ঢাকা,  সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ নারী নক্ষত্র ]
ঢা.বি'র ‘প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় প্রথম কড়া নাড়েন লীলা নাগ

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৮:০৭, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় প্রথম কড়া নাড়েন লীলা নাগ
লীলা নাগ (জন্ম: অক্টোবর ২, ১৯০০ - মৃত্যু:জুন ১১ ১৯৭০), (বিবাহের পরে নাম হয় লীলা রায়) - আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুলসংখ্যক নারী শিক্ষার্থী পড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, প্রশাসন ও নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি এখন আর বিস্ময়ের বিষয় নয়। কিন্তু সেই

১৯২৩ সালে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন লীলা নাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইতিহাসে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণাভিত্তিক সূত্র অনুযায়ী, ১৯২১ সালের প্রথম শিক্ষাবর্ষে মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র দুজন—লীলা নাগ ও সুষমা সেনগুপ্ত। লীলা ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর এবং সুষমা অর্থনীতিতে পড়াশোনা শুরু করেন।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু। নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল খুবই কম, আর নারী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল আরও বিরল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন নারীদের পড়াশোনার সুযোগ নীতিগতভাবে স্বীকার করলেও বাস্তবে নারী শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিয়ে ছিল নানা দ্বিধা। এমন এক সময়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় কড়া নাড়েন লীলা নাগ।

১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনগুলো ছিল অনেকটাই পুরুষকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল সীমিত, আর নারী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল প্রায় চোখে পড়ার মতো বিরল। 

Advertisement

বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিগত কাঠামো নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিলেও বাস্তব পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সামাজিক বাস্তবতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও নানা দ্বিধার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে নারীর উপস্থিতি তখনও ছিল ব্যতিক্রম। ঠিক এমন এক সময়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন লীলা নাগ।

  • কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে পদ্মাবতী স্বর্ণপদক পাওয়া লীলা নাগ ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার জন্য আবেদন করেন। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য স্যার পি. জে. হার্টগ শেষ পর্যন্ত তাঁর আবেদন অনুমোদন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইতিহাসেও তাঁকে ১৯২১ সালে ভর্তি হওয়া এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে লীলা একা ছিলেন না। একই সময়ে সুষমা সেনগুপ্তও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। গবেষণাভিত্তিক সূত্র অনুযায়ী, ১৯২১ সালের প্রথম শিক্ষাবর্ষে মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র দুজন—লীলা নাগ ও সুষমা সেনগুপ্ত। লীলা ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর এবং সুষমা অর্থনীতিতে পড়াশোনা শুরু করেন।

সমস্যা ছিল শুধু ভর্তি হওয়ার অনুমতি পাওয়া নয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আবাসিক ব্যবস্থা বা সাধারণ কক্ষও ছিল না। লীলা নাগের ক্লাসে থাকার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীর প্রবেশের অধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার পথটি সহজ ছিল না।

১৯২৩ সালে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন লীলা নাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইতিহাসে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু লীলা নাগের গল্প শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের গল্প নয়। উচ্চশিক্ষার দরজা নিজের জন্য খুলে নেওয়ার পর তিনি নারীশিক্ষাকে নিজের জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য করে নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিচিতিতেও তাঁকে মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে কাজ করা একজন সমাজকর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ঢাকায় একটি মেয়েদের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর কাজ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ও বিস্তৃত। গবেষণাভিত্তিক বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে কাজ করেন এবং একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে তিনি নারী আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন।

অর্থাৎ, লীলা নাগের জীবনের গল্পটি দুটি ধাপে দেখা যায়। প্রথম ধাপে তিনি নিজেই এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা পেরিয়েছিলেন, যেখানে নারী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল ব্যতিক্রম। দ্বিতীয় ধাপে সেই সুযোগকে নিজের মধ্যে আটকে না রেখে আরও বহু মেয়ের জন্য শিক্ষার পথ তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন।

লীলা নাগ ঢাকা কলেজে পড়তেন। তার এক ক্লাস উপরের ছাত্র ছিলেন সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন। লীলা নাগ সম্পর্কে তিনি তার স্মৃতিকথা নামক প্রবন্ধ সংকলনে লেখেন, এঁর মত সমাজ-সেবিকা ও মর্যাদাময়ী নারী আর দেখি নাই। এঁর থিওরী হল, নারীদেরও উপার্জনশীলা হতে হবে, নইলে কখনো তারা পুরুষের কাছে মর্যাদা পাবে না। তাই তিনি মেয়েদের রুমাল, টেবলক্লথ প্রভৃতির উপর সুন্দর নক্সা এঁকে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই সব বিক্রি করে তিনি মেয়েদের একটা উপার্জনের পন্থা উন্মুক্ত করে দেন।"

  • বাঙালি নারীদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে তিনি বিশেষ ভুমিকা পালন করেছেন। তিনি ঢাকার আরমানীটোলা বালিকা বিদ্যালয়, কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল এবং শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় (তৎকালীন নারীশিক্ষা মন্দির) প্রতিষ্ঠা করেন। বিয়ের পর তার নাম হয় শ্রীমতি লীলাবতী রায়।

আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুলসংখ্যক নারী শিক্ষার্থী পড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, প্রশাসন ও নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি এখন আর বিস্ময়ের বিষয় নয়। কিন্তু সেই দীর্ঘ পথের একেবারে শুরুর দিকে দাঁড়িয়ে থাকা নারীদের একজন ছিলেন লীলা নাগ।

তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো শুধু ‘প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট’ হওয়া নয়; বরং তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন—একটি বন্ধ দরজায় প্রথমবার কড়া নাড়ার সাহস কখনো কখনো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পুরো পথটাই খুলে দেয়।

সৌজন্য : পাবলিকিয়ান

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!