ঢাকা,  সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

মাঠপর্যায়ের বিশৃঙ্খলায় আস্থার সংকটে বিএনপি

মুক্তার হোসেন মুক্তার হোসেন
প্রকাশিত: ১৩:৪৫, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মাঠপর্যায়ের বিশৃঙ্খলায় আস্থার সংকটে বিএনপি
ছবি: এআই জেনারেটেড

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠপর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর সরকার গঠনের এই প্রাথমিক সময়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যখন রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ব্যস্ত, তখন মাঠপর্যায়ের কিছু ঘটনা সরকারের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করছে।

গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে রাজধানীর মিরপুরে পুরোনো রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র মাটি কাটার যন্ত্র দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের ব্যক্তিগত কার্যালয় ও স্টুডিওতে হামলা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে জলাশয় ও স্থানীয় হাট-বাজার দখলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব ঘটনার রাজনৈতিক দায়ও এসে পড়ছে বর্তমান শাসক দলের ওপর।

Advertisement

তবে সালমান মুক্তাদিরের ঘটনায় পরবর্তী সময়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার তদন্ত ও ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ঘটনাটি মূলত একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে ঘটেছে। এর সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় নীতি বা সাংগঠনিক কোনো সিদ্ধান্তের সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

এরপরও ঘটনার প্রাথমিক ধাক্কা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও অভিযোগ জনমনে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে, তা কাটিয়ে ওঠা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে একটি গভীর আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেই তার পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় আছে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তারের কারণে কোনো হামলা বা নেতিবাচক অভিযোগের ভিডিও অল্প সময়েই লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এতে মানুষের মনে একটি ধারণা দ্রুত স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। কিন্তু পরে তদন্তের ফল, প্রকৃত ঘটনা বা পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য একইভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায় না।

এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জুলাইয়ের সহযোদ্ধা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা দেশকে এক ধরনের শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার ভাষায়, সহিংস শক্তি যদি রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে, তাহলে তা অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকে যাত্রার নামান্তর।

অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক নেতাদের ইন্ধন বন্ধ করতে না পারলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হবে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হবে না।

তবে তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে মাঠের বাইরে থাকা সাবেক শাসক দল আওয়ামী লীগও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ খুঁজছে। তাদের অতীতের দুর্নীতি ও অপরাধ থেকে জনগণের মনোযোগ সরিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্তমান সরকারের সময় জননিরাপত্তা বেশি ভঙ্গুর—এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে বলে তিনি মনে করেন। এর মাধ্যমে দলটি রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে বলেও তার বক্তব্য।

একইভাবে জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ এগারো দলীয় জোটও জনঅসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরমভাবে ভেঙে পড়েছে। শাসক দলের নেতা-কর্মীরা দখলবাজি ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে জনগণের সেবায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালে হামলা চালাচ্ছেন। তার মতে, এটি ফ্যাসিবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।

অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের অন্যতম শরিক দল গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী দেওয়ান আবদুর রশিদ এবং নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, রাজধানীতে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তারা আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসন সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার। তিনি বলেন, জমি নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে আইনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের এমন অবস্থা কেন করা হলো, তা তাদের স্তব্ধ করেছে। সরকারই তাদের ওই জায়গাটি ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিল বলেও তিনি জানান।

এই পরিস্থিতিতে বিএনপিকে একদিকে সংসদের ভেতরের শক্তিশালী বিরোধী দলগুলোর সমালোচনা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, মাঠপর্যায়ে নিজেদের নাম ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ ও অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের চাপও সামলাতে হচ্ছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক মহলে দেশের অগ্রযাত্রা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের যে রূপরেখা তুলে ধরছেন, মাঠপর্যায়ের সমন্বয়হীনতা ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা সেই উদ্যোগকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলছে। স্থানীয় পর্যায়ে কিছু নেতা-কর্মী বা অপরাধী চক্র নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে দলের নাম ও ব্যানার ব্যবহার করছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। এর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো দলকে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিন বলেন, কেউ যদি সরকার বা দলের নাম ব্যবহার করে অন্যায় করে, তাহলে আইন তার নিজস্ব গতিতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেবে। 

আইনশৃঙ্খলা লঙ্ঘন বা দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সালমান মুক্তাদিরের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগকে ঢালাও মন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট মামলা হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে দলমত নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মিরপুরের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে স্থানীয় শাহআলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিবৃতি দেওয়া বা বিচ্ছিন্ন কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে মানুষের মনে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ধারণা রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়। 

রাজনীতিতে মানুষের আস্থাই শেষ কথা। তাই অপরাধী যে দলেরই হোক, কিংবা যে রাজনৈতিক পরিচয়ই ব্যবহার করুক, তার বিরুদ্ধে দ্রুত, দৃশ্যমান, কঠোর ও পক্ষপাতহীন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়েই সরকারের প্রতি তৈরি হওয়া আস্থার সংকট কাটানোর পথ তৈরি হতে পারে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএইচ/একেকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!