ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

[ স্পটলাইট ]

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তর্জন-গর্জন, মাঠপর্যায়ে স্থবিরতা

বায়েজীদ মুন্সী বায়েজীদ মুন্সী
প্রকাশিত: ১৮:৫৫, ২২ অক্টোবর ২০২৬
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তর্জন-গর্জন, মাঠপর্যায়ে স্থবিরতা
ফাইল ছবি

মশার পিনপিনে শব্দ আর ডেঙ্গু জ্বরের আতঙ্কে কাঁপছে দেশের অলিগলি ও মহল্লা। দিন দিন হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে শয্যাসংকট; নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) বেড পাওয়া যেন লটারির টিকিটের মতোই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। অথচ প্রতিবছরের মতো এবারও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কেবল কাগজে-কলমে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, চটকদার প্রতিশ্রুতি আর ‘তর্জন-গর্জনের’ মধ্যেই বন্দি। ডেঙ্গু দমনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নানা পরিকল্পনা ও হাঁকডাক শোনা গেলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকার নিজেদের সফলতা উল্লেখ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেও পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৬ সালে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ৬ হাজার ৬০ জন এবং মারা যান ১৪ জন। ২০১৭ সালে আক্রান্ত কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৬৯ জনে, মৃত্যু হয় ৮ জনের। ২০১৮ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ১০ হাজার ১৪৮ জন এবং মৃত্যু ২৬ জনে পৌঁছায়। ২০১৯ সালে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করে; আক্রান্ত হন ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন এবং রেকর্ড ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়। ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে শনাক্ত কম হলেও আক্রান্ত হন ১ হাজার ৪০৫ জন ও মারা যান ৭ জন।

পরবর্তী বছরগুলোতে এই প্রকোপ আবারও দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২১ সালে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন এবং ১০৫ জনের মৃত্যু হয়, ২০২২ সালে আক্রান্ত ৬২ হাজার ৩৮২ জন এবং  ২৮১ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক রূপ নেয়—আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জনে এবং প্রাণ হারান ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৪ সালে ১ লাখ ৩ হাজার ৪০ জন আক্রান্তের পাশাপাশি মারা যান ৫৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে ১ লাখ ৫ হাজার ২৭৬ জন আক্রান্তের বিপরীতে মৃত্যু হয় ৫০৭ জনের।

চলতি বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০২ জনে এবং এ সময়ে মারা গেছেন ৩৬৮ জন।

পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকের ইতিহাসে চলতি বছরের সাড়ে ৯ মাসে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং মৃত্যুর দিক থেকে চতুর্থ। যেখানে বছর শেষ হতে এখনো আড়াই মাসের মতো বাকি এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন ও মারা যাচ্ছেন ৭-৮ জন, সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে সমন্বিত উদ্যোগের ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সম্প্রতি এ নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্যও দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম. এ. মুহিত। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালের তুলনায় দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও মৃত্যুর ঘটনা কিছুটা আলাদা হলেও বর্তমান সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই দাবির সঙ্গে একমত নন। তারা বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কেবল ঢাকার ৭৭টি হাসপাতাল এবং জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান তৈরি করে। কিন্তু দেশের বহু ছোট-বড় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের রোগীরা এই হিসাবের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন, ফলে বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ।

বর্ষার শুরুতেই ‘চিরুনি অভিযান’, ‘দশটায় ১০ মিনিট’, কিংবা ‘ড্রোন দিয়ে ছাদবাগান পরিদর্শনের’ মতো প্রচার-প্রচারণা চালানো হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। রাজধানীর বাসাবো, মগবাজার, মিরপুর, জুরাইন, পুরান ঢাকা এবং লালবাগের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিয়মিত মশক নিধন কর্মীদের দেখা মিলছে না। সপ্তাহে একদিন ফগিং করা হলেও তা কেবল মূল সড়কেই সীমাবদ্ধ থাকে।

জুরাইন মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, টিভি ও পত্রিকায় কোটি কোটি টাকার মশার ওষুধ ছিটানোর কথা শুনি। কিন্তু আমাদের গলিতে মশককর্মী দেখিনি। মশার কামড়ে ঘরে টেকা দায়, পরিবারের দুজন ইতোমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি।

কীটনাশক প্রয়োগ ও লার্ভা ধ্বংসের গতির তুলনায় হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী বাড়ার গতি বহুগুণ বেশি। ঢাকার প্রধান প্রধান সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলোতে এখন ঠাঁই নেই অবস্থা। বাধ্য হয়ে শয্যা না পেয়ে মেঝে, বারান্দা এমনকি সিঁড়ির কোণেও চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা।

ঢাকার একটি শীর্ষস্থানীয় সরকারি হাসপাতালের পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ রোগী ভর্তি আছেন। স্যালাইন ও প্লাটিলেটের চাহিদার পাশাপাশি আইসিইউর জন্য দৈনিক অসংখ্য আবেদন আসছে। মাঠপর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে শুধু হাসপাতালে বেড বাড়িয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ডেঙ্গু এখন আর নির্দিষ্ট কোনো ঋতুতে সীমাবদ্ধ নেই; বছরজুড়েই এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ঘটছে। বর্তমানে ডেঙ্গু ভাইরাসের একাধিক ধরন (ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪) সক্রিয় থাকায় দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্তদের জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়ছে।

অন্যদিকে, সিটি করপোরেশনের ব্যবহৃত কীটনাশকের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কীটতত্ত্ববিদরা। বারবার একই ওষুধ ব্যবহারের ফলে এডিস মশা এসব লার্ভিসাইড ও ফগিংয়ের বিরুদ্ধে সহনশীলতা (রেজিস্ট্যান্স) গড়ে তুলেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, পূর্বাভাস মডেলের মাধ্যমে পাঁচ মাস আগেই এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছিল। নভেম্বরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার সম্ভাবনা নেই। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নানা কার্যক্রম চললেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ, এডিস মশার প্রকৃত প্রজননস্থলগুলোতে যথাযথভাবে নজর দেয়া হচ্ছে না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি জনগণকেও দায়িত্ব নিতে হবে।বাসাবাড়ি ও আঙিনায় পানি জমতে না দেওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। কার্যকর ফল পেতে এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে তিনি বলেন, ২০১৯ সালের পর থেকে নির্দিষ্ট সময় পরপর ডেঙ্গু কমা বা বাড়ার স্বাভাবিক প্রবণতা আর নেই। সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা বিপুল সংখ্যক হাসপাতাল ও ক্লিনিকের খুব কম অংশই নিয়মিত সরকারি খাতায় তথ্য জমা দেয়। ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধের অংশ হিসেবে আগামী ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি শনিবার প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি পালন করা হবে।পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, মাইকিং এবং স্কাউট, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড ও স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/বিএম/একেকে
Durga Puja
স্পটলাইট জনপ্রিয় খবর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!