ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

[ স্পটলাইট ]

বন্যপ্রাণী পাচারে সক্রিয় সীমান্ত সিন্ডিকেট

মো. শাহজাহান মো. শাহজাহান
প্রকাশিত: ১৭:০০, ৮ অক্টোবর ২০২৬
বন্যপ্রাণী পাচারে সক্রিয় সীমান্ত সিন্ডিকেট
ছবি সংগৃহীত

দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক সীমান্তজুড়ে বন্যপ্রাণী পাচার সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। এই চক্র স্থানীয় প্রজাতির পাশাপাশি আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের বিপন্ন প্রাণীকেও বাংলাদেশের ভূখন্ডকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে পাচার করে চলেছে। অভিযানে ধরা পড়লেও অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে মুক্ত হয়ে তারা পুনরায় একই কাজ করছে। ফলে দেশ আজ আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারের অন্যতম করিডোরে পরিণত হয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দক্ষিণ আফ্রিকা, মাদাগাস্কার, আমাজন অববাহিকা কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুর্গম বনভূমি থেকে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী আকাশ ও সমুদ্রপথে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হচ্ছে। এরপর অত্যন্ত চতুরতার সাথে বেনাপোল, যশোর, সিলেট, হিলি ও ময়নমসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে প্রতিবেশী ভারতে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহারের মূল কারণ—ভারতে ‘সাইটিস’ এবং নন-সাইটিসভুক্ত প্রাণীর আমদানি ও বাণিজ্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও আইনি ফাঁকফোকরকে কাজে লাগাচ্ছে দেশি-বিদেশি এই ভয়ংকর পাচারকারী সিন্ডিকেট। 

জানা গেছে, এই পাচার সিন্ডিকেটটি মূলত অত্যন্ত সুসংগঠিত তিন থেকে চার স্তর বিশিষ্ট কাঠামোতে পরিচালিত হয়। প্রথম স্তরে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে বন্যপ্রাণী সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক রুট বা বিমানে করে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশে পাঠায়। দ্বিতীয় স্তরে ঢাকার মিরপুর, উত্তরা এবং রাজধানীর উপকণ্ঠে বেশ কিছু ছদ্মবেশী ক্যাটেল হাউজ বা পেটেরিয়ান ফার্মের আড়ালে কাজ করে দেশীয় চক্র। অনেক সময় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ‘বাণিজ্যিক আমদানির’ অনুমতির অপব্যবহার করে বিদেশি প্রজাতির এসব প্রাণী দেশে আনা হয়। এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ হলো সীমান্ত এলাকার ‘লাইনম্যান’ ও ক্যাডার বাহিনী। যশোর, বেনাপোল, সিলেট, কুমিল্লা ও ময়নমসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তের দুই পাশে সক্রিয় এই লাইনম্যানরা প্রাণীর ওজন, আকৃতি এবং ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে পাচার ফি নির্ধারণ করে সীমান্ত পারাপার নিশ্চিত করে। সর্বশেষ স্তরে লাইনম্যানদের মাধ্যমে সীমান্ত পার হওয়ার পর প্রতিবেশী দেশের মূল ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া হয় পোষা প্রাণী বা ঔষধি উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত এসব বন্যপ্রাণী। এই আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের সাথে দেশের কিছু অসাধু রাজনৈতিক প্রভাবশালী, সীমান্ত অঞ্চলের স্থানীয় চোরাকারবারী এবং কয়েকটি পেট্রো শপের মালিক যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

একদিকে বিদেশ থেকে আনা প্রাণী ট্রানজিট হিসেবে পাচার হচ্ছে অন্যদিকে বাংলাদেশের নিজস্ব বন্যপ্রাণীও এই সিন্ডিকেটের থাবায় ক্রমাগত বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে। অপরিকল্পিত শিকার ও পাচারের কারণে বাংলাদেশ থেকে ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে ডাবল-হর্ন গন্ডার, গোলাপী মাথা হাঁস, নীলগাই, রাজশকুন এবং স্বাদুপানির কুমির। সুন্দরবন এলাকা থেকে বাঘের চামড়া, হাড় ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের ফলে জাতীয় পশু রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে চরম তীব্র হুমকির মুখে পড়েছে লজ্জাবতী বানর, এশীয় হাতি, চশমা পরা হনুমান, গুইসাপ, তক্ষক, বনরুই এবং বিভিন্ন বিরল প্রজাতির কাছিম। পাচারকারীদের লোভের আগুনে আন্তর্জাতিক বাজার ও দেশীয় বাজারে বাংলাদেশের স্থানীয় প্রাণীও চোরাই পথে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। যা দেশের পুরো পরিবেশগত ভারসাম্যকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রজাতি ভেদে পাচারের রুট ও ভৌগোলিক মানচিত্র ভিন্ন। মাদাগাস্কার ও আফ্রিকা থেকে আনা পিংক বেলিড সাইডনেক কচ্ছপ ও রিভাইজড কচ্ছপ বাংলাদেশে এনে পরবর্তীতে ভারতে পাচার করা হয়। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্ত অঞ্চল থেকে ধরা লজ্জাবতী বানর ও মেছো বিড়াল পাচার হয় ভারত ও চীনে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল থেকে বিরল প্রজাতির বনরুই ও তক্ষক উদ্ধার করে মিয়ানমার হয়ে চীন ও থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়। একইভাবে দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে বিমানে আনা মেকাও, কাকাতুয়া ও বিরল পাখি বিমানবন্দরে নামার পর স্থলসীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠানো হয়। আবার সুন্দরবন ও পার্বত্য অঞ্চলের চিতাবাঘের ছাল ও বাঘের হাড় পাচার হয় ভিয়েতনাম, লাওস ও চীনে।

সম্প্রতি পরিচালিত কয়েকটি চাঞ্চল্যকর উদ্ধার অভিযান ও কেস স্টাডি বিশ্লেষণ করলে এই সিন্ডিকেটের ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকার মিরপুরের একটি আবাসিক ভবনে অভিযান চালিয়ে ১,২০০টি বিরল প্রজাতিসহ মোট ১,৫০০টি প্রাণী উদ্ধার করা হয়। যার মধ্যে ছিল আন্তর্জাতিকভাবে বিপন্ন পিংক বেলিড সাইডনেক কচ্ছপ। মূল সমন্বয়কারীসহ ২ জনকে গ্রেফতার করা হলেও তারা তিন মাসের মধ্যে জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় পাচারকাজে যুক্ত হয়। একই বছরের জুনে কক্সবাজার সীমান্ত এলাকা থেকে ১২টি অতি-বিপন্ন প্রজাতির ডাঙ্গার কচ্ছপসহ একজনকে আটক করা হয়। আগস্টে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তে আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর দুটি লজ্জাবতী বানর উদ্ধার হলেও চোরাকারবারীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। নভেম্বর মাসে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজের ভেতরে বিশেষ বাক্সে করে আনা ৮টি বিরল মেকাও ও ৪টি বিষধর সাপসহ একজন বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। আর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেনাপোল সীমান্তে ক্যাটেল ট্রাকের আড়ালে পাচারের সময় বিপুল পরিমাণ বন্যপাখিসহ মূল ‘লাইনম্যান’-কে আটক করে র‌্যাব।

বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ইউনিটের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উদ্ধার অভিযানের সংখ্যা বাড়লেও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতের হার অত্যন্ত নগণ্য। ২০২৪ সালে মোট ২৩০টি অভিযান পরিচালনা করে ৩,১৪৫টি বন্যপ্রাণী জব্দ করা হয়, যার মধ্যে স্তন্যপায়ী ৯৮টি, পাখি ১,২৭৫টি এবং সরীসৃপ ১,৭৭৪টি। আর ২০২৫ সালে রেকর্ড ৪১৫টি অভিযানে মোট ৮,২৮১টি বন্যপ্রাণী জব্দ করা হয়—যার মধ্যে স্তন্যপায়ী ২৫৪টি, পাখি ৪,৭৩৫টি, সরীসৃপ ৩,২৯০টি এবং বিরল মাছ ২টি। তবে এত বিশাল সংখ্যক প্রাণী জব্দ হলেও দুই বছরে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে মাত্র কয়েকজনকে। আর আইনি ফাঁকফোকরে মূল হোতারা থেকে গেছে অধরা।

এসব ঘটনা নিয়ে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, অনেক সময় লাগেজ ও বিভিন্ন উপায়ে বিমানবন্দর ব্যবহার করেও ছোট ছোট বিদেশি বন্যপ্রাণী দেশে আনা বা পাচার করা হয়। পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত বেশ কিছু চিহ্নিত অপরাধীর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে। পুরো নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে চিহ্নিত করার কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে স্থায়ী নজরদারি কার্যালয় স্থাপন করা গেলে আকাশপথে চোরাচালান আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, সাইটিস কনভেনশনের আওতায় আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করা হলেও পাচারকারীরা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের অনুমতিপত্রের অপব্যবহার করে এসব প্রাণী দেশে নিয়ে আসে। পরে স্থলসীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেয়। 

সুশিল সমাজের প্রতিনিধি ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘প্রকৃতি রক্ষা ফোরাম’-এর সমন্বয়ক ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, এই সিন্ডিকেট শুধু প্রাণী হত্যা করছে না, আমাদের জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি ধ্বংস করছে। লজ্জাবতী বানর ও বিপন্ন কচ্ছপ প্রজাতিগুলো ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে বিলুপ্তপ্রায়। হালুয়াঘাটের ঘটনা দেখিয়েছে যে সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো জরুরি।

ওয়াইল্ডটিম-এর প্রধান নির্বাহী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে বেছে নিয়েছে কারণ আমাদের আইন প্রয়োগে শিথিলতা আছে। উদ্ধারকৃত বেশিরভাগ প্রাণী এদেশের আবহাওয়ার উপযোগী নয়, ফলে উদ্ধারের পর সঠিক পরিচর্যার অভাবে অনেক প্রাণী মারা যায়। এটি একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশগত অপরাধ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মনে করেন, বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন থাকলেও সেটির যথাযথ প্রয়োগের অভাবে অপরাধীরা অল্প দিনেই জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। অপরাধীদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান সুনিশ্চিত করা না গেলে এবং সীমান্তবর্তী লাইনম্যান চক্র ভেঙে না দিলে এই অপরাধ বন্সধ করা সম্ভব নয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আমাদের স্থানীয় জীববৈচিত্র্য এমনিতেই ধ্বংসের মুখে। এর ওপর যদি আন্তর্জাতিক পাচারের রুট হিসেবে দেশকে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিবেশগত ভাবমূর্তি মারাত্মক ক্ষুণ্ণ হবে। অবিলম্বে বন বিভাগ, বিজিবি, পুলিশ ও শুল্ক গোয়েন্দাদের মধ্যে একটি সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল ইসলাম ভূইয়া প্রশাসনিক শিথিলতার কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও বন বিভাগের মধ্যে আমদানির অনুমতি প্রদান নিয়ে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে। পাচারকারীরা এই সুযোগটি নেয়। সাইটিস চুক্তি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। বিদেশি প্রাণী আমদানির নামে বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে, নতুবা দেশের ভেতর বন্যপ্রাণীর নতুন নতুন ভাইরাস ও রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি থাকবে।

আইনি জটিলতা নিয়ে অ্যাডভোকেট তৌহিদ বিশ্বাস জানান, বন্যপ্রাণী আইনের মামলাগুলোকে হালকাভাবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। অপরাধীরা জামিনযোগ্য ধারার সুযোগ নিয়ে সহজেই আদালত থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। আইন সংশোধন করে বন্যপ্রাণী পাচারকে অ-জামিনযোগ্য এবং কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে, পাশাপাশি ইন্টারপোলের সাথে তথ্য আদান-প্রদান আরও বাড়াতে হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!