চাঁদপুরে ৪০০ একর কৃষিজমিতে ৫০ অবৈধ ঝিল, উচ্ছেদ অভিযান
চাঁদপুর সদর উপজেলার ইব্রাহীমপুর ইউনিয়নে প্রায় ৪০০ একর কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কেটে মাছ চাষের জন্য অন্তত ৫০টি ঝিল তৈরির অভিযোগে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মুখদ্দি ও তালতাতলী এলাকায় সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় একটি ভেকু উদ্ধার করা হয় এবং ঝিলে চাষ করা মাছ নদীতে অবমুক্ত করা হয়।
স্থানীয় জমির মালিকদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র তাদের পৈতৃক সম্পত্তিসহ কৃষিজমি দখল করে মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করেছে। এতে বাধা দিতে গিয়ে হুমকি ও মারধরের শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন তারা।
অভিযানে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রত্যয় হাশেম, জেলা বিএনপির সহসভাপতি খলিলুর রহমান গাজী ও ডি এম শাহজাহান, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহজালাল মিশন, সাধারণ সম্পাদক হযরত আলী ঢালী, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন খান আকাশসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য ও দলীয় নেতাকর্মীরা।
স্থানীয় জমির মালিক মো. নুরুল ইসলাম রাঢ়ী বলেন, ওই এলাকায় তাদের পৈতৃক সম্পত্তি রয়েছে। এসব জমিতে তার পূর্বপুরুষেরা বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করতেন। কিন্তু কিছু লোক ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে হুমকি দিয়ে জমি দখল করেছে। মাছের ঝিল তৈরির নামে ফসলি জমির মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করেছে।
আরেক জমির মালিক ইদ্রিস আলী বলেন, ইব্রাহীমপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মুখদ্দি এলাকায় তার ২২ একর পৈতৃক সম্পত্তি রয়েছে। একটি চক্র জমি দখল করে মাটি কাটতে শুরু করলে তারা বাধা দেন। এ সময় তাদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকের উদ্যোগের প্রশংসা করে ইদ্রিস আলী বলেন, এ উদ্যোগের জন্য তারা তার প্রতি কৃতজ্ঞ এবং তার জন্য দোয়া করবেন।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম এন জামিউল হিকমা বলেন, ওই চরে প্রায় ৪০০ একর জমি রয়েছে। একটি চক্র সেখানে পুকুর খনন করে আসছিল। খননকাজ বন্ধ করতে বিভিন্ন সময়ে বাধা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৪০ বার অভিযান চালিয়ে ভেকু বিনষ্ট করা হলেও চক্রটি কার্যক্রম বন্ধ করেনি। দুর্গম এলাকা হওয়ায় নদী উত্তাল থাকলে সেখানে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। এ সুযোগে তারা আবারও মাটি কাটা শুরু করে।
ইউএনও আরও বলেন, বৃহস্পতিবারের অভিযানে ঝিলের মাছ নদীতে অবমুক্ত করা হয়েছে। সরকারি আইন অনুযায়ী স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৪৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে খোঁজ চলছে। অভিযুক্তদের অনেকে স্থানীয় নন; বিভিন্ন জেলা থেকে এসে এ কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন।
সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক বলেন, একটি চক্র নদীর ওপার থেকে এসে ইব্রাহীমপুর ইউনিয়নের আবাদি জমি ও সরকারি খাসজমিতে অবৈধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এসব জমিতে স্থানীয় মানুষ চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রশাসন এর আগেও বহুবার অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু অভিযান শেষ হলে চক্রটি আবারও একই কাজ শুরু করে।
তিনি বলেন, ইউএনওর সঙ্গে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখতে গিয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেখা গেছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাবে। সরকার সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। ইব্রাহীমপুরে বিপুল পরিমাণ জমি থাকায় সেখানে পরিকল্পিতভাবে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা গেলে কৃষক ও দেশ উভয়ই উপকৃত হতে পারে।
সরকারি জমির মালিকানা ও বন্দোবস্তের বিষয়ে শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক বলেন, এসব জমির মালিক সরকার। সরকারি বিধিবিধান ও গেজেট অনুযায়ী জমি বন্দোবস্ত দিতে হবে। সদর উপজেলা প্রশাসন জমির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুসরণ করে এলাকার ভূমিহীনদের মধ্যে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করবেন বলেও জানান তিনি। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন সংসদ সদস্য।
তিনি আরও বলেন, এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় সেখানে যাতায়াত অত্যন্ত কঠিন। গত চার মাস নদী উত্তাল থাকায় প্রশাসনের পক্ষে সেখানে যাওয়া কঠিন ছিল। এ সুযোগে চক্রটি অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। জড়িত সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।