ঢাকা,  মঙ্গলবার   ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

[ স্পটলাইট ]

শাওমি থেকে আইফোন, গ্রে মার্কেটে পাওয়া যায় সব ফোন

সাইফুল ইসলাম শান্ত সাইফুল ইসলাম শান্ত
প্রকাশিত: ১৬:১৩, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
শাওমি থেকে আইফোন, গ্রে মার্কেটে পাওয়া যায় সব ফোন
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

চীনা মোবাইল ব্যান্ড শাওমি, ভিভো, অপো, ওয়ানপ্লাস কিংবা অ্যাপলের আইফোন—অনানুষ্ঠানিক আমদানির মাধ্যমে দেশের মোবাইল ফোনের বাজারে প্রায় সব জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের স্মার্টফোনই পাওয়া যাচ্ছে। তুলনামূলক কম দাম এবং নতুন মডেল দ্রুত হাতে পাওয়ার কারণে গ্রাহকদের একটি অংশকে এই বাজারের দিকে টানছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রে মার্কেটের বিস্তার ঠেকাতে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি। 

দেশের মোবাইল ফোনের গ্রে মার্কেটের আকার নিয়ে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে স্থানীয় মোবাইল ফোন নির্মাতাদের সংগঠন অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলকে দেশের মোট হ্যান্ডসেট বাজারের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ বলে দাবি করেছিল। ২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে গ্রে মার্কেটের অংশ ৪০ শতাংশের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়। আর ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যের ভিত্তিতে স্মার্টফোন বাজারের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ এই চ্যানেলের দখলে থাকার কথা বলা হয়। 

গ্রে মার্কেটের ফোন বলতে সাধারণত এমন ফোনকে বোঝায়, যেগুলো প্রস্তুতকারক বা অনুমোদিত পরিবেশকের নির্ধারিত স্থানীয় বিক্রয় চ্যানেলের বাইরে দেশে আসে। এর সব ফোন নকল নয়। অনেক ফোন বিদেশে বৈধভাবে বিক্রি হওয়া আসল ফোন, যা বাংলাদেশে আনা হয়েছে অনুমোদিত আমদানি প্রক্রিয়া ও প্রযোজ্য কর না দিয়ে। আবার চোরাই, নকল বা পরিবর্তিত আইএমইআইযুক্ত ফোনও দেশে প্রবেশ করছে। 

গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজারে চীনা ব্যান্ড শাওমির অবস্থান ছিল বেশ শক্তিশালী। ওই বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশের স্মার্টফোন বাজারের ২৮.৮ শতাংশ দখল করে প্রথমবারের মতো শীর্ষে ওঠে চীনা এই ব্যান্ড। ২০২৩ সালে বাজারে বড় ধরনের সংকোচন দেখা যায়। কাউন্টারপয়েন্টের ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের স্মার্টফোন সরবরাহ আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ কমেছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, টাকার অবমূল্যায়ন, ভ্যাট বৃদ্ধি এবং আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা বাজারকে প্রভাবিত করে। ওই বছর চীনের আরেক ব্যান্ড ভিভো ১৬.১ শতাংশ বাজার হিস্যা নিয়ে শীর্ষে উঠে আসে, আর শাওমি নেমে যায় পঞ্চম স্থানে। এরপর ২০২৪ সালে গ্রে মার্কেট নিয়ন্ত্রণের দাবি আরও জোরালো হয়। স্থানীয় মোবাইল ফোন নির্মাতারা বিটিআরসিকে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) কার্যকর করার আহ্বান জানান। তাদের বক্তব্য ছিল, কর না দিয়ে আমদানি করা ফোন স্থানীয় উৎপাদক ও বৈধ আমদানিকারকদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। তখন সম্পূর্ণ মোবাইল ফোন আমদানিতে সম্মিলিত শুল্ক-কর ছিল প্রায় ৫৮ শতাংশ। 

২০২৫ সালে সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়। বিটিআরসির তথ্যমতে ওই বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশে হ্যান্ডসেট উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমে ৫৪ লাখ ৭৬ হাজার ইউনিটে নেমে আসে। এর মধ্যে ৪জি স্মার্টফোন উৎপাদন কমে ১৯ লাখ ১১ হাজার ইউনিটে দাঁড়ায়। গ্রে মার্কেটের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ ও ডলারের বিপরীতে টাকার দুর্বলতাকেও এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আমদানি করা ফোনের তুলনায় অনানুষ্ঠানিক বাজারে অনেক ডিভাইস উল্লেখযোগ্যভাবে কম দামে বিক্রি হচ্ছে। উচ্চ কর, ডলারসংকট ও বৈধ আমদানির ব্যয়কে এর অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। 

এ বিষয়ে শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি জেনারেল ম্যনেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে স্মার্টফোনের ওপর বিদ্যমান ভ্যাট কাঠামো এই পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এই সংকট মোকাবিলায় নীতিগত পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ইতোমধ্যে দেশটিতে স্মার্টফোনের ওপর জিএসটি ১৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১২ শতাংশ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে তা আরও কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে ৪ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাটের বিভিন্ন হার বিদ্যমান রয়েছে। এছাড়া, উৎপাদন ও সরবরাহের বিভিন্ন পর্যায়ে মূল্য সংযোজনের ওপরও ভ্যাট প্রযোজ্য হওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় আরও বৃদ্ধি পায়।

গ্রে মার্কেটের আলোচনায় আইফোন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাপলের নতুন মডেল আন্তর্জাতিক বাজারে আসার পর দেশে অনুমোদিত বিক্রয়ব্যবস্থার বাইরে দ্রুত গ্রে মার্কেটে পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে আইফোন ১৭ সিরিজের আনুষ্ঠানিক স্থানীয় উন্মোচন না হলেও বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক, টোকিও স্কয়ার ও শাহ আলী প্লাজার মতো বাজারে ফোনগুলো পাওয়া যাচ্ছিল। অ্যাপল গত ৯ সেপ্টেম্বর আইফোন ১৮ প্রো এবং প্রো ম্যাক্সর ঘোষণা করে এবং ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী বিক্রি শুরু হয়। এর পরপরই দেশের গ্রে মার্কেটে আইফোন ১৮ সিরিজের ফোনগুলো পাওয়া যাচ্ছে। 

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার সক্রিয় আইফোনের মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ ৫০ হাজার বৈধভাবে আমদানি হয়নি বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্যামসাং-এর ক্ষেত্রেও অননুমোদিত ফোনের সংখ্যা বিপুল। দেশে ব্যবহৃত প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ স্যামসাং ফোনের মধ্যে ১ কোটি ৪৯ লাখ কর পরিশোধ না করে বা অননুমোদিত চ্যানেলে দেশে এসেছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু আইফোন বা স্যামসাং নয়, চীনা ব্যান্ড শাওমি, ভিভো, অপো, রিয়েলমি, ওয়ানপ্লাস, গুগল পিক্সেলসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি সংস্করণের ফোনও গ্রে মার্কেটের বিক্রেতাদের কাছে পাওয়া যায়। এসব ফোনের কিছু মডেল স্থানীয় বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রিও হয় না। ফলে নির্দিষ্ট কনফিগারেশন, রং কিংবা নতুন মডেল দ্রুত পাওয়ার জন্য ক্রেতারা অনানুষ্ঠানিক বাজারে যায়। দামের পার্থক্য এ বাজারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। বৈধ আমদানির কর, পরিবেশক ও বিক্রয়োত্তর সেবার ব্যয় যুক্ত হওয়ায় অনুমোদিত চ্যানেলে ফোনের দাম বেশি হয়। অন্যদিকে, কর পরিশোধ না করে আনা ফোন কম দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে প্রিমিয়াম ফোনের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান বেশ বড়।  

এ বিষয়ে জিয়াউদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমাদের ব্র্যান্ডের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা, জনপ্রিয়তা এবং স্মার্টফোনের ব্যাপক চাহিদার প্রতিফলন আনঅফিশিয়াল বা গ্রে মার্কেটেও দেখা যেতে পারে। তবে, গ্রে মার্কেটে কোনো ব্র্যান্ডের ফোনের মোট সংখ্যা বেশি হওয়া এবং বাজারে সেই ব্র্যান্ডের আনুপাতিক অংশ বেশি হওয়া এক বিষয় নয়। অফিশিয়াল বাজারে শাওমির মোট বিক্রির তুলনায় আনঅফিশিয়াল মার্কেটে বিক্রির অনুপাত অনেক কম। শাওমির স্মার্টফোন পোর্টফোলিও অত্যন্ত সমৃদ্ধ, যেখানে বিভিন্ন সেগমেন্টে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি ও আকর্ষণীয় ফিচারের সমন্বয়। বিশেষ করে, প্রিমিয়াম সেগমেন্টের স্মার্টফোনগুলোতে শিল্পমানের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও উন্নত ফিচার থাকায় সেগুলোর প্রতি গ্রে মার্কেটের আগ্রহ তৈরি হতে পারে। 

তিনি আরো বলেন, প্রিমিয়াম স্মার্টফোন আনুষ্ঠানিকভাবে আমদানির ক্ষেত্রে আমাদের প্রায় ৬১.৮০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। যা এসব ফোনের খুচরা মূল্য বাড়িয়ে দেয় এবং আনঅফিশিয়াল বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করাকে কঠিন করে তোলে। ফলে, এই সেগমেন্টে আনুষ্ঠানিক আমদানি বাণিজ্যিকভাবে চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে এবং আমদানির পরিমাণ সীমিত থাকে। এসব কারণে আনঅফিশিয়াল বাজারে শাওমির প্রিমিয়াম স্মার্টফোনের তুলনামূলক বেশি উপস্থিতি দেখা যেতে পারে। 

অবৈধ ও অননুমোদিত ফোন শনাক্ত করতে বিটিআরসি ২০২১ সালেই এনইআইআর উদ্যোগ নেয়। এ ব্যবস্থায় প্রতিটি ফোনের ১৫ সংখ্যার আন্তর্জাতিক মোবাইল সরঞ্জাম পরিচিতি নম্বর বা আইএমইআই যাচাই করে ডিভাইসের বৈধতা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় অননুমোদিত ফোনের ব্যবহার ঠেকানো যায়নি। বিটিআরসি এখন দুই ধাপে এনইআইআর চালুন সিদ্ধন্ত নিয়েছে। প্রথম ধাপ শুরু হবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি। এ ধাপে ব্যবস্থাটির মূল নকশায় থাকা প্রায় সব সুবিধা চালু থাকবে। তবে হ্যান্ডসেটের মালিকানা পরিবর্তন বা ডি-রেজিস্ট্রেশনের সুবিধা থাকবে না। আর দ্বিতীয় ধাপে ডি-রেজিস্ট্রেশন সুবিধাটি চালু করা হবে।

গ্রে মার্কেট নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান বা ফোন বন্ধ করার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। দেশের বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফোনের চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদাকে বৈধ আমদানি, ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও নির্ভরযোগ্য বিক্রয়োত্তর সেবার আওতায় আনা গেলে একদিকে সরকার রাজস্ব পাবে, অন্যদিকে ক্রেতারাও নিরাপদে ফোন কিনতে পারবেন। গ্রে মার্কেটের বিস্তার কমানোর কার্যকর পথ হলো এমন বাজার তৈরি করা, যেখানে বৈধ ফোনের দাম ক্রেতার নাগালে থাকবে এবং অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের তুলনায় অনুমোদিত বিক্রেতাদের কাছ থেকে ফোন কেনার বাস্তব সুবিধা সৃষ্টি হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!