দায়িত্বশীলদের অবহেলায় মৃতপ্রায় বুড়িগঙ্গা!
একসময়ের প্রাণবন্ত, স্বচ্ছ জলে ভরা, মাছের কলরবে মুখরিত বুড়িগঙ্গা আজ দূষণের বিষাক্ত কবলে মৃতপ্রায়। ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই নদী একসময় নৌযানের চলাচল, জেলেদের জীবিকা এবং শহরের প্রাণপ্রবাহ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু কয়েক দশকের অব্যাহত অবহেলা, অবৈধ দখল, শিল্পের তরল বর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশন এবং প্লাস্টিকের পাহাড় মিলে নদীটিকে প্রায় অক্সিজেনশূন্য করে তুলেছে। সম্প্রতি হাইকোর্ট লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও ইসলামবাগ এলাকায় নদীর তীর থেকে প্লাস্টিকসহ সব ধরনের বর্জ্য ১৫ দিনের মধ্যে সরানোর স্পষ্ট নির্দেশ দিলেও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় সেই নির্দেশ কার্যত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বুড়িগঙ্গার এই মৃত্যুযাত্রার জন্য সরাসরি দায়ী সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর অবহেলা, আইনের শিথিল প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব।
নদীর বর্তমান অবস্থা সত্যিই করুণ। নৌবাহিনীর ঢাকা অঞ্চলের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীতে মোট ২২৪টি বর্জ্য নিঃসরণের উৎসমুখ চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গায় একা ১৬৬টি এবং তুরাগে ৫৮টি। এই উৎসমুখগুলোর সাথে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ঢাকা ওয়াসা, সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান জড়িত। দূষণের প্রায় ৮০ শতাংশই শিল্প ও জৈব বর্জ্য থেকে আসছে—যার মধ্যে শিল্পবর্জ্য, রং, রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর অবদান ৫৫ শতাংশ এবং জৈব বর্জ্য, প্যাথোজেন ও অ্যামোনিয়ার অবদান ২৫ শতাংশ। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা এখন ভয়াবহ পর্যায়ে। সুস্থ জলজ পরিবেশের জন্য প্রতি লিটারে অন্তত ৫ মিলিগ্রাম অক্সিজেন প্রয়োজন হলেও বুড়িগঙ্গায় গড়ে তা মাত্র ১.৭০ থেকে ২.৬৮ মিলিগ্রাম। শুষ্ক মৌসুমে কোথাও কোথাও তা শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে। ফলে মাছসহ বেশিরভাগ জলজ প্রাণী টিকে থাকতে পারছে না। নদীর তলদেশে ১০ থেকে ১৫ ফুট পুরুত্বে পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্য জমে আছে। তীরবর্তী এলাকায় প্লাস্টিকের স্তূপ পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে, যা বৃষ্টির পানির সাথে নদীতে মিশে দূষণ আরও বাড়াচ্ছে।
.png)
হাইকোর্টের নির্দেশের পরও দায়িত্বশীলদের উদাসীনতা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের হাইকোর্ট বেঞ্চ লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচরের ইসলামবাগ এলাকায় বুড়িগঙ্গার তীরে ফেলা প্লাস্টিক ও অন্য সব বর্জ্য ১৫ দিনের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দেন। আদালত নৌপরিবহন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ঢাকার জেলা প্রশাসক, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং ডিএমপি কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের স্পষ্টভাবে নির্দেশটি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার কথা বলেন। নির্দেশনা বাস্তবায়ন শেষে চার সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতেও বলা হয়। কিন্তু নির্দেশের প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ইসলামবাগ, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় প্লাস্টিকের স্তূপ, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য অপরিবর্তিত অবস্থায় পড়ে আছে। কোনো কোনো স্থানে বস্তাবন্দি করে প্লাস্টিক নদীতে ফেলা হচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন। এই উদাসীনতা প্রমাণ করে যে আদালতের নির্দেশও দায়িত্বশীলদের জাগাতে পারেনি।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু সংসদে জানিয়েছেন, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী ১৯৬টি তরল বর্জ্য উৎপাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪২টিতে ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এখনও ৫৪টি প্রতিষ্ঠানে ইটিপি নেই। তিনি বলেছেন, “নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। শূন্য তরল নিঃসরণ পরিকল্পনা ৪৬টি প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়নাধীন। ৩৪টি প্রতিষ্ঠানে মনিটরিং ক্যামেরা বসানো হয়েছে।” মন্ত্রী সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর জোর দিলেও মাঠপর্যায়ে সেই সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, “ইটিপিগুলোকে অনলাইন মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গায় পানির প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিং করছে। তবে ঘরের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে।” অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১০৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় দুই কোটি ৯২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। কিন্তু এই জরিমানা ও অভিযান নদীর অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারেনি।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “বেসরকারি কলকারখানার পাশাপাশি ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের কিছু লাইনও বর্জ্য ফেলছে। যেসব প্রতিষ্ঠান এখনও ইটিপি স্থাপন করেনি, তাদের এক মাস সময় দিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বুড়িগঙ্গার যে করুণ দশা, তাতে সেটিকে আর নদী বলতে অস্বস্তি হয়।” তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে দুটি বিশেষ টিম গঠনের কথা জানালেও বাস্তবে সেই টিমের কার্যক্রমের দৃশ্যমান ফল এখনও দেখা যায়নি।
নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা এই অবহেলাকে সরাসরি দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নদী রক্ষা আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “হাইকোর্টের নির্দেশ এসেছে, কিন্তু মাঠে কাজ নেই। প্রতিবারই নির্দেশ হয়, অভিযান হয়, তারপর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। বুড়িগঙ্গা রক্ষায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া কোনো সমাধান হবে না। প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের পর তার স্থায়ী ব্যবস্থাপনা কোথায়—এই প্রশ্ন উত্তরহীন। দায়িত্বশীলরা উদাসীন থাকলে নদী বাঁচবে না।” পরিবেশকর্মী ড. শারমিন সুলতানা বলেন, “শুধু প্লাস্টিক সরালেই হবে না। শিল্পের তরল বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য এবং অবৈধ দখল—এই তিনটি সমস্যার সমন্বিত সমাধান দরকার। ইটিপি থাকলেও অনেক সময় সেগুলো চালু রাখা হয় না। অনলাইন মনিটরিং ও কঠোর জরিমানা ছাড়া পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্যের ওপরও এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।”
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, “ঘরের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা বন্ধ করা প্রথম শর্ত। এরপর শিল্পবর্জ্য শোধন, নদীর সীমানা চিহ্নিতকরণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নিয়মিত ড্রেজিং করতে হবে। প্লাস্টিক ও দূষিত পলি অপসারণ ছাড়া নদীর নাব্যতা ও জীববৈচিত্র্য ফিরবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া অস্থায়ী অভিযান দিয়ে নদী বাঁচানো যাবে না।”
বিআইডব্লিউটিএর এক কর্মকর্তা জানান, বুড়িগঙ্গায় ৩০০-এর বেশি বর্জ্য নিঃসরণের পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযান চলছে। তবে দীর্ঘদিনের পলি ও প্লাস্টিক জমার কারণে ড্রেজিংয়েও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ওয়াসা, সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বুড়িগঙ্গার এই মৃত্যুযাত্রার জন্য সরাসরি দায়ী কারা? প্রথমত, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যারা ইটিপি ছাড়াই বা ইটিপি বন্ধ রেখে তরল বর্জ্য নদীতে ফেলছে। দ্বিতীয়ত, ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশন, যাদের পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নদীকে বিষাক্ত করেছে। তৃতীয়ত, বিআইডব্লিউটিএ ও স্থানীয় প্রশাসন, যারা অবৈধ দখল ও বর্জ্য ফেলা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। চতুর্থত, পরিবেশ অধিদপ্তর, যাদের নিয়মিত তদারকি ও আইন প্রয়োগে শিথিলতা রয়েছে। আর সবশেষে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব—যা হাইকোর্টের নির্দেশকেও অকার্যকর করে রেখেছে।
বুড়িগঙ্গা একসময় ঢাকার প্রাণ ছিল। আজ সেই নদী দূষণের কবলে পড়ে প্রায় মৃত। হাইকোর্টের নির্দেশ, সরকারের ঘোষণা, মন্ত্রীদের বক্তব্য এবং বিশেষজ্ঞদের সতর্কবাণী—সবকিছুই আছে। কিন্তু দায়িত্বশীলদের অবহেলা ও উদাসীনতায় নদীটির চিরযৌবনা রূপ আর ফিরে পাওয়া যাচ্ছে না। সময় এখনই। সমন্বিত পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ, জনঅংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। অন্যথায় এই ঐতিহাসিক নদী শুধু ইতিহাসের পাতায়ই বেঁচে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর ক্ষতির মূল্য চোকাতে বাধ্য হবে।