রাসূলুল্লাহ (সা.) যেসব ইবাদত পছন্দ করতেন (পর্ব-২)
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) এর প্রতিটি কাজ, প্রতিটি পছন্দনীয় বিষয় উম্মতের জন্য সুন্নত। তাঁকে অনুসরণ ব্যতিত জান্নাত আশা করা যায় না।
প্রতিটি মুমিন হৃদয়ে তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও তাঁর পছন্দের বিষয়কে অনুসরণ করাই কাম্য।
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে কেউ আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করবে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।’ (সূরা আহযাব: ৭১) অন্যত্র বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর। আর নিজেদের আমল ধ্বংস করে দিও না। (সূরা মুহাম্মদ: ৩৩)
নবী কারীম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আমার সুন্নত ভালোবাসে সে অবশ্যই আমাকে ভালোবাসে। আর যে আমাকে ভালোবাসে সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে। হাদীস শরীফে আরো বর্ণীত হয়েছে, যে যাকে মুহাব্বত করবে সে তার সাথে থাকবে। (সহীহ মুসলিম)
আলোচ্য আয়াত ও হাদীসে মহান আল্লাহ তাআলা স্বীয় ভালোবাসার মাপকাঠি বলে দিয়েছেন। কেউ যদি পরম প্রভুর ভালোবাসার দাবী করে, তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লমের অনুসরণের মাঝ দিয়েই চলা উচিত। কারণ যারা নবীর অনুসরণ করবে না তাদের ব্যাপারে হাদীসে বলা হয়েছে, ‘যে আমার সুন্নত থেকে বিমুখ হলো, সে আমার লোক নয়।’ (সহীহ মুসলিম)।
নবী (সা.) এর সুন্নতের প্রতি গুরুত্ব রেখেই আমরা নবী (সা.) প্রতিটি পছন্দনীয় বিষয় ধারাবাহিক তুলে ধরার চেষ্টা করছি। গত পর্বের পর এ পর্বে নবী (সা.) এর আরো কিছু প্রিয় আমল ও প্রিয় ইবাদত তুলে ধরা হলো-
(৬) প্রিয় নবী (সা.) কাবামুখী হতে পছন্দ করতেন:
বারা ইবনে আযেব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলে কারীম (সা.) ১৬/১৭ মাস বাইতুল মাকদাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেন। কিন্তু তিনি পছন্দ করতেন কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়তে। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাজিল করলেন, ‘আসমানর দিকে বার বার আপনার দৃষ্টিপাত আমি লক্ষ্য করছি। সুতরাং তিনি কাবা মুখী হলেন। ফলে ইহুদীরা বলতে লাগলেন, ‘কী কারণে তারা তাদের পূর্বের কিবলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল? আপনি বলুন, পূর্ব পশ্চিম সবই আল্লাহর, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে সরল সঠিক পথ দেখান। (সূরা বাকারা: ১৪২)
অপর এক হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, নবীজী (সা.) যখন মদীনায় হিজরত করেন, তখন মদিনার অধিবাসী অধিকাংশই ছিল ইহুদী। যারা বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলা মানত। আল্লাহ নবী (সা.)-কে বাইতুল মুকাদ্দাসকে কিবলা বানানোর নির্দেশ দিলেন। এতে ইহুদীরা খুশি হলো। নবীজী (সা.) ১৭ মাস সেটাকে কিবলা মানলেন। তবে নবী করীম (সা.) ইব্রাহিম (আ.) এর কিবলাকে পছন্দ করতেন। তাই তিনি আল্লাহর কাছে এ ব্যাপারে প্রার্থনা করতেন ও আসমানের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। অতপর ওপরের আয়াতটি নাজিল হয়। আল্লাহর রাব্বুল আলামীনও তার প্রিয় বন্ধুর পছন্দকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তাহলে আমাদের পক্ষে কী এটা আরো বেশি প্রয়োজন নয়?
(৭) রাসুলুল্লাহ (সা.) কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী বান্দা হওয়া ভালোবাসতেন:
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) রাতের বেলা দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন। নামাজরত অবস্থায় তাঁর পা মোবারক ফেটে যাওয়ার উপক্রম হতো। অত:পর আয়েশা (রা.) বলেন, হে আল্লাহর নবী! আপনার অতীত এবং ভবিষ্যতের সকল অপরাধ মহান আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। এরপরও আপনি এত কষ্ট কেন করেন? উত্তরে প্রিয় নবী (সা.) বললেন, কৃতজ্ঞতাশীল বান্দা হওয়া আমি কি পছন্দ করবো না? (বুখারি)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর তবে গুণে শেষ করতে পারবে না, নিশ্চয় মানুষ অত্যন্ত অন্যায়কারী, অকৃতজ্ঞ।’ (সূরা ইব্রাহিম: ২৪)
কাজেই অধিকতর ইবাদত এবং নফল ইবদাত, নফল নামাজ এগুলো প্রশংসিত কাজসমূহের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো এমন বিষয় যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ও তাঁর নৈকট্য অর্জন করা যায়। আর পরকালে তার কৃপার আকাঙ্খা করা এবং জান্নাতে উচ্চস্থান লাভেল আশা পোষণ করা যায়। এ ব্যাপারে হাদীসে কুদসীতে মহান আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার যতো নৈকট্য অর্জন করতে পারে তা অন্য কোনো ইবাদতের মাধ্যমে হয় না। আর যে বান্দা আমার নৈকট্য অর্জন করে আমি তাকে ভালোবাসি। আর যাকে আমি ভালোবাসি তার শোনার জন্য কান, দেখার জন্য চোখ, ধরার জন্য হাত , চলাফেরার জন্য পা আমিই হয়ে যাই। আর সে আমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করলে তাকে আশ্রয় দেই। (সহিব বুখারি)
(৮) রাসুলুল্লাহ (সা.) পরকালকে পছন্দ করতেন:
হজরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) মুচকি হাসি দিলেন, এমন সময়ে যে তিনি একটি খোলা মাদুরের ওপর আরাম করছিলেন। তার মাথার নিচে আঁশ প্রবিষ্ট চামড়ার একটি বালিশ ছিল এবং তার পায়ের নিচে বালু ছিল। তিনি যখন নিদ্রা থেকে জাগ্রত হলেন আমি তার পায়ে মাদুরের দাগ দেখতে পেলাম এবং কাঁদতে লাগলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কাঁদছ কেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! নিশ্চয় পারস্য ও রোম সম্রাটগণ কতো জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে দিন কাটায় আর আপনি আল্লাহর নবী হয়ে কতো কষ্টের জীবন যাপন করছেন। অতপর নবীজী (সা.) বললেন, হে ওমর! তুমি কি এ কথায় সন্তুষ্ট নও, যে তাদের জন্য রয়েছ দুনিয়া ও আমাদের জন্য আখিরাত। (সহীহ বুখারি)
রাসূল (সা.) ছিলেন দুনিয়ার সকল মানুষ থেকে বেশি সচেতন পরহেজগার। তিনি যদি ইচ্ছা করতেন তবে সকল মানুষ থেকে বড় ধনী হতে পারতেন। কেননা, তিনি জানতেন অস্থায়ী এ দুনিয়া স্থায়ী পরকালের মোকাবেলায় খুবই তুচ্ছ। এ জন্যই তিনি উম্মতের জন্য এ দুনিয়া পছন্দ করেননি। এ জন্যই তিনি দুনিয়া থেকে নিরুৎসাহী করতেন এবং উম্মতের জন্য দুনিয়াকে ভয় করতেন এবং পরকালের প্রতি তাদের আগ্রহ সৃষ্টি করতেন।
(৯) রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট রোজার জন্য শাবান মাস বেশি প্রিয় ছিল:
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন, নফল রোজা রাখার জন্য নবীজী (সা.) শাবান মাসকে বেশি ভালোবাসতেন। তিনি আরো বলেন যে, নবীজী রমজান মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে পূর্ণ মাস রোজা রাখতনে না। আর রমজান ছাড়া শাবান মাস ব্যতীত অন্য মাসে এতো বেশি রোজা রাখতেন না। (মুসনাদে আহমদ)
শাবান মাসে নবীজী (সা.) বেশি রোজা রাখার হিকমত সম্পর্কে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতি মাসে তিন দিনের রোজা অথবা ভ্রমণ বা অন্য কোনো কারণে রোজা ছুটে গেলে পরে তিনি তা শাবানের মধ্যে কাযা করে নিতেন। আর কেউ বলেন, রমজান শরীফের সম্মানার্থে শাবান মাসে বেশি রাখতেন যা রমজানের কারণে ছুটে গিয়েছিল।
(১০) রাসূলুল্লাহ (সা.) রোজা অবস্থায় আমলনামা পেশ করতে ভালোবাসতেন:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, সোম ও বৃহস্পতিবার মানুষের আমলগুলো আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। আর আমার আমলগুলো রোজা অবস্থায় আল্লাহর দরবারে পেশ হোক আমি পছন্দ করি। (সুনানে তিরিমিযি: ৫৯৬)
হজরত উসামা বিন যায়েদ (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বললাম, হে আল্লাহর নবী! কেন আপনাকে প্রায় মাসে রোজা রাখতে দেখি? আপনি কি শাবানের রোজা রাখেন না? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, এটা এমন মাস যে মাসে মানুষ অলস থাকে (রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী মাস)। এটা এমন এক মাস যে মাসে মানুষের আমলসমূহ আল্লাহর নিকট উঠানো হয়। আর আমার আমলগুলো রোজা অবস্থায় উঠুক এটা আমি ভালোবাসি।
আবু ইয়ালা আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি এটা ভালোবাসি যে আমার মৃত্যু আসুক এমতাবস্থায় যে আমি রোজাদার।
(১১) নবী করীম (সা.) আল্লাহর জিকির ভালোবাসতেন:
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরাশাদ করেন, ওই সকল কওমের সঙ্গে বসো যারা ফজরের নামাজের পর থেকে সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর যিকির করে। এটা আমার কাছে ইসমাঈল (আ.) এর চারটি বংশের গোলাম আযাদ করা থেকে বেশি প্রিয়। আর যারা আসর নামাজ থেকে মাগরিব পর্যন্ত আল্লাহর স্মরণ করে তাদের সাথে বসা চারটি গোলাম আযাদ করা থেকে আমার কাছে বেশি প্রিয়। (সুনানে আবু দাউদ: ৩১১৪)
রাসূলুল্লাহ (সা.) ফজর থেকে সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত জিকিরকারীদের সঙ্গে বসা চারটি গোলাম মুক্ত করা থেকেও উত্তম মনে করতেন। এমনিভাবে আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত বসাও তার নিকট অধিক প্রিয়। এ কাজ মহান আল্লাহও ভালোবাসেন। অতএব, জিকির আল্লাহ তায়ালার নিকট বেশি প্রিয় আমল। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলার নিকট তোমার ওই আমল বেশি প্রিয় যে (আমলে) তোমার জিহ্বা ভিজা থাকে। (জামে ছগীর)।
নিশ্চয় জিহ্বা চলাচল মানে সে সবসময় জিকির করে। আর নবীজী (সা.) সবসময় মহান আল্লাহর যিকির করতেন। এতএব তিনি জাগ্রত ও ঘুমন্ত এবং সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর জিকির করতেন। আর মহান আল্লাহর জিকির তার সকল শ্বাস প্রশ্বাসের চালু থাকতো। দাঁড়ানো, বসা ও পাঁজরের ওপর শোয়া অবস্থায়, পায়ে চলা, বাহনের ওপর চলা, সফর অবস্থায়, সফর থেকে ফেরার সময়, অবস্থাকালে বের হতে, প্রবেশ করতে, জাগ্রত ও ঘুমন্ত অবস্থায়, সকাল বিকাল খাওয়ার সময়, পান করার সময় তিনি জিকির করতেন।
কাপড় পরার সময় ও খোলার সময়, কারো সঙ্গে দেখা ও শোনার সময়, সুস্থ, অসুস্থ সব অবস্থায়। চিন্তা ও পেরেশানীর সময়ে, বিপদে-মুসবিতের সময় ইত্যাদি অবস্থায় তথা সব সময় মহান আল্লাহর জিকির করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবী (সা.) সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করতেন। আর তা সকল উম্মতের জন্য সুন্নত করে দিয়েছেন। সহীহ (বুখারি)।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।
আরো পড়ুন>>> রাসূলুল্লাহ (সা.) যেসব ইবাদত পছন্দ করতেন (পর্ব-১)
আরো পড়ুন>>>সূরা কাহাফ: তাৎপর্য এবং ফজিলত
ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে