সার ডিলারশিপ নিয়োগে স্বজনপ্রীতি—কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ
সারাদেশে সারের নতুন ডিলার নিয়োগে চরম অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ব্যাপক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত ব্যবসায়ী কিংবা কৃষি উদ্যোক্তাদের বাদ দিয়ে কেবল স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি এবং অসাধু কৃষি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ক্ষমতাসীন দলীয় নেতাকর্মীদের সারের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। কোনো কোনো এলাকায় পছন্দের প্রার্থীদের নাম তালিকায় তুলতে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি সারের ডিলার নিয়োগের জন্য গত ১২ আগস্ট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সরকারের কৃষি বিভাগ। আর আবেদনের শেষ সময় ছিল ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। পরবর্তীতে আবেদনের সময়সীমা এক দফা বাড়িয়ে ১০ সেপ্টেম্বর করা হয়। সারা দেশে ৪ হাজার ৯৩১টি নতুন সার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে মোট ৪৬ হাজার ৯৫৫টি আবেদন জমা পড়ে। অর্থাৎ প্রতি ডিলারশিপের বিপরীতে গড়ে আবেদন জমা পড়ে প্রায় ১০টি। গত ১০ সেপ্টেম্বর নতুন ডিলার নিয়োগের আবেদন জমা দেওয়ার সময় শেষ হওয়ার পর থেকেই কৃষি মন্ত্রণালয়ে তদবিরকারীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। গত প্রায় এক মাসে কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি সচিবের দপ্তরের সামনে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও আবেদনকারীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, আবেদনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক সংসদ সদস্য কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি সচিবের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাদের বড় একটি অংশ নিজ নিজ এলাকার পছন্দের ব্যক্তিকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন। তদবিরকারীদের মধ্যে শুধু সংসদ সদস্যই নন, বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছেন। কেউ নিজের এলাকার প্রার্থীর পক্ষে সুপারিশ নিয়ে এসেছেন, কেউ আবেদনকারীর ব্যবসায়িক কাগজপত্র নিয়ে কথা বলেছেন। আবার কেউ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বাছাইয়ে নিজের পছন্দের ব্যক্তির নাম কীভাবে তালিকায় রাখা যায়, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় দেশের ৫৫টি জেলার সারের ডিলার চূড়ান্ত করার আদেশ তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। নতুন ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে চরম অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ব্যাপক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এবং বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)-এর নীতিমালা অনুযায়ী, ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর গুদামজাতকরণ ক্ষমতা, আর্থিক সচ্ছলতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং ট্রেড লাইসেন্সসহ নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড যাচাই করার বিধান রয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ সবের তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক পরিচয়কেই মূল যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির প্রভাবশালী সদস্যদের সরাসরি হস্তক্ষেপে অনভিজ্ঞ এবং দলীয় ক্যাডার বা স্বজনদের নামে ডিলারশিপ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রংপুরের পীরগাছায় ৯টি ইউনিয়নের জন্য ৯ জন সম্ভাব্য ডিলারের নামের তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তালিকায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার স্ত্রী সুলতানা ফেরদৌসি এবং সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজের স্ত্রী সুইটি বেগমের নাম নিয়ে স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন ওঠে। পরবর্তীতে সেই গুঞ্জন সত্যি হয়ে পীরগাছার তাম্বুলপুরের মেসার্স সামান্তা অ্যান্ড সিফা ট্রেডার্স (সুইটি বেগম) এবং অনন্তরাম এলাকার রিয়া এন্টারপ্রাইজ (সুলতানা ফেরদৌসি)-এর নাম চূড়ান্ত তালিকায় দেখা যায়। এছাড়া সাত ইউনিয়নে ১৫ থেকে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। সব মিলিয়ে এক কোটি ৩১ লাখ টাকা লেনদেনের একটি হিসাব স্থানীয় নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন। ডিলার নিয়োগের বিষয়ে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওতে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে।
এদিকে নিয়োগসংক্রান্ত তালিকার তথ্য অনুযায়ী, মেহেরপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ডিলারশিপ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসানের ভাতিজা সাবিক হাসান। তার প্রতিষ্ঠানের নাম আরএস ট্রেডার্স। সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফয়েজ মহাম্মদের ভাই এনামুল হক কুতুবপুর ইউনিয়নে আনিকা ট্রেডার্সের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন। মেহেরপুর পৌরসভায় ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুল লতিফের ছেলে তানভির আহমেদ। তার প্রতিষ্ঠানের নাম তানভির ট্রেডার্স।
এ ছাড়া আমঝুপিতে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক লিটনের ইন্দো বাংলা এন্টারপ্রাইজ এবং বুড়িপোতায় বিএনপি নেতা ফজলুর ছেলে মোহাম্মদ মামুনের মামুন ট্রেডার্স ডিলারশিপ পেয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, মামুন দীর্ঘদিন ধরে কুয়েতে প্রবাসী।
শ্যামপুরে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহিদুল ইসলামের ছেলে সাইদ হোসেন অন্তরের এআর এন্টারপ্রাইজ ডিলারশিপ পেয়েছে। বারাদিতে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক লিয়াকতের স্ত্রীর ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানের নামও তালিকায় রয়েছে। পিরোজপুরে ডিলারশিপ পেয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আতিয়ার রহমানের বিশ্বাস ট্রেডার্স।
মুজিবনগর উপজেলার দারিয়াপুরে যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা ইমরান আহমেদ প্রিন্সের পিতা ইয়াকুব আলীর ভাই ভাই অটো, মোনাখালীতে মেহেদী হাসানের কৃষক বন্ধু ট্রেডার্স, বাগোয়ানে রকিবুল ইসলামের নির্বামনি ট্রেডার্স এবং মহাজনপুরে আনোয়ার হোসেনের রানা ট্রেডার্স ডিলারশিপ পেয়েছে।
গাংনী পৌরসভায় নিয়োগ পেয়েছেন পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ইন্সারুল হক ইন্সুর স্ত্রী রুমা খাতুন। কাথুলি ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ভাইয়ের ছেলে স্বাধীন খানের স্বাধীন ট্রেডার্স তালিকায় রয়েছে। তেঁতুলবাড়িয়ায় ডিলারশিপ পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম।
এ ছাড়া কাজীপুরে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহাবদ্দিনের জেআর কাউন্টার, মটমুড়া ইউনিয়নে বিএনপির সদস্যসচিব মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলামের এনআর এন্টারপ্রাইজ এবং রায়পুরে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদাল হোসেনের স্ত্রী শান্তিয়ারা খাতুনের হক ট্রেডার্স ডিলারশিপ পেয়েছে। ষোলটাকায় ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলামের কামরুল ট্রেডার্স এবং সাহারবাটিতে বিএনপি নেতা নাঈম মোবাশ্বেরের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামও তালিকায় রয়েছে।
রাজশাহীর ৭৩টি ইউনিয়ন ও ১৪টি পৌর এলাকায় নতুন ডিলারশিপের জন্য দুই হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। এর অধিকাংশই স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আবেদনকারী বলেন, ‘শুনেছি বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে। এভাবে ডিলারশিপ দেওয়া হলে সার নিয়ে কৃষকদের যে দুর্গতি তা কোনোভাবেই কমবে না। প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মচারীও ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্র বৈধ করার শর্তে ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন।’
বগুড়ার আদমদীঘির বিএনপি নেতা মাহফুজুল হক টিকন বলেন, ‘এমপির সুপারিশ ছাড়া কেউ কারও কথা শোনেনি। সাতটি পদের প্রতিটিতেই এমপির কোটা রয়েছে বলে শুনেছি। তাহলে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের স্থান কোথায়?’ একই অভিযোগ করেন সারিয়াকান্দির বিএনপি নেতা নূর আজম বাবুও। তিনি বলেন, ‘এমপির সিদ্ধান্তের বাইরে কিছুই হয়নি।’
জাতীয় কৃষক শক্তির আহ্বায়ক সাঈদ উজ্জ্বল বলেন, “সার খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি। এই সরবরাহ ব্যবস্থা যখন দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে সাজানো হয়, তখন তার মূল্য দিতে হয় কৃষককে। কৃত্রিম সংকট, বাড়তি দাম ও ভেজাল সারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তিনি বলেন, এই নিয়োগ প্রকৃত ব্যবসায়ীদের প্রতিও চরম অবিচার। এটি বাজার অর্থনীতির নীতিবিরোধী, ন্যায়বিচারেরও পরিপন্থী। তাই অবিলম্বে দলীয় বা প্রভাবে দেওয়া সব নিয়োগ বাতিল করে স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত প্রক্রিয়ায় নতুন নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।”
এ বিষয়ে কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বলেন, “সারের ডিলার নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয় এবং জেলা ও উপজেলা মনিটরিং কমিটির সুপারিশ অনুযায়ীই তা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে কোথাও যদি রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো বা কোনো অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তদন্ত করে সেই ডিলারশিপ বাতিলসহ প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
টাকা লেনদেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে—এমন কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ে আসেনি। তবে নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ কেউ অভিযোগ করলে তা গুরুত্বের সাথে যাচাই করে দেখা হবে।”