উধাও হয়ে যাচ্ছে টাওয়ারের যন্ত্রাংশ
দেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর নিরাপত্তা ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার থেকে পাওয়ার ক্যাবল, ব্যাকআপ ব্যাটারি, রিমোট রেডিও ইউনিট (আরআরইউ), বিটিএস কার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে নিয়মিত। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই চারটি মোবাইল অপারেটরের ৭ হাজার ৯৬৪ মিটার পাওয়ার ক্যাবল, ১৯৪টি আরআরইউ, ১৭০টি বিটিএস কার্ড ও ৭৫৬টি ব্যাটারি চুরি হয়েছে। গত ২০ মাসে চুরি হওয়া ক্যাবলের পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার মিটার, ব্যাটারি দুই হাজারের বেশি এবং আরআরইউ পাঁচ শতাধিক। এসব চুরির কারণে বিভিন্ন এলাকায় নেটওয়ার্ক সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে, গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়ছেন এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে অপারেটরগুলো।
দেশে বর্তমানে মোবাইল অপারেটর ও টাওয়ার কোম্পানিগুলোর যৌথ ব্যবস্থাপনায় ৪৫ হাজারের বেশি নেটওয়ার্ক টাওয়ার সচল রয়েছে। এসব টাওয়ারে স্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশই এখন চোরচক্রের লক্ষ্যবস্তু। আগে মূলত ব্যাকআপ ব্যাটারি ও পাওয়ার ক্যাবল চুরি হলেও এখন চুরি হচ্ছে নেটওয়ার্ক সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সক্রিয় যন্ত্রাংশও। ঢাকার লালবাগ, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, সাভার এবং আশপাশের নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরে এ ধরনের চুরির ঘটনা বেশি ঘটছে। গ্রামীণ এলাকায় চুরি হওয়া ব্যাটারি ভ্যান ও রিকশায় ব্যবহারের জন্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নেটওয়ার্ক যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটক। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে প্রতিষ্ঠানটির ৬ হাজার ৭৪৯ মিটার পাওয়ার ক্যাবল চুরি হয়েছে। একই সময়ে গ্রামীণফোনের ৫০৭ মিটার, রবির ৪১৭ মিটার এবং বাংলালিংকের ২৯১ মিটার ক্যাবল চুরি যায়।
ব্যাকআপ ব্যাটারি চুরির ক্ষেত্রেও এগিয়ে টেলিটক। প্রতিষ্ঠানটির ৪৫২টি ব্যাটারি চুরি হয়েছে। এ ছাড়া রবির ২৫৩টি, গ্রামীণফোনের ২৭টি এবং বাংলালিংকের ২৪টি ব্যাটারি চুরি হয়েছে। বিটিএস কার্ড চুরির ঘটনাও উদ্বেগজনক। প্রথম আট মাসে গ্রামীণফোনের ৭৫টি, রবির ৪৮টি, বাংলালিংকের ২৯টি এবং টেলিটকের ১৮টি বিটিএস কার্ড চুরি হয়েছে।
নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরির প্রভাব শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। একটি আরআরইউ বা বিটিএস কার্ড চুরি হলে সংশ্লিষ্ট টাওয়ারের আওতাধীন এলাকায় কল ড্রপ, ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়া, এমনকি পুরো নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। এতে জরুরি প্রয়োজনে ফোন করতে না পারা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল লেনদেন ব্যাহত হওয়া এবং বিভিন্ন অনলাইন সেবা ব্যবহারে সমস্যার মুখে পড়ছেন গ্রাহকরা।
বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর ব্যাকআপ ব্যাটারি না থাকলে সংশ্লিষ্ট টাওয়ার পুরোপুরি অচল হয়ে যেতে পারে। এতে ওই এলাকার গ্রাহকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল জরুরি যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিস্থিতি বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।
চুরি হওয়া যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন করতেও অপারেটরগুলোকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এসব বিশেষায়িত সরঞ্জাম স্থানীয় বাজারে সহজে পাওয়া যায় না বলে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে নতুন যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হচ্ছে। এতে মেরামত ও প্রতিস্থাপনের ব্যয় বাড়ছে, দীর্ঘায়িত হচ্ছে নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া। নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি গ্রাহক সন্তুষ্টি কমে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অপারেটরগুলোর অবস্থানের ওপরও।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব) সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় চুরি ও ভাঙচুরের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অ্যামটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় মোবাইল বিটিএস থেকে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ চুরি হচ্ছে। গত কয়েক বছরে এ ধরনের ঘটনা অনেক বেড়েছে। পাওয়ার ক্যাবল, ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জাম চুরির ফলে গ্রাহক ও অপারেটর উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চুরি হওয়া যন্ত্রাংশ স্থানীয় বাজারে সহজে পাওয়া যায় না বলে নতুন যন্ত্রাংশ বসাতে বা মেরামত করতে অনেক সময় ও অর্থ লাগে। তাতে নেটওয়ার্ক দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে এবং গ্রাহকরা যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান বলেন, আগে চোররা মূলত পাওয়ার ক্যাবল বা ব্যাকআপ ব্যাটারি লক্ষ্য করত। এখন তারা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। আরআরইউ, এসএফপি মডিউল ও বিটিএস কার্ডসহ নেটওয়ার্কের সক্রিয় যন্ত্রাংশও তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, দেশজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে রবির চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মোহাম্মদ শাহেদ আলম বলেন, আগে ঢাকার বাইরে এ ধরনের চুরির ঘটনা বেশি ঘটত। গত ২০ মাসে তা রাজধানীতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, চুরির ঘটনাগুলো আগে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় বেশি হতো। এখন অন্যান্য এলাকাতেও হচ্ছে। চুরি ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বিটিআরসি কাজ করছে।
তিনি জানান, অপারেটরগুলোর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে চুরি ঠেকাতে নিজেদের উদ্যোগে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করছে মোবাইল অপারেটরগুলোও। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সাইটে শক্তিশালী ঘেরাও, ইলেকট্রনিক ট্যাম্পার অ্যালার্ট এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তবে এসব পদক্ষেপের পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চোরচক্রগুলো সংগঠিতভাবে এসব অপরাধ চালাচ্ছে। চুরি হওয়া যন্ত্রাংশের একটি অংশ স্থানীয় ভাঙারি বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে, অন্য অংশ অন্যত্র পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে শুধু টাওয়ারের নিরাপত্তা জোরদার করেই এ সমস্যা পুরোপুরি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু মোবাইল অপারেটরগুলোর নিজস্ব উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও বিটিআরসির সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। চোরচক্র শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা, চুরি হওয়া যন্ত্রাংশের অবৈধ বেচাকেনা বন্ধ এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা জরুরি। তা না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
মোবাইল নেটওয়ার্ক এখন আর শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়; এটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ব্যাংকিং, ই-কমার্স, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে সরকারি সেবার বড় একটি অংশ এ নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। ফলে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর নিরাপত্তাহীনতা শুধু অপারেটরগুলোর আর্থিক ক্ষতির কারণ নয়, দেশের ডিজিটাল অগ্রগতির জন্যও বড় বাধা।
সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে নেটওয়ার্ক সেবার বিঘ্ন, গ্রাহক ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তাই চুরি প্রতিরোধ, অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।