গণপূর্তের বদলি বাণিজ্য বন্ধে নতুন উদ্যোগ
দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, বদলি বাণিজ্য ও সিন্ডিকেটের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে সমালোচিত গণপূর্ত অধিদপ্তর। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের আবাসনসামগ্রী কেনাকাটায় ‘বালিশ-কাণ্ড’সহ বিভিন্ন বিতর্ক প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ও বদলি ঘিরে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও ছিল দীর্ঘদিনের। এমন পরিস্থিতিতে অনিয়মের সুযোগ কমিয়ে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে লটারির মাধ্যমে কর্মকর্তা বদলি ও পদায়নের উদ্যোগ নিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১৫৫ জন নির্বাহী প্রকৌশলীর লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে লটারির মাধ্যমে কর্মকর্তাদের পদায়ন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এবং প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলীদের আগে বিভিন্ন পর্যায়ের আরও ১ হাজার ২৭৫ জন কর্মকর্তাকে লটারির মাধ্যমে পদায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ৩০ জুলাই ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলী, আগস্টে আরও ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী এবং গত ১৬ আগস্ট ২১৯ জন সহকারী প্রকৌশলী ও ১৯০ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে বিভিন্ন জোনে পদায়ন করা হয়। সর্বশেষ ১৫৫ জন নির্বাহী প্রকৌশলীকে অন্তর্ভুক্ত করায় এ পর্যন্ত লটারির আওতায় আসা কর্মকর্তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৩০ জনে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, অধিদপ্তরকে আধুনিক, সুশাসিত ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যেই স্বচ্ছ বদলি-পদায়ন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বদলি-পদায়ন নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ এবং সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট দূর করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, লটারির মাধ্যমে পদায়ন হলে প্রকৌশলীরা সমান সুযোগ পাবেন এবং কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমবে। এর ইতিবাচক প্রভাব মাঠপর্যায়ে অবকাঠামো উন্নয়নকাজের গুণগত মানেও পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধান প্রকৌশলী আরও বলেন, রূপপুরসহ বড় প্রকল্পগুলো ঘিরে অতীতে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে অধিদপ্তরকে গতিশীল ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই তাঁদের লক্ষ্য। তবে কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পদায়নের ক্ষেত্রে মানবিক বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা হবে।
অনুষ্ঠানে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, বদলি বাণিজ্য বন্ধ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং কর্মকর্তাদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত স্থানে পদায়ন করতে চায় সরকার।
মন্ত্রী বলেন, রূপপুর প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অধিদপ্তরকে স্বচ্ছ, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য সরকার কাজ করছে।
তবে লটারির পাশাপাশি মানবিক বিবেচনায় আবেদনের সুযোগও রাখা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। কোনো কর্মকর্তার বিশেষ পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সংকট থাকলে তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে পারবেন। বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা হবে। অন্যদিকে, কৌশলগত ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও সংসদ সচিবালয়সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে আপাতত লটারির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
বদলি-পদায়নের পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সরকারি আবাসন বরাদ্দেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী জানান, সরকারি জমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং অবৈধ দখল ঠেকাতে সমন্বিত ল্যান্ড ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি আবাসন বরাদ্দে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি চলছে।
মন্ত্রী জানান, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই ডিজিটাল আবাসন বরাদ্দব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের কার্যক্রমে এ ধরনের ব্যবস্থা চালুর পর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কার্যক্রমেও অনুরূপ আধুনিক পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, আগের ধাপগুলোতে লটারির মাধ্যমে পদায়ন কার্যক্রম প্রশংসিত হয়েছে। এর ফলে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে সচিবালয় স্থানান্তর ও নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা সম্পর্কেও তথ্য দেওয়া হয়। মন্ত্রী জানান, রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সমন্বিত সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। এ জন্য প্রায় ৩০ থেকে ৩২ লাখ বর্গফুট আয়তনের আধুনিক ভবন নির্মাণের ধারণাগত পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে বর্তমান মেয়াদেই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। নতুন সচিবালয় নির্মিত হলে বিদ্যমান ভবনগুলোর স্থানসংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে বদলি বাণিজ্য ও সিন্ডিকেটের প্রভাব কমাতে লটারিভিত্তিক পদায়ন ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু লটারির মাধ্যমে পদায়ন করলেই সুশাসন নিশ্চিত হবে না; কর্মকর্তাদের দক্ষতা, সততা, অতীত কর্মসম্পাদন এবং পদায়ন-পরবর্তী জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের বদলি বাণিজ্য বন্ধে লটারির মাধ্যমে পদায়ন ইতিবাচক সূচনা। তবে কর্মকর্তাদের যোগ্যতা যাচাই, অতীত কর্মসম্পাদনের রেকর্ড প্রকাশ এবং মানবিক বিবেচনায় করা আবেদন নিষ্পত্তিতে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি। রূপপুরসহ বড় প্রকল্পে অতীতে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি ঠেকানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সরকারি দপ্তরে দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ও বদলি বাণিজ্য বন্ধে লটারিভিত্তিক পদায়ন প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এর পাশাপাশি পদায়নের পর কর্মকর্তাদের কাজের তদারকি এবং কর্মসম্পাদন মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণে একটি নিরপেক্ষ মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে।
সাবেক সচিব ও প্রশাসনিক বিশ্লেষক এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারও উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষ পদায়ন সৎ ও দক্ষ প্রকৌশলীদের মধ্যে আস্থা বাড়াতে পারে। তবে কর্মকর্তাদের অতীত কর্মসম্পাদন, দক্ষতা ও সততার মূল্যায়ন যুক্ত করা হলে প্রক্রিয়াটি আরও কার্যকর হবে।
সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি ও সাবেক সচিব ড. আকবর আলী খানের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ফেরাতে লটারি একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতি। তবে ল্যান্ড ব্যাংক ও অনলাইন আবাসন বরাদ্দব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে পুরোনো অনিয়মের চক্র আবারও সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরে লটারির মাধ্যমে পদায়নের এই উদ্যোগ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে পদায়ন-পরবর্তী তদারকি, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ওপর। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি নিশ্চিত করা গেলে অধিদপ্তরের প্রতি জনআস্থা পুনরুদ্ধার এবং উন্নয়নকাজে জবাবদিহি বাড়ানোর পথ তৈরি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. ওবায়দুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলমসহ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।