ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

লোকসান ও সংকটের অজুহাতে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আরও ৬ ট্রেন

মো. শাহজাহান মো. শাহজাহান
প্রকাশিত: ১৭:০৩, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
লোকসান ও সংকটের অজুহাতে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আরও ৬ ট্রেন
রেলওয়ের লোকসান বছরে গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার কোটি টাকা

লোকসান ও জনবল সংকটের কারণে আরও ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা হলে এসব ট্রেন থেকে রাজস্ব ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে টিকিট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরবে এবং কমবে টিকিট কালোবাজারি। তবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ট্রেন থেকে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় কেন একইভাবে রাজস্ব বাড়ানো যাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে-সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে তিনটি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি তিনটি ট্রেনেরও দরপত্র আহ্বান করা হবে। তবে ছয়টি ট্রেনের মধ্যে বর্তমানে দুটি বন্ধ রয়েছে। নতুন ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হলে পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে এ ধরনের ট্রেনের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৪টি। নতুন ব্যবস্থাপনায় ট্রেন পরিচালনার সময়সূচি রেল ভবন থেকে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

Advertisement

সূত্র জানায়, জনবল সংকট, অলাভজনক হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ট্রেনগুলো হলো ঝারিয়া লোকাল, নাজিরহাট লোকাল, জয়দেবপুর কমিউটার, নরসিংদী কমিউটার, সমতট মেইল এবং নারায়ণগঞ্জ মেইল। এসব ট্রেন দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লাকসাম, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। এর মধ্যে বর্তমানে নোয়াখালী ও সমতট ট্রেন দুটি বন্ধ রয়েছে। বন্ধ থাকা ট্রেন দুটি আবার চালুর পর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হবে। আর নাজিরহাট লোকাল ট্রেনটি কমিউটার ট্রেনে রূপান্তর করে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে নরসিংদী কমিউটার, নারায়ণগঞ্জ কমিউটার ও ঝারিয়া লোকাল ট্রেনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার (সিসিএম) সুজিত কুমার বিশ্বাস জানান, বিভিন্ন রুটে ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঝারিয়া, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ—এই তিনটি ট্রেনের টেন্ডার হয়েছে গত ৬ সেপ্টেম্বর। টেন্ডারসহ আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দুই মাস সময় লাগতে পারে। অপর তিনটি ট্রেনের পর্যায়ক্রমে টেন্ডার আহ্বান করা হবে। এর মধ্যে দুটি ট্রেন বন্ধ রয়েছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার প্রধান উদ্দেশ্য হলো অলাভজনক ট্রেনগুলোকে লাভজনক করা এবং যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন করা। সেক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ভাড়া থাকবে। এর বাইরে ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ থাকবে না।

রেলওয়ের আয়-ব্যয়ের চিত্র

অনুসন্ধানে বাংলাদেশ রেলওয়ের আয়-ব্যয়ের চিত্রে বিগত এক দশকে ক্রমাগত লোকসানের চিত্রই উঠে এসেছে। ২০১৬ সাল থেকে যাত্রী ভাড়া অপরিবর্তিত থাকলেও জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, বেতন-ভাতা ও পেনশন ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেলওয়ের মোট পরিচালন রাজস্ব ছিল প্রায় ১ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। সে সময় পরিচালন ব্যয় (সামাজিক সুবিধাসহ) প্রায় ৩ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ফলে নিট লোকসান ছিল ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকায়। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় বেড়ে ২ হাজার ৬৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। তবে পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকায়।

এতে অপারেটিং রেশিও উন্নত হয়ে ১ দশমিক ৯১-এ নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল ২ দশমিক ০৯। অর্থাৎ প্রতি ১ টাকা আয়ে ব্যয় হয়েছে ১ দশমিক ৯১ টাকা। পেনশন ব্যয় বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বাদ দিলে এই অনুপাত ১ দশমিক ৪৩-এ নেমে আসে। তবুও লোকসান রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা।

গত এক দশকে রেলওয়ের লোকসানের মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জনবল সংকট, ইঞ্জিন ও কোচের অপ্রতুলতা, টিকিট কালোবাজারি, বিনা টিকিটে যাত্রী ভ্রমণ এবং ভাড়া বৃদ্ধির অনুপস্থিতি। পূর্বাঞ্চলে অনুমোদিত পদের বিপরীতে জনবল সংকট প্রায় অর্ধেক। ফলে স্থানীয় ও কমিউটার ট্রেনে টিকিট পরীক্ষা ও যাত্রী ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা দেখা যায়।

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আয় বৃদ্ধি

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা আটটি ট্রেনের অভিজ্ঞতায় রাজস্ব ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মহুয়া কমিউটার ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মাত্র ৬৮ দশমিক ৫৫ লাখ টাকা আয় করলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭৮ কোটি টাকায়। জামালপুর ও দেওয়ানগঞ্জ কমিউটারেও অনুরূপ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। সামগ্রিকভাবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা ট্রেনগুলো থেকে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১৬ কোটি টাকা রাজস্ব এসেছে।

বিগত এক দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৫-২৬ পর্যন্ত রেলওয়ের আয় ধীরে ধীরে বেড়েছে, কিন্তু ব্যয় তার চেয়ে দ্রুত বেড়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় ঘাটতি ছিল এবং মোট ব্যয় আয়ের প্রায় দ্বিগুণ। পণ্য পরিবহন খাতে আয় কমেছে ইঞ্জিন সংকটের কারণে, আর যাত্রী খাতই মূল ভরসা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যাত্রী খাতে আয় বেড়েছে ২৫৬ কোটি টাকা, কিন্তু পণ্য খাতে কমেছে ৮ দশমিক ৩৪ কোটি টাকা। জমি ও অপটিক্যাল ফাইবার থেকে অতিরিক্ত আয় এলেও সামগ্রিক ঘাটতি রয়ে গেছে।

রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এ বিষয়ে বলেন, “রেলওয়েকে লোকসানের চক্র থেকে বের করে আনতে হবে। জনবল সংকট ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা দূর করতেই বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো হচ্ছে। তবে নিরাপত্তা ও মূল পরিচালনা সরকারের হাতেই থাকবে। যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন ও রাজস্ব বৃদ্ধিই আমাদের লক্ষ্য। ভাড়া বৃদ্ধি ছাড়াই আয় বাড়ানো সম্ভব—এটাই প্রমাণিত হচ্ছে।”

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, “আমরা দেখেছি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় টিকিট আদায় ও যাত্রীসেবায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়। জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় টিকিট পরীক্ষা সম্ভব হয় না। বেসরকারি অপারেটররা তাদের আয়ের স্বার্থেই কঠোরভাবে টিকিট আদায় করে। ফলে রাজস্ব বাড়ে এবং কালোবাজারি কমে। তবে আমরা নিশ্চিত করব যে ভাড়া সরকারি হারেই থাকবে এবং চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন হলে বাতিলের ক্ষমতা রেলওয়ের হাতে থাকবে।”

পরিবহন ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী বলেন, “সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা শুধু ব্যবস্থাপনাগত নয়, কাঠামোগতও। ভাড়া ২০১৬ সাল থেকে স্থির থাকলেও ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। বেসরকারি খাতকে সম্পূর্ণ হস্তান্তর না করে শুধু বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনায় দেওয়া একটি মধ্যবর্তী পদক্ষেপ। তবে স্বচ্ছ দরপত্র, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রোধ করতে না পারলে পুরনো সমস্যাই ফিরে আসবে।”

অর্থনীতিবিদ ও সাবেক পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, “রেলওয়ের লোকসান বছরে গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার কোটি টাকা। এটা রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আয় বাড়লেও মূল সমস্যা—ইঞ্জিন সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ ও পেনশন ব্যয়—সমাধান হয় না। দীর্ঘমেয়াদে রেলওয়েকে কর্পোরেট কাঠামোতে রূপান্তর এবং মালবাহী পরিবহনে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি।”

যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় টিকিট কালোবাজারি কমেছে এবং পরিচ্ছন্নতা বেড়েছে। কিন্তু অনেক সময় অতিরিক্ত চাপ বা সেবার মান নিয়ে অভিযোগ থাকে। সরকারকে নিয়মিত নজরদারি রাখতে হবে, যাতে যাত্রীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন না হয়।”

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাচ্ছে বাণিজ্যিক কার্যক্রম

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হলেও নিরাপত্তা, ইঞ্জিন ও ট্র্যাক পরিচালনা সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। শুধু টিকিট বিক্রি, যাত্রী ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা ও অনবোর্ড সেবা বেসরকারি খাতে যাবে। চুক্তি হবে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে এবং বার্ষিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ১০ শতাংশ হারে বাড়বে।

বর্তমানে পূর্বাঞ্চলে আটটি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলছে। নতুন ছয়টি যোগ হলে সংখ্যা দাঁড়াবে ১৪-এ। এই প্রক্রিয়া পশ্চিমাঞ্চলেও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আয় বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জনবল নিয়োগ, ডিজিটাল টিকিটিং জোরদার করা, পেনশন ব্যয় পৃথকভাবে বাজেটভুক্ত করা এবং ভাড়া যৌক্তিকীকরণের মতো পদক্ষেপগুলো কেন দ্রুত বাস্তবায়িত হচ্ছে না, সে প্রশ্নও উঠেছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!