুষ ও জ্বিন জাতিকেই শরীয়তের হুকুম-আহকামের আওতাভুক্ত। কারণ, সৃষ্টির এ দুইটি স্তরের মধ্যেই বুদ্ধি ও অনুভূতি পূর্ণ মাত্রায় দেয়া হয়েছে। কিন্তু, তাই বলে একথা বলা যাবে না যে, একমাত্র মানুষ ও জ্বিন জাতি ছাড়া সৃষ্টির অন্য কনো কিছুর মধ্যে বুদ্ধি ও অনুভূতির অস্তিত্ব নেই।
 
কেননা, মহান আল্লাহ তাআলা সূরা বনী-ইসরাঈলে এরশাদ করেছেন, ‘এমন কোনো বস্তু নেই যা আল্লাহ’র প্রশংসার তসবীহ পাঠ করে না, কিন্তু তোমরা তাদের তসবীহ বুঝতে পার না।’
 
মহান আল্লাহ সূরা আন নূরে এরশাদ করেছেন, ‘তোমরা কি জান না যে, আস্মান-জমিনের যা কিছু রয়েছে, সকলেই আল্লাহ’র পবিত্রতা বর্ণনা ও গুণগান করে? বিশেষত: পাখীকুল যারা দুই পাখা বিস্তার করে শূন্যে উড়ে বেড়ায়, তাদের সকলেই স্ব-স্ব দোয়া তসবীহ সম্পর্কে জ্ঞাত এবং আল্লাহ তাআলাও ওদের তসবীহ সম্পর্কে খবর রাখেন।
 
সূত্র: উইকিপিডিয়া
 
‘আল ফাতিহাহ’। অনুবাদ: মুজিবুর রহমান, কুরতুবী, মারেফুল কোরআন।
 
 
ডেইলি বাংলাদেশ/আরেএজে
ডেইলি-বাংলাদেশ/এম ইউ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!