ঢাকা,  সোমবার   ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ ধর্ম ]

কেয়ামতের আলামত বা লক্ষণসমূহ (পর্ব-১)

পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে
মেহেদি হাসান অপু
প্রকাশিত: ১৮:৩২, ২৯ আগস্ট ২০১৮
কেয়ামতের আলামত বা লক্ষণসমূহ (পর্ব-১)

ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী কেয়ামত হচ্ছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধ্বংসের দিন। যেদিন পৃথিবী অসীমের মাঝে বিলীন হয়ে যাবে। সেদিন মহান আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকবেনা। 

কেয়ামতের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা ইসলাম ধর্মে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কেয়ামতের আকীদা ছাড়া একজন মুসলমান মহান আল্লাহর মুমিন বান্দা হতে পারেনা। পৃথিবী যখন পাপে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে, মহান আল্লাহর নাম নেয়ার মতো পৃথিবীতে পুন্য বা নেক আমল করার মতো কেউ থাকবেনা তখন কেয়ামত সংঘটিত হবে । 

কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট দিনের বা সময়ের বর্ণনা নেই তবে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এর কিছু আলামত বা লক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কেয়ামত সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআন শরীফে বলেন-

‘তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে, কিয়ামত কখন অনুষ্ঠিত হবে? বলে দিন, এর খবর তো আমার পালনকর্তার কাছেই রয়েছে। তিনিই তা অনাবৃত করে দেখাবেন নির্ধারিত সময়ে। আসমান ও যমীনের জন্য সেটি অতি কঠিন বিষয়। যখন তা তোমাদের ওপর আসবে, তখন অজান্তেই এসে যাবে।’ (সূরা আরাফ, আয়াত -১৮৭)

পবিত্র কোরআনে আরো বর্ণিত আছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই কেয়ামতের জ্ঞান রয়েছে।’ (সূরা লুক্বমান, আয়াত-৩৪)

মহান আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘যেদিন আপনার পালনকর্তার কোনো বড় নিদর্শন আসবে, সেদিন এমন কোনো ব্যক্তির বিশ্বাস স্থাপন তার জন্য ফলপ্রসূ হবে না।’ (সূরা আনআম, আয়াত-১৫৮)

কেয়ামতের আলামত বা লক্ষণসমূহ:

পৃথিবী ধ্বংসের প্রাক্কালে যখন পৃথিবী পাপের অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে যাবে, মানুষ ধর্ম-কর্ম ভুলে আবার জাহেলী যুগে ফিরে যাবে। মানুষের মধ্যে থেকে ইমান, ভালোবাসা, খোদাভীতি সব উঠে যাবে, এমন এক সময়ে কেয়ামত সংঘটিত হবে। এছাড়াও মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন-

যতদিন পর্যন্ত না দশটি লক্ষণ দেখা যাবে ততদিন পর্যন্ত কেয়ামত হবে না, লক্ষণগুলো হলো: ইমাম মাহদির আবির্ভাব, ধোকাবাজ দাজ্জাল, দাব্বাতুল আরদ, পশ্চিম আকাশে সূর্যোদয়, হজরত ঈসা (আ.) এর আবির্ভাব, ইয়াজুজ মাজুজের আবির্ভাব, তিনটি ভূমিধস একটি প্রাচ্য, একটি পাশ্চাত্য একটি আরব দেশে অত:পর ইয়ামেন থেকে একটি অগ্নি উত্থিত হয়ে মানুষদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে। (সহি মুসলিম, কিতাবুল ফিতান)

ইমাম মাহদীর আগমন:

কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে পৃথিবীতে ইমাম মাহাদী জন্মগ্রহন করবে। আল মাহদী শব্দের অর্থ ‘পথ প্রদর্শিত ব্যক্তি’ । এখানে মাহদী বলতে কিয়ামতের প্রাক্কালে হজরত ঈসা (আ.) এর অবতরন ও দাজ্জালের আত্মপ্রকাশের পূর্বে মুসলিম নেতৃত্বের যে সংস্কারক মনীষীর আবির্ভাবের কথা আছে তাকে বুঝানো হয়েছে। তার পিতার নাম হবে আব্দুল্লাহ আর মাতার নাম হবে আমেনা। ইমাম মাহদী বয়:প্রাপ্ত হয়ে দুনিয়ায় আবার ইসলামের দ্বীন প্রতিষ্ঠা করবেন।

আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামা-আতের মতে ইমাম মাহদী সাইয়িদ তথা হজরত ফাতিমা (রা.) এর বংশ থেকে আসবেন, তার শারীরিক গঠন লম্বা দেহ উজ্জ্বল বর্ন বিশিষ্ট হবে। তার মুখে মৃদু জড়তা থাকবে সে কারণে মাঝে মাঝে মনক্ষুন্ন হয়ে উরুতে আঘাত করবেন । মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি ইলমে লাদুন্নী প্রাপ্ত হবেন।

ইমাম মাহদির আবির্ভাব সম্পর্কে হজরত ইবনে মাসাউদ (রা.) কতৃক বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘আমার উন্মতের শেষ লগ্নে মাহদীর আবির্ভাব ঘটবে। তার শাসনামলে প্রচুর বৃষ্টি হবে, ভূমি থেকে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, পশু সম্পদের বৃদ্ধি হবে। পৃথিবীতে এ উন্মত অতি সন্মানের অধিকারী হবে। সাত আট বছর পর্যন্ত এভাবে চলবে।’

হজরত মাওলানা শাহ রফী উদ্দিন (রা.) বলেন, এক সময় সিরিয়া খ্রীষ্টানদের দখলে চলে যাবে ওই সময় খ্রীষ্টানদের বিবাদমান দুই দলের মধ্যে সন্ধি স্থাপন হবে। অবশিষ্ট মুসলমানরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করবে। খ্রীষ্টানদের আধিপত্য খাইবার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এ সময় মুসলমানরা ইমাম মাহদী (আ.) খোঁজ করতে থাকবেন শত্রুদের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য। ইমাম মাহদী এই সময়ে মদীনায় অবস্থানরত থাকবেন। এই সময় অনেকেই নিজেকে ইমাম মাহদী দাবী করে বসবে। 

একদিন রুকন ও বায়তুস শরীফ তওয়াফ করার সময় লোকজন তাকে চিনে ফেলবে এবং তার হাতে বায়াত গ্রহন করবে। বায়াত গ্রহন করার সময় ইমাম মাহদীর বয়স হবে ৪০ বছর। তার খেলাফত গ্রহনের সংবাদ মদীনায় পৌছলে সেখান থেকে হাজার হাজার সৈন্য মক্কায় ছুটে আসবে। ইয়েমেন, সিরিয়া আর ইরাকের বুজূর্গদ্বীন তার নেতৃত্বে এক হয়ে বিরাট সৈন্যবাহিনী গঠন করবে। এরপর তিনি কাবা শরীফের মাটির নীচে রক্ষিত রত্নভান্ডার তুলে এনে মুসলমানদের মধ্যে বন্টন করে দেবেন।

দাজ্জালের আবির্ভাব:

দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ কিয়ামতের অন্যতম লক্ষণ। আরবি ভাষায় দাজ্জাল মানে হল প্রতারনা করা। সে হবে বিধর্মী কাফির। সে বিভিন্ন রকমের আশ্চর্য শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী হবে। ইয়াহুদী সম্প্রদায় ও মহান আল্লাহ বিরোধী সম্প্রদায় তার সঙ্গে যোগ দেবে। দাজ্জালকে চেনার উপায় হল দাজ্জালের এক চোখ কানা থাকবে। তার কপালে ‘কাফির’ কথাটি খোদিত থাকবে। দাজ্জাল সত্য- মিথ্যা, হক এবং বাতিলের মধ্যে চরম প্রতারনা করবে বলেই তাকে দাজ্জাল নামে অভিহিত করা হয়েছে।

হঠাৎ করেই দুনিয়ায়তে দাজ্জালের কথা ব্যাপক ভাবে প্রচারিত হবে। তার হাতে একটি কৃত্রিম বেহেশত ও একটি কৃত্রিম দোযখ থাকবে এবং সে নিজেকে খোদা বলে দাবী করবে। এছাড়াও ক্ষমতা বলে মানুষকে মেরে ফেলে জীবিত করতে পারবে আর এসব কাজ দেখে অনেক লোক তার অনুগত হবে। কিন্তু মহান আল্লাহর ঈমানদার বান্দারা তার ঘোর বিরোধিতা করবে আর তাতে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ইমাম মাহদি তাকে শায়েস্তা করার জন্য যাত্রা করলে দাজ্জালও বহু সৈন্য সামন্ত নিয়ে যুদ্ধ যাত্রা শুরু করেবে। 
সে মক্কা মদীনা ব্যতিত পৃথিবীর সমস্ত দেশে পরিভ্রমন করবে। 

সে মদীনায় প্রবেশের চেষ্টা করবে কিন্তু সেই সময় মহান আল্লাহর আদেশে মদীনার সাতটি দরজাতেই ফেরেশতারা পাহারায় থাকবে। তাই মদীনায় ঢুকতে না পেরে বিফল হয়ে ফেরত যাবে। দাজ্জাল প্রথমে নিজেকে নবী পরে খোদা বলে দাবী করবে। পৃথিবীর অধিকাংশ জায়গা ঘুরে ঘুরে মানুষকে তার দাবীর প্রতি সমর্থন জানাতে বাধ্য করবে। 

হাদীসে উল্লেখ আছে যে, ‘দাজ্জাল যখন পথে বের হবে তখন তার সঙ্গে আগুন আর পানি থাকবে। লোকেরা যে বস্তুকে আগুন দেখবে সেটি আসলে হবে শীতল পানি আর যাকে সে পানি হিসেবে দেখবে সেটি হবে আসলে আগুন (বুখারী)।’

কনো মুসলিম তাকে খোদা বলে অস্বীকার করলে দাজ্জাল তাকে আগুনে নিক্ষেপ করবে কিন্তু আসলে সে চলে যাবে মহা শান্তির স্থানে, মানে জান্নাতে আর কেউ তাকে রব হিসেবে স্বীকার করলে তাকে সে বেহেশতে নিক্ষেপ করবে যা আসলে হবে দোযখের ভয়ংকর আগুন। দাজ্জাল কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাকে একবারই জীবন দান করতে পারবে। দাজ্জালের দৌরাত্বকাল হবে চল্লিশ দিন। চল্লিশ দিন পরে হজরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবে। (মুসলিম)

হজরত ঈসা (আ.) এর আগমন:

কেয়ামতের চল্লিশ বছর পূর্বে হজরত ঈসা (আ.) এর পৃথিবীতে আগমন ঘটবে। যখন ইমাম মাহদীর সাথে দাজ্জাল যুদ্ধ সংঘটিত হবে ঠিক ওই সময়ে হজরত ঈসা (আ.) এর আবির্ভাব হবে। হজরত ঈসা (আ.) বায়তুল মুকাদ্দাসে আসরের সময় অবতীর্ণ হবেন।
এ সম্পর্কে মাওলানা শাহ রফী উদ্দীন (রহ.) লিখেন একদিন আসরের নামজের আজান হলে লোকজন আসরের নামাজের প্রস্তুতি নিতে থাকবে। এমন সময় হজরত ঈসা (আ.) দুইজন ফেরেশতার কাধে ভর দিয়ে আকাশ থেকে অবতরণ করবেন এবং জামে মসজিদের পূর্ব মিনারে দাঁড়িয়ে সিঁড়ি দেবার জন্য ডাকতে থাকবেন। তখন সিঁড়ির ব্যবস্থা হবে তিনি সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসবেন।

মুসনাদে আহমদ গ্রন্থে হজরত ঈসা (আ.)-কে চেনার জন্য কিছু উপায় বর্ণিত আছে, তিনি মধ্যম আকৃতির ও গৌড় বর্নের হবেন। শরীরে লালচে দুইটি চাদর জড়ানো থাকবে। দেখতে তাকে এমন দেখাবে তিনি যেন এই মাত্র গোসল সম্পন্ন করে আসলেন।
এরপর তিনি নীচে নেমে ইমাম মাহদী (আ.) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। ইমাম মাহদী (আ.) অত্যন্ত আদবের সঙ্গে তাকে আসরের নামাজের ইমামতি করতে অনুরোধ করবেন। তখন হজরত ঈসা (আ.) বলবেন, ‘না, আল্লাহতালা এই সন্মান শুধু এই উন্মতকেই দান করেছেন।’
 
নামাজ শেষ করে ইমাম মাহদী, হজরত ঈসা (আ.)-কে বলবেন, হে আল্লাহর নবী, সৈন্য পরিচালনার ভার আপনার ওপর অর্পিত থাকল। আপনি নিজে ইচ্ছে মতো সাজিয়ে নিন। হজরত ঈসা (আ.) বলবেন, সৈন্যবাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব আপনাকেই পালন করতে হবে। আমি শুধু দাজ্জালকে হত্যা করতে এসেছি। কারণ তার মৃত্যু আমার হাতেই নির্ধারিত। (আলামাতে কিয়ামত)

অন্যদিকে দাজ্জাল তার বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাত্রা করবে। মুসলমানগনও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিবে। তারা দাজ্জালের মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুতি নিবে ও অগ্রসর হবে। শুরু হবে ভয়ংকর যুদ্ধ। দাজ্জাল ও হজরত ঈসা (আ.) ‘লুদ্দা’ নামক স্থানে একে অপরের মুখোমুখি হবেন। যুদ্ধে দাজ্জাল হজরত ঈসা (আ.) এর হাতে নিহত হবে এবং মুসলমানদের বিজয় সূচিত হবে।

ওই সময় মুসলমানদের হাত থেকে বাঁচার জন্য ইয়াহুদীরা রাতে কোনো গাছ বা পাথরের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করলেও সেই জড় বস্তু উচ্চস্বরে আওয়াজ দিবে এবং ওই পলাতক ইয়াহুদীকে ধরিয়ে দেবে। এরপর অল্প কিছুদিন ঈমাম মাহদী জীবিত থাকবেন। ইমাম মাহদির মৃত্যুর পর হজরত ঈসা (আ.) মুসলিম সাম্রাজ্যর অধিপতি হবেন। এরপর অনেক বছর তিনি শান্তি-শৃঙ্খলার সঙ্গে দেশ শাসন করবেন।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্নিত নবী করিম (সা.) ইশরাদ করেছেন, ‘হজরত ঈসা (আ.) অবতরনের পর চল্লিশ বছর পৃথিবীতে অবস্থান করবেন।’ ঈসা (আ.) এর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে লোকজন আবার অসৎ পথ অবলম্বন করবে এবং দেশে পাপের বন্যা প্রবাহিত হবে।’

পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে কেয়ামতের আলামত বা লক্ষণসমূহব (পর্ব- ১) প্রথম পর্বের আলোচনায় ইমাম মাহদী, দাজ্জাল , হজরত ঈসা (আ.) এর আগমন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল। 

কেয়ামতের বাকি আলামতগুলোর সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে কেয়ামতের আলামত বা লক্ষণসমূহের (পর্ব- ২) দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করা হবে।

আরো পড়ুন>>> রাসূলুল্লাহ (সা.) যেসব ইবাদত পছন্দ করতেন (পর্ব-২)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

ডেইলি-বাংলাদেশ/এম ইউ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!